প্রণব মুখার্জির দুই প্রশ্ন

সম্মানসূচক ডি-লিট দিল চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়

চবি সংবাদদাতা
ভারতের সাবেক রাষ্ট্রপতি প্রণব মুখার্জিকে গতকাল সম্মানসূচক ডি-লিট ডিগ্রি প্রদান করে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়

কেন ভারতীয় উপ-মহাদেশে বার বার রাজনৈতিক হত্যাকাণ্ড সংঘটিত হয়েছে? কেন এ উপ মহাদেশের দেশগুলোতে স্বৈরশাসন বার বার আসছে? এ দুইটি প্রশ্নের কারণ অনুসন্ধানের জন্য গবেষকদের অনুরোধ জানিয়েছেন ভারতের সাবেক রাষ্ট্রপতি প্রণব মুখার্জি। প্রণব মুখার্জিকে গতকাল চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে সম্মানসূচক ডি-লিট ডিগ্রি প্রদান করে। পরে নিজের অনবদ্য বক্তৃতায় ভারতের সাবেক এ রাষ্ট্রপতি এ দুটি প্রশ্ন রাখেন।
ভারতের সাবেক রাষ্ট্রপতি প্রণব মুখার্জি প্রশ্ন রেখে বলেন, যারা সামনে থেকে দেশকে স্বাধীন করতে নেতৃত্ব দিয়েছেন, তাদেরকে কেন নিশ্চিহ্ন করা হয়?
তিনি বলেন, হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ বাঙালি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান, যিনি গ্রেফতারের পূর্বে শেষ বাণী দিয়েছিলেন, “একজন আগ্রাসনকারী যতদিন পর্যন্ত আমাদের মাটিতে থাকবে, ততদিন পর্যন্ত আমাদের সংগ্রাম চলবে।” সেই সংগ্রামের ঘোষণার পর সাড়ে সাত মাস পর্যন্ত অসহ্য যন্ত্রণা সহ্য করেছেন, বাংলাদেশের প্রার্থিত স্বাধীনতা এসেছে।
এরপরেই বড় আঘাত এসেছে, আততায়ীর বুলেট ছিনিয়ে নিয়েছিলো মহাত্মা গান্ধীর জীবন, তেমনি একদল ঘাতকের নৃশংস হামলায় শ্রেষ্ঠ বাঙালি নিহত হন।
বাংলাদেশে তখন অসংখ্য সমস্যা। দেশ গড়া, দারিদ্র্য দূর করা, বেকারত্ব দূর করা। বাংলাদেশের জন্মলগ্নের সাথে সাথে সেই জাতির পিতাকে নিশ্চিহ্ন করে দেয়া হলো। আমেরিকা স্বাধীন হওয়ার অনেক পরে আব্রাহাম লিংকন, জর্জ ওয়াশিংটন খুন হয়েছিলেন। তাঁরা আমেরিকা গড়ার সময় পেয়েছেন। কিন্তু বঙ্গবন্ধু সেই সুযোগ পাননি।
ভারতের সাবেক রাষ্ট্রপতি বলেন, ‘এই উপমহাদেশে ভারতবর্ষের স্বাধীনতা লাভ করার কিছুদিন পর আমরা জাতির জনক মহাত্মা গান্ধীকে হারিয়েছিলাম। আতাতায়ীর বুলেট ১৯৪৮ সালের ৩০ জানুয়ারি মহাত্মাগান্ধীকে ভারতীয় মানুষের কাছ থেকে, পৃথিবীর কাছ থেকে ছিনিয়ে নেয়। ঠিক তেমনি স্বাধীন বাংলাদেশের দায়িত্ব নেওয়ার তিন বছর সাড়ে তিন বছরের মাথায় ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট ভোরে একদল ঘাতকের নৃশংস আক্রমণে সপরিবারে বাংলাদেশের প্রতিষ্ঠাতা জাতির জনক সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ বাঙালি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান নিহত হন।’
তিনি আরও বলেন, ‘মিয়ানমারের স্টেট কাউন্সিলর অংসান সুচির পিতা বর্ম দেশের জনক জেনারেল অং সান সমস্ত সহকর্মীদের সঙ্গে ব্রাশ ফায়ারে নিহত হন। ১৯৬০ সালে শ্রীলংকার প্রধানমন্ত্রী সলেমান বন্দরনায়েক নিহত হলেন।
তিনি আবারো বলেন, ১৯৪৮ সালের ৩০ জানুয়ারি মহাত্মা গান্ধী নিহত হলেন। ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান নিহত হলেন। ৩ নভেম্বর জেলের মধ্যে প্রথম সারির নেতৃত্ব, যারা স্বাধীনতার সময় অস্থায়ী সরকার গঠন করেছিলেন, তাজউদ্দিন, কামারুজ্জামান, মনসুর আলী প্রমুখ নিহত হলেন। পাকিস্তানের রাষ্ট্রপতি জিয়াউল হক নিহত হলেন। জনপ্রিয় নেতা জুলফিকার আলী ভুট্টোকে আইনের নাম করে ফাঁসি দেওয়া হলো। শ্রীলংকার প্রধানমন্ত্রী প্রেম দশা নিহত হলেন। এ যে বিপুল সংখ্যক রাজনৈতিক হত্যা, এর কারণটা কি? এ কেমন রাজনৈতিক অস্থিরতা, যেখানে নেতৃত্বকে নিশ্চিহ্ন করে দেওয়া হয়। এর পিছনে কোন সামাজিক, রাজনৈতিক অর্থনৈতিক পরিপ্রেক্ষিত কাজ করে কিনা আমাদের জানতে হবে।’
তিনি আরও বলেন, ‘কেন এই দেশগুলোতে সামরিক শাসন বার বার আসছে। সেই বিষয়েও আপনারা লক্ষ্য করবেন।’
এ বিষয়ে ইতিহাসবিদদেরকে গবেষণা করার আহবান জানান ভারতের সাবেক এই রাষ্ট্রপতি। তিনি বলেন, আমি অনুরোধ করবো, ইতিহাস, সমাজত্ত্ব বিভাগগুলোর যেসব পণ্ডিত রয়েছেন, তারা এ নিয়ে গবেষণা করবেন। কেন যেসব রাজনীতিকের নেতৃত্বে দেশ স্বাধীন হয়েছে, সেইসব দেশেই রাজনৈতিক নেতৃত্বের ওপর হামলা বেশি হয়েছে।
বাংলাদেশের অকৃত্রিম বন্ধু বর্ষীয়ান এ রাজনীতিবিদ আরো বলেন, প্রতিভাবান শিক্ষার্থীদের আমরা কেন কোনো একটা বড় মাল্টিন্যাশন্যাল কোম্পানিতে সেলসম্যান হতে দিব। ডেটল বিক্রির জন্য নিশ্চয় একজন আই আই আরটি ইঞ্জিনিয়ার দরকার হয় না। একজন বড় গবেষেকের প্রয়োজন হয় না। একজন কোয়ালিফাইড হাইলি ইন্টিলেকচ্যুায়েলের প্রয়োজন হয় না। রিসার্স কোথায়? ইনোভেশন কোথায়?
এর আগে বিশ্ববিদ্যালয় উপাচার্য অধ্যাপক ড. ইফতেখার উদ্দিন চৌধুরী বক্তব্য রাখেন। তিনি বলেন, ‘প্রণব মুখার্জি উপমহাদেশে একজন সফল এবং প্রবীন রাজনীতিবিদ। অত্যন্ত জ্ঞানী ও প্রজ্ঞাবান এ মহান নেতাকে ডিলিট ডিগ্রি দিতে পেরে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় গর্ববোধ করছে। প্রণব মুখার্জি বাংলাদেশের অকৃত্রিম বন্ধু।
উপাচার্য বলেন, একজন সচ্চ রাজনীতিবিদ, আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিষয়ে যিনি অগাধ জ্ঞানের অধিকারী। এ মহান নেতার জ্ঞান-প্রজ্ঞাদীপ্ত ভাষণ, উদার, মানবিক-নৈতিক দৃষ্টিভঙ্গী, উন্নত-সমৃদ্ধ সাংস্কৃতিক চেতনা, জ্ঞান চর্চার প্রণোদনা ও মুক্ত চিন্তার নির্দেশনা চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, তরুণ মেধাবী শিক্ষার্থী এবং কর্মকর্তা-কর্মচারীদেরকে নৈতিক মানবিক মূল্যবোধ সম্পন্ন অসামপ্রদায়িক, গণতান্ত্রিক মহান মুক্তিযুদ্ধের চেতনা সমৃদ্ধ বাংলাদেশ বিনির্মাণে অযুত প্রেরণা যোগাবে ।
পরে উপাচার্য প্রণব মুখার্জির হাতে সম্মানসূচক ডি-লিট ডিগ্রির সনদ তুলে দেন।
অনুষ্ঠানে বিশ্ববিদ্যালয়ের উপ-উপাচার্য অধ্যাপক ড. শিরীণ আখতার ধন্যবাদসূচক বক্তব্য রাখেন। মঞ্চে উপবিষ্ট ছিলেন বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন অনুষদের ডিনবৃন্দ, ভারপ্রাপ্ত রেজিস্ট্রার, ভারপ্রাপ্ত পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক। সংসদ সদস্য আশেকুল্লাহ রফিক, সাইমন সরওয়ার কমল, ওয়াশেকা আয়েশা খান, পিএইচ পি পরিবারের চেয়ারম্যান সুফি মিজানুর রহমানসহ গণমান্য ব্যক্তিবর্গ উপস্থিত ছিলেন। অনুষ্ঠনে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় পরিবারের আমন্ত্রিত শিক্ষক, শিক্ষার্থী, কর্মকর্তা ও কর্মচারীরা অংশ নেন।