প্রভাতফেরি

উৎপলকান্তি বড়ুয়া

সবাই ঘুম থেকে উঠে গেছে। দীপু রানু সোমা দিনা সবাই। সুমি আরেকটু আগেই বাবার সাথে উঠেছে। সুমি ঘুমোয় বাবারই সাথে। বাবার যেন কলিজার টুকরো সে। সেও যাবে প্রভাতফেরিতে বাবা, দীপু রানু সোমা ও দিনার সাথে। গতকাল রাতে যখন শহীদ মিনারে প্রভাত ফেরিতে যাওয়ার কথা হচ্ছিলো, তখনই সোমা বলে বসে,
আমিও যাবো শহীদ মিনারে ফুল দিতে। প্রভাতফেরিতে। বাবা প্রথমে না করেছে।
ছোট্ট তুমি। হাঁটতে পারবে না।
না, আমি যাবো। সবাই যাচ্ছে, তাই আমিও যাবো। সবাই যেতে পারে, আমিও যাবো।
এবার ক্লাস টুতে ভর্তি হয়েছে সুমি। সকলের ছোট বলে তার আবদার সবার কাছে, সকলখানে একটু বেশি সবসময়। একরোখা জেদী মেয়ে সুমিকে যে থামানো যাবে না সে কথা বাবা ভালো করেই জানেন। কি আর করা! বাবা রাজি হয়।
আচ্ছা বাবা, প্রভাতফেরি কি? সুমি হঠাৎ বাবাকে প্রশ্ন করে।
বাবা পাঞ্জাবি পরছিলো। ডান হাতের হাতা গুটাতে গুটাতে সুমির প্রশ্ন শুনে থেমে যান বাবা। তারপর বলেন,
-াহ্‌ সুমি মা আমার! সুন্দর প্রশ্ন করেছো তো! শোনো দীপু রানু সোমা দিনা- এই দিকে এসো। তোমরাও শোনো। সুমি প্রশ্ন করেছে-প্রভাতফেরি কি? না জেনে থাকলে তোমরাও জেনে নাও। রানু ও সোমা একই সাথে বলে ওঠে,
হ্যাঁ ছোট কাকু আমিও জানি না তো। প্রভাতফেরি অর্থ কি?
দীপু ও দিনা চুপ থাকে। তারাও পাশে এসে দাঁড়ায়।
সংক্ষেপে বলি শোনো। পূর্ব পাকিস্তানে পশ্চিম পাকিস্তান সরকার যখন উর্দু ভাষাকে বাঙালিদের উপর চাপিয়ে দিতে চাইলো তখন কেউই এ সিদ্ধান্ত মেনে নিতে রাজি হলো না। বাবা বলতে শুরু করেন।
তখন শুরু হয় আন্দোলন। তীব্র থেকে তীব্রতর। রাষ্ট্রভাষা বাংলার দাবিতে আন্দোলনরত ছাত্রদের থামিয়ে দিতে নির্বিচারে গুলি চালিয়েছিলো পুলিশ। এতে বরকত, সালাম, রফিক, শফিক, জব্বারসহ নাম না জানা আরো অনেক শহীদের রক্তে সেদিন ঢাকার রাজপথ রঞ্জিত হয়েছিলো। চিন্তা করা যায়! সেদিন বাঙালি বুকের রক্ত ঢালেনি শুধু, গৌরবের ইতিহাসও রচনা করেছিলো। তোমরা তো সবাই ছোট এখনও। আরো বড় হও। তখন আরো বিস্তারিত জানবে, শুনবে এবং বুঝতে পারবে।
আচ্ছা বাবা, প্রভাতফেরি কি! সে তো বললে না।-সুমির যেনো তর সইছে না। বাবাকে আবারও প্রশ্ন করে।
হ্যাঁ বলছি। ১৯৫২ সালে এই দিনে মায়ের ভাষার জন্য প্রাণ বিলিয়ে দেয়া এই শহীদদের উদ্দেশ্যে শ্রদ্ধা জানানো হয় ফুল দিয়ে। স্মরণের বেদী শহীদ মিনারে। শহীদ মিনারে দিনের প্রথম প্রহরে, মানে কাক ডাকা ভোরে ফুলের তোড়া, ফুলের গুচ্ছ হাতে খালি পায়ে শ্রদ্ধা জানানো, স্মরণ করতে যাওয়ার নামই প্রভাতফেরি। সাথে মহান শহীদদের স্মরণে শ্রদ্ধাভরে একই সাথে সুর করে একই শোকসঙ্গীত গেয়ে ওঠে সকলে-আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো, একুশে ফেব্রুয়ারি/আমি কি ভুলিতে পারি? এই সবটা মিলেই প্রভাতফেরি। বুঝলে সুমি মা আমার! দীপু রানু সোমা ও দিনার প্রতিও উদ্দেশ্য করে বলে বাবা,
তোমরাও নিশ্চয়ই বুঝেছো!
তোমরা কি বেরুবে? নাকি এখনও গল্প করবে? কখন যাবে প্রভাতফেরিতে। সময় কত হলো খেয়াল আছে? -ভেতর থেকে মা এসে তাগাদা দেন।
হ্যাঁ চলো চলো, আর দেরি নয় একবিন্দুও। এ সম্পর্কে পরে আরো বিস্তারিত তোমাদের জানাবো, আগে চলো প্রভাতফেরিতে যাই। বলেই বাবা ফুলের তোড়াটা হাতে তুলে নেন।
সুমি, দীপু রানু সোমা ও দিনা তারা প্রত্যেকের জন্য আলাদা করে আনা গোলাপফুলের গুচ্ছ হাতে নিয়ে বাবার পেছন অনুসরণ করে। এরপর খালি পায়ে হেঁটে হেঁটে ফুলেল শ্রদ্ধা হাতে বাবার সাথে সমস্বরে গেয়ে ওঠে-আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো একুশে ফেব্রুয়ারি/আমি কি ভুলিতে পারি?