প্রাণের উৎসবে মাতোয়ারা

আজিজুল কদির /ইমরান এমি

লাল পাঞ্জাবি পরে বাবার সঙ্গে পহেলা বৈশাখের ভোরে সিআরবিতে এসেছে ফাহিম আদনান। বাবার সাথে হেঁটে হেঁটে ঘুরছে এখান থেকে ওখানে। কখনো আবার বায়না ধরছে আইসক্রিম খাওয়ার জন্য। বাবাও ছেলেকে দেখাচ্ছেন বাঙালির প্রাণের উৎসব বৈশাখ। ছেলেও আনন্দে আত্মহারা।
নগরীতে বর্ণিল আয়োজনে বাঙালির প্রাণের উৎসব পহেলা বৈশাখকে বরণ করেছে নগরবাসী। ছিল চিরয়াত বাংলার নাচ-গান, আবৃত্তি, নাটক ও কথামালা। গত রোববার ভোরে সূর্যোদয়ের সময় শ্রম্নতিঅঙ্গনের পরিবেশনায় ‘পহেলা বৈশাখ বাঙালির উৎসব সবার যোগে জয়যুক্ত হোক’ সেস্নাগানে শুরম্ন হয় ৪১তম বর্ষবরণ অনুষ্ঠান। আদনানের মতো অনেকে এসেছে বাবার সঙ্গে, পরিবারের সাথে-বাঙালির ঐতিহ্যবাহী এ উৎসব উদযাপন করতে।
এদিন নগরীর নজরম্নল স্কয়ারে (ডিসি হিল) ছিল বর্ণাঢ্য আয়োজন বৈশাখকে ঘিরে। নববর্ষের আল্পনায় রাঙানো ছিল ডিসি হিলের সামনের সড়কটি। নগর পুলিশের উদ্যোগে ছিল দর্শনার্থীদের জন্য হাতপাখা আর বিশুদ্ধ পানির ব্যবস’া। শিশুদের জন্য ছিল নাগরদোলা।
ডিসি হিলে দুই পর্বে সাজানো হয় অনুষ্ঠান। প্রথম অধিবেশনে সঙ্গীত পরিবেশন করে সঙ্গীত ভবন, রক্ত কবরী, জয়নত্মী, ছন্দানন্দ, গুরম্নকুল, সুর-সাধনা, সৃজামি, গীতধ্বনি, রাগেশ্রী, বংশী, খেলাঘর, প্রীতিলতা ও সপ্তডিঙ্গা শিল্পাঙ্গন। নৃত্য পরিবেশন করে নটরাজ নৃত্যাঙ্গসহ কয়েকটি দল। আবৃত্তি পরিবেশন করে বোধন আবৃত্তি পরিষদ, প্রমা, উচ্চারক, নরেন ও শৈশব আবৃত্তি দল।
নৃত্য, আবৃত্তি ও গানের মধ্যদিয়ে সকাল ৮টা থেকে সিআরবি শিরীষ তলায় শুরম্ন হয় বর্ষবরণ অনুষ্ঠান।
বেলা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে বাড়তে থাকে মানুষের ভিড়। নানা বয়সের নানা পোশাকে মানুষ প্রিয়জন পরিবার নিয়ে ঘুরে বেড়ায় সিআরবি আর ডিসি হিলে। কড়া রোদে ঘাম ঝরে গায়ে।
সিআরবিতে আসা দর্শনার্থীদের আনন্দ ছিল একধাপ এগিয়ে। সিআরবি সাত রাসত্মার চত্বরে আয়োজন করা হয় সাহাব উদ্দীনের বলিখেলা। এ খেলায় অংশ নিয়েছে যুবক থেকে ৭০ বছরের বৃদ্ধ পর্যনত্ম। বলিদের নানা কৌশল দেখতে হাজির হয় হাজারো দর্শক। এবারের সাহাব উদ্দীনের বলিখেলায় চ্যাম্পিয়ন হয়েছে চকরিয়ার বাদশা ও কুমিলস্নার শাহজাহান।
চ্যালেঞ্জ রাউন্ড
থেকে সেমিফাইনালে উঠেন শফিক, বাদশা, শাহজাহান ও মো. হোসেন নামে চার বলি। সেমিফাইনালে শফিককে হারিয়ে ফাইনাল রাউন্ডে উঠে বাদশা। তারা দু’জন খেলেন মাত্র তিন মিনিট ১৫ সেকেন্ড। এ সময়ের মধ্যে শফিক বলিকে হারান বাদশা। তবে শাহজাহান ও মো. হোসেনের মধ্যে লড়াই চলে প্রায় এগারো মিনিটের মতো। পরে রেফারি শাহজাহানকে বিজয়ী ঘোষণা করেন। ফাইনাল খেলা শুরম্নর পর থেকে বাদশা ও শাহজাহান দু’জনই কৌশল অবলম্বন করে খেলে ।
তাদের মধ্যে লড়াই চলে ৭ মিনিট ১৪ সেকেন্ড। দু’জনের কেউ কাউকে ছাড় দিতে রাজি নয়। তবে শাহজাহান মাথা ঠুকে ও পা ধরে মাটিতে ফেলার চেষ্টা করায় রেফারি প্রথমে অযোগ্য ঘোষণা করলেও দর্শকদের দাবির মুখে আবারো দু’জনের মধ্যে খেলা চলে। এক পর্যায়ে রেফারি এম এ মালেক দুজনকেই যুগ্ম চ্যাম্পিয়ন হিসাবে ঘোষণা করেন।
এদিকে দুপুর গড়িয়ে বিকেল হতেই সিআরবি শিরীষ তলায় বাড়তে থাকে মানুষের চাপ। পরিবারের গৃহিণীও আসেন বৈশাখী আয়োজন দেখতে। সকালের দিকে তরম্নণ-তরম্নণীদের ভিড় থাকলেও বিকেলে বাড়তে থাকে সব বয়সীদের ভিড়। ছেলে মেয়ে নিয়ে ঘুরতে আসেন অনেকে।
কথা হয় রাজিয়া সুলতানা নামের এক গৃহিণীর সঙ্গে। তিনি বলেন, সকালের দিকে বাসায় নানা কাজ থাকে। সেগুলো শেষ করে বিকেলে বের হই। অনেক ভালো লাগছে আমাদের বাংলার ঐতিহ্যবাহী এ সংস্কৃতি। এসব আয়োজনের মাধ্যমে দেশীয় সংস্কৃতির চর্চা আরো বাড়বে বলে তিনি আশাবাদী।
এদিকে গত রোববার সকাল ৯টায় নববর্ষকে স্বাগত জানিয়ে সার্কিট হাউজ প্রাঙ্গণ থেকে মঙ্গল শোভাযাত্রা বের করে চট্টগ্রাম জেলা শিল্পকলা। নগরীর বিভিন্ন সড়ক প্রদড়্গিণ করে এটা শিল্পকলা একাডেমিতে এসে শেষ হয়। এরপর অনিরম্নদ্ধ মুক্তমঞ্চে জেলা শিল্পকলা একাডেমি সঙ্গীত দলের ‘এসো হে বৈশাখ’ সঙ্গীতের মধ্য দিয়ে দিনব্যাপী অনুষ্ঠানের সূচনা হয়।
এতে নববর্ষের শুভেচ্ছা জানিয়ে বক্তব্য দেন চট্টগ্রাম বিভাগীয় কমিশনার চট্টগ্রাম মো. আবদুল মান্নান, জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ ইলিয়াস হোসেন, জেলা পুলিশ সুপার নুরে আলম মিনা, অতিরিক্ত বিভাগীয় কমিশনার (সার্বিক) শংকর রঞ্জন সাহা, জেলা সিভিল সার্জন ডা. আজিজুর রহমান ও মুক্তিযোদ্ধা সংসদের জেলা কমান্ডার সাহাব উদ্দিন।
শুভেচ্ছা জ্ঞাপনের পর ঢোলবাদক আনোয়ার হোসেন ও তার দলের ঢোলবাদনের মধ্য দিয়ে শুরম্ন হয় সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান। এরপর সমবেত সঙ্গীত পরিবেশন করে শিল্পকলা একাডেমি সঙ্গীতদল। সঙ্গীত পরিচালনায় ছিলেন মো. মোসত্মফা কামাল ও অপু বর্মন।
নৃত্যশিল্পী ও প্রশিড়্গক অনন্য বড়-য়ার পরিচালনায় দলীয় নৃত্য পরিবেশন করে শিল্পকলা একাডেমি নৃত্যদল। নৃত্যশিল্পী তরম্নণ চক্রবর্ত্তীর পরিচালনায় দলীয় নৃত্য পরিবেশন করে স্কুল অব ফোক ডান্স। একক সঙ্গীত পরিবেশন করেন শিল্পী সুবর্ণা রহমান, মো. মোসত্মফা কামাল, জাহেদ হোসেন, সুমাইয়া ইসলাম চৌধুরী রাইসা, আল তুষি, অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট মাশহুদুল কবীর ও অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (রাজস্ব) দেলোয়ার হোসেন। একক আবৃত্তি পরিবেশন করেন অঞ্চল চৌধুরী, আয়েশা হক শিমু ও মিলি চৌধুরী। সকালের পর্বে অনুষ্ঠান সঞ্চালনায় ছিলেন আবৃত্তিশিল্পী ফারম্নক তাহের। সমাপনী পর্বে বক্তব্য রাখেন বাংলাদেশ ফেডারেল সাংবাদিক ইউনিয়নের সহসভাপতি রিয়াজ হায়দার চৌধুরী ও চট্টগ্রাম জেলা কালচারাল অফিসার মো. মোসলেম উদ্দিন সিকদার।