সম্পূর্ণ ভুল ও অযাচিত সিদ্ধান্ত

প্রফেসর এ. জে. এম. নুরুদ্দীন চৌধুরী প্রাক্তন ছাত্র, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য

চট্টগ্রাম কমার্স কলেজ। স্বীয় মহিমায় ভাস্বর ঐতিহ্যবাহী একটা বিশেষায়িত কলেজ। পাকিস্তান রাষ্ট্র জন্ম নেয়ার পর কলকাতার ‘গোয়াঙ্কা ইনস্টিটিউট অব কমার্স’-এর খণ্ডিত অংশ হিসেবে এটি এখানে গড়ে ওঠে। সময়ের বিবর্তনে বাণিজ্যশিক্ষার জন্য একটা নির্ভরযোগ্য এবং বনেদি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান হিসেবে আত্মপ্রকাশ ঘটে এটির। প্রত্যেক বছর এইচএসসিতে বোর্ডে, এমনকি জাতীয় মেধা তালিকায়ও এটি স’ান করে নেয় নিয়মিত। বিশেষ করে আমাদের সময়ে এখানে পড়ালেখার ভালো পরিবেশ ছিল। খ্যাতিমান শিক্ষকেরা ছিলেন, তখন হোস্টেলটাও সরগরম ছিল শিক্ষার্থীদের কোলাহলে।
উচ্চ মাধ্যমিক ও স্নাতক পর্যায়ে কমার্স কলেজে আমার ছাত্রজীবনের পুরো পাঁচটা বছরই হোস্টেলে কাটিয়েছি। তখন পড়ালেখার পরিবেশ ছিল উন্নতমানের। কিন’ এখন সেসব তো নেই-ই। বরং মানের অবনমন ঘটেছে। উপরন’ এখন শুনছি, বাংলা বিভাগের এক অধ্যাপক ভদ্রলোক কলেজটিতে বাংলা এবং ইংরেজি পড়ানোর বিভাগ খুলেছেন। অথচ এটি বাণিজ্যশিক্ষার জন্য বিশেষায়িত একটা কলেজ। এখানে বেমানানভাবে বাংলা, ইংরেজি ঢোকানোর সিদ্ধান্ত একটা পুরোপুরি ভুল ও অযাচিত সিদ্ধান্ত বলে আমার মনে হয়।
সময়ের প্রয়োজনে এবং যুগের চাহিদার প্রেক্ষিতে এর কাঠামোগত এবং অবকাঠামোগত পরিবর্তন আনা ও উন্নয়ন করার দরকার আছে বৈকি। কিন’ সে উন্নয়ন এবং পরিবর্তনটা হতে হবে এর মূল পরিচয়টা অক্ষুণ্ন রেখেই। মূল পরিচয় অপরিবর্তিত রেখে এই বিশেষায়িত কলেজটিকে চাইলে আরও বিশেষায়ণ করা যেতে পারত। এই যেমন এটাকে একটা বিশ্ববিদ্যালয়ের আদলে করে গড়ে তোলা যেতে পারে। তবে কোনো প্রতিষ্ঠানকে বিশ্ববিদ্যালয় হিসেবে দাঁড় করাতে হলে তাতে কমপক্ষে ২টা অনুষদ থাকতে হয়। যা বর্তমান কমার্স কলেজের নেই। ‘বাংলাদেশ ইউনিভার্সিটি অব বিজনেস স্টাডিজ অ্যান্ড কমার্স’ এরকম একটা নাম দিয়ে এখানে বিজনেস অ্যাডমিনিস্ট্রেশন ফ্যাকাল্টি, ফ্যাকাল্টি অব ব্যাংকিং অ্যান্ড ইন্স্যুরেন্স স্টাডিজ এবং ফ্যাকাল্টি অব কমার্স- এই তিনটা অনুষদ নিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়টি গড়ে উঠতে পারে। যেখানে ফ্যাকাল্টি অব কমার্সের অধীন সাবজেক্ট, যেমন একাউন্টিং, ম্যানেজমেন্ট, ফাইন্যান্স, মার্কেটিং-এর মতো বিষয়গুলো এরই মধ্যে কলেজে আছে। এ ছাড়াও বর্তমানে ব্যাপক চাহিদাসম্পন্ন অন্য একটা বিভাগ হল ‘হোটেল অ্যান্ড হসপিটালি ম্যানেজমেন্ট’। চাইলে এটাকেও অন্তর্ভুক্ত করা যায়। এজন্য অবশ্য কমার্স কলেজের বর্তমান যে কাঠামোটি দাঁড়িয়ে আছে, তাকে ঢেলে সাজাতে হবে। কলেজে যে ক’টা ভবন আছে, সবগুলো তিনতলা বিশিষ্ট। পুরনোগুলো ভেঙে সবকটাকে যদি নয়-দশ তলা বিশিষ্ট সুউচ্চ ইমারতে রূপ দেওয়া যায়, তাহলে কাঠামোগত সমস্যা আর থাকে না।
পাকিস্তানের লাহোরে ‘লাহোর ইউনিভার্সিটি অব ম্যানেজমেন্ট সায়েন্স’ নামে একটি বাণিজ্যশিক্ষার বিশেষায়িত কলেজ আছে, যা হার্ভার্ডের বিজনেস স্কুলের আদলে গড়ে ওঠা। পেশাগত জীবনের সূত্র ধরে ওই কলেজের আগাগোড়া আমার ঘুরে দেখার সৌভাগ্য হয়। আমরা চাইলে কমার্স কলেজটাকেও ওভাবে গড়ে তুলতে পারি। ওই কলেজের বিশেষত্ব হল, এখানে যাঁরা শিক্ষকতার সাথে যুক্ত, তাঁরা সকলেই দেশেরই ছেলেমেয়ে যারা উন্নত বিশ্বের বিভিন্ন নামীদামি কলেজ থেকে বাণিজ্যশিক্ষার ওপর উচ্চতর ডিগ্রি নিয়েছেন। তাদেরকে উন্নত বিশ্বের সমান সুযোগ-সুবিধা দেওয়া হয় বলে তাঁরা দেশে ফিরে এসে শিক্ষকতার সঙ্গে যুক্ত হয়েছেন। আমাদের দেশের এরকম অসংখ্য স্কলার ছেলেমেয়ে নানা দেশে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে আছেন। ভালো সুযোগ-সুবিধা দিতে পারলে ওইসব ঘরের ছেলেমেয়ে সাগ্রহেই ঘরে ফিরে আসবে। তাতে সন্দেহের কোনো অবকাশ নেই।
এসব শুনে কমার্স কলেজের বর্তমান অধ্যক্ষ, বাংলার ওই ভদ্রলোক এখন হয়ত বলবেন, বাংলা-ইংরেজি বিভাগ তো ইতিমধ্যে চালু হয়ে গেছে এবং ছাত্রও ভর্তি হয়ে গেছে, এখন তো করার কিছু নেই। আমি বলব, এটা একটা অবান্তর অজুহাত মাত্র। কলেজ কর্তৃপক্ষ এবং সরকার চাইলেই ভর্তি হওয়া ছেলেমেয়েগুলোকে অন্য সরকারি কলেজে স’ানান্তর করে এটাকে আরও বিশুদ্ধ বাণিজ্যশিক্ষার একটা কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তুলতে পারেন।
সবাইকে অনুধাবন করতে হবে যে, বাণিজ্যশিক্ষার এমন একটা বিশুদ্ধ কলেজ বা বিশ্ববিদ্যালয় আমাদের প্রয়োজন রয়েছে।
অনুলিখন: মুহাম্মদ সাইফুল্লাহ