প্রথম চাপেই দুজন শেষ

সুপ্রভাত ডেস্ক

‘আমাদের সিএনজি অটোরিকশার চালক বলেছিলেন, লরিটি চলে যাক তারপর টান দেব। লরিটির কেবিনটি পার হলো। তারপর ভারী কনটেইনারটিসহ গাড়িটি চাপা দিল আমাদের। প্রথম চাপেই আমার ডানপাশের দুজন শেষ। সিএনজি চালক আধঘণ্টার মতো বেঁচেছিল।’
১৩ আগস্ট বন্দর থানাধীন নিমতলা এলাকায় কনটেইনারবাহী লরিচাপায় দুমড়ে মুচড়ে যাওয়া সিএনজি অটোরিকশার যাত্রী মো. সাইদুল (২৬) এভাবেই প্রতিক্রিয়া জানালেন। খবর বাংলানিউজ’র ।
চট্টগ্রাম মেডিক্যাল কলেজ (চমেক) হাসপাতালের নতুন ভবনের দোতলার বহির্বিভাগে চিকিৎসার জন্য অপেক্ষা করার সময় কথা হয় তার সঙ্গে। রামগতি লক্ষ্মীপুরের বিবিরহাট এলাকার আবদুল মোতালেবের ছেলে তিনি। তার পাশে ছিলেন দুর্ঘটনা থেকে বেঁচে যাওয়া অপর যাত্রী পশ্চিম লক্ষ্মীপুরের দুধু মিয়া বেপারির বাড়ির মো. শফিউল্লাহর ছেলে মো. সুজন (২৯)।
সাইদুল বললেন, আমরা চারজন আন্তঃজেলা পণ্যবাহী গাড়ির চালক ও সহযোগী। সবাই সবাইকে মুখচেনা চিনি। সকালে নিমতলা থেকে সিএনজি অটোরিকশা নিয়ে পশ্চিম মাদারবাড়ির কদমতলি পোড়া মসজিদ এলাকায় যাচ্ছিলাম ভাড়া ধরার জন্য। সিএনজি অটোর পেছনের সিটে বসেছিলাম আমরা তিনজন। আমি সবার বামপাশে ছিলাম। চালকের বামপাশে বসেছিলেন সুজন। যখন গাড়ি নিমতলা মোড়ে এলো তখন একটি কনটেইনার বোঝাই লরি হর্ন দিল। আমাদের সিএনজি অটোচালক অপেক্ষা করলেন, লরিটি পার হওয়ার জন্য।
বলতে বলতে একসময় ব্যথায় কঁকিয়ে উঠলেন সাইদুল। বললেন, চোখের পলকেই ঘটল দুর্ঘটনা। লরিটি চাপা দিল আমাদের সিএনজি অটোরিকশাকে। প্রথম চাপেই শেষ ডানপাশের দুজন। কোনো কথাই বলতে পারেনি। আমি হাফ ইঞ্চি জায়গা ফাঁকা পেয়ে মাথাটা ঘুরাতে পারছি। কোমর আটকে আছে লোহালক্কড়ের মধ্যে। পা আটকে আছে। মুচড়ে আছে পুরো শরীর। অনেকক্ষণ পর ছোট্ট একটি রেকার (উদ্ধারকারী যান) এলো। লোড কনটেইনারের নিচে আমরা। রেকারটি লরির পেছনে লাগাল দড়ি। ভাবলাম পেছনে আলগা করলে সামনে চাপ পড়বে। তখন আমিও মারা পড়ব। জোরে চিৎকার করলাম। কাজ হলো। তারা বিষয়টি বুঝতে পারলেন।
চোখ ভিজে গেল সাইদুলের। বললেন, বাড়িতে নয় মাসের একটি মেয়ে আছে। সেই মেয়েটির চেহারাটিই ভেসে উঠেছিল দুর্ঘটনাকবলিত হওয়ার সময়। মেয়ের ভাগ্যেই আমি বেঁচে গেলাম।
একটু শান্ত হলেন। তারপর বললেন, লরি চালক কিংবা সিএনজি অটোরিকশাচালক কারও দোষ নেই। সব দোষ রাস্তার। হ্যাঁ, রাস্তার ওপর এত গর্ত দেশের আর কোনো সড়কে দেখিনি। ওই রাস্তার দুরবস’ার কারণেই তিনজন প্রাণ হারালেন।
সুজনও মৃত্যুকে খুব কাছ থেকে দেখেছেন। চালকের বাম পাশেই ছিলেন তিনি। বললেন, যদি সিএনজি অটোরিকশার চারপাশে স্টিলের বেড়া না থাকত তবে হয়তো সবাই দৌঁড়ে পালাতে পারতাম। দেখলাম যখন লরির কেবিন (চালকের আসন) আমাদের সিএনজি অটোরিকশা পার হলো। এরপর লরির লেজের প্রথম চাকাগুলো গর্তে পড়ল। তারপর উল্টে গেল। আমরা চাপা পড়লাম। অনেক চেষ্টা করলাম সিএনজির দরজা খুলতে। পারলাম না, দুমড়ে মুচড়ে গেল। বলতে বলতে চোখ মুছলেন তিনি।