প্রত্যাবাসন বিলম্বিত হচ্ছে প্রবেশের অপেক্ষায় ৬ হাজার রোহিঙ্গা

রফিক উদ্দিন বাবুল, উখিয়া

বাংলাদেশ-মিয়ানমারের মধ্যে প্রত্যাবাসন চুক্তি সম্পন্ন হয় গত ২৩ সেপ্টেম্বর। নতুন বছরের ২৪ জানুয়ারি প্রথম দফায় ১২ শতাধিক রোহিঙ্গা মিয়ানমারে ফেরত নেওয়ার কথা থাকলেও যথাসময়ে তা কার্যকর না হওয়ায় প্রত্যাবাসনে আগ্রহ হারাচ্ছে রোহিঙ্গারা। উপরন্ত মিয়ানমারের সামরিক জান্তা রোহিঙ্গা নির্যাতনের কৌশল পরিবর্তন করে সেখানে খাদ্যসংকট সৃষ্টি করায় বিচ্ছিন্নভাবে রোহিঙ্গা অনুপ্রবেশ অব্যাহত রয়েছে। গত ৭দিন ধরে নাফ নদীর ওপারে গর্জনঢিয়া, দনখালী ও নাইক্ষ্যংঢিয়া এলাকায় প্রায় ৬ হাজার রোহিঙ্গা এদেশে পালিয়ে আসার জন্য অপেক্ষা করছে বলে প্রত্যক্ষদর্শী রোহিঙ্গারা জানিয়েছেন।
কুতুপালং ক্যাম্পের রোহিঙ্গা নেতা জাফর আলম জানান, রোহিঙ্গারা প্রত্যাবাসনে আগ্রহী। তবে অনিরাপদ প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়ায় রোহিঙ্গারা মিয়ানমারে ফিরে যেতে চায় না। কারণ রোহিঙ্গারা ইতিপূর্বেও নির্যাতনের শিকার হয়ে এদেশে পালিয়ে এসেছে। সে সময় সরকারের দ্রুততম কূটনৈতিক তৎপরতায় বেশির ভাগ রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসিত হয়। ওই রোহিঙ্গা নেতা আরো জানান, এবারের পালিয়ে আসার চিত্রটি ভিন্ন রকম। যেহেতু রোহিঙ্গারা পালিয়ে আসার নেপথ্যে সেনাবাহিনীর নির্মম হত্যাযজ্ঞ রয়েছে, তাই রোহিঙ্গাদের মাঝে ভীতির মনোভাব কাজ করছে। রোহিঙ্গারা সঠিক নিরাপত্তা নিশ্চিত এবং জাতিসংঘ ও ইউএনএইচসিআর-এর প্রতিনিধির সমন্বয়ে গঠিত প্রত্যাবাসন নীতিমালায় ফিরে যেতে আগ্রহী।
গত সোমবার পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শাহরিয়ার আলম কুতুপালং ক্যাম্প পরিদর্শনকালে সাংবাদিকদের জানান, রোহিঙ্গাদের নিরাপদ পরিবেশ নিশ্চিত করে মিয়ানমারের ফেরত পাঠানো হবে। এ জন্য ইউএনএইচসিআরকে সম্পৃক্ত করে চুক্তি সম্পন্ন করতে প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়া একটু বিলম্বিত হচ্ছে। বেশ কয়েকজন রোহিঙ্গা নেতার সাথে কথা বলে জানা গেছে, মিয়ানমারের শাসকগোষ্ঠি এখনো সেখানে ভয়ভীতিমূলক পরিবেশের মধ্যে বসবাসরত রোহিঙ্গাদের মানসিকভাবে নির্যাতন করছে। গত সোমবার মিয়ানমারের নাইক্ষ্যংঢিয়া থেকে নাফ নদী পার হয়ে কুতুপালং ক্যাম্পে আসা রোহিঙ্গা নাগরিক আব্দুল নবির (৪৫) সাথে কথা হয়। তিনি জানান, প্রত্যাবাসন বিলম্বিত হওয়ায় মিয়ানমার সেনারা নির্যাতনের কৌশল পরিবর্তন করে রোহিঙ্গাদের ওপর মানসিক চাপ সৃষ্টি করছে। তিনি জানান, রোহিঙ্গাদের ঘর থেকে বেরোতে দিচ্ছে না। হাটবাজারে যাওয়া-আসা করতে দিচ্ছে না। বাড়ি-বাড়ি এসে এনভিসি কার্ড নেওয়ার জন্য ভয়ভীতি প্রদর্শন করছে। যারা নিজ উদ্যোগী হয়ে এনভিসি কার্ড নিচ্ছেন তারা কোনো রকম চলাফেরা করতে পারলেও বেশির ভাগ রোহিঙ্গা গৃহবন্দি অবস’ায় খাদ্য সংকটে পড়েছে। যে কারণে অবশিষ্ট রোহিঙ্গারা এদেশে পালিয়ে আসার জন্য অসি’র হয়ে পড়েছে। রোহিঙ্গা নাগরিক আব্দুল নবি আরো জানান, নাফনদীর ওপারে সীমান্তের গর্জনঢিয়া, দনখালী ও নাইক্ষ্যঢিয়া এলাকায় আরো প্রায় ৬ হাজারেরো অধিক রোহিঙ্গা গত ৭দিন ধরে অনাহারে-অর্ধাহারে জড়ো হয়ে আছে। তারা যে কোনো সময় সীমান্ত পাড়ি দিয়ে এপারে চলে আসতে পারে।
বাংলাদেশ রেডক্রিসেন্ট সোসাইটির কক্সবাজারস’ কো-অর্ডিনেটর সেলিম আহমদ জানান, গত ২দিনে প্রায় ৬শতাধিক রোহিঙ্গা নাফনদী পার হয়ে কুতুপালং ক্যাম্পে আশ্রয় নিয়েছে।
রোহিঙ্গা মাঝিদের অভিমত, টেকসই ও নিরাপদ প্রত্যাবাসন চুক্তি অনুযায়ী যত দ্রুত সম্ভব রোহিঙ্গারা মিয়ানমারে ফিরে যেতে শুরু করলে ওপার থেকে রোহিঙ্গা আসা বন্ধ হয়ে যাবে। তা না হলে রোহিঙ্গারা আসতেই থাকবে।
গত ২৫ আগস্টের পর থেকে এ পর্যন্ত উখিয়া-টেকনাফের ১২টি অস’ায়ী ক্যাম্পে আশ্রয় নিয়েছে ১০ লাখের অধিক রোহিঙ্গা। শরণার্থী ত্রাণ ও প্রত্যাবাসন কমিশনার আবুল কালাম জানান, রোহিঙ্গাদের মিয়ানমারে ফেরত পাঠানোর জন্য গত ২ সপ্তাহ ধরে পরিবারভিত্তিক তালিকা প্রণয়নের কাজ চলছে। যে কারণে প্রত্যাবাসন বিলম্বিত হচ্ছে।