প্রকৃতির স্বর্গরাজ্য চট্টগ্রাম

শাহাব উদ্দিন মাহমুদ

সাগর, পাহাড় ও নদীঘেরা চট্টগ্রাম অপার সম্ভাবনার আধার। প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের আধার এই চট্টগ্রামের উন্নয়নের দায়িত্ব নিজের কাঁধে তুলে নিয়েছিলেন গণমানুষের নেত্রী শেখ হাসিনা। ঘোষণায় বাণিজ্যিক রাজধানী হলেও চট্টগ্রামবাসীর জীবনমানে ছিলনা তার ছোঁয়া। শিক্ষা, স্বাস্থ্য, জলাবদ্ধতা, যোগাযোগ অবকাঠামোসহ বিভিন্ন সমস্যা সমাধানে একের পর এক মেগা প্রকল্প অনুমোদন ও সমন্বিত পরিকল্পনার মাধ্যমে বাস্তবায়নের প্রয়াস নেয়ায় চট্টগ্রামে প্রাণচাঞ্চল্য ফিরে এসেছে। উন্নত, সমৃদ্ধ, আধুনিক চট্টগ্রামে বসবাসের স্বপ্ন নিয়ে আশায় দিন গুনছেন চট্টগ্রামের বাসিন্দারা । সরকারের ১০ বছরে বৃহত্তর চট্টগ্রামে ১ লাখ কোটি টাকার প্রকল্প নেওয়া হয়েছে।এর মধ্যে কর্ণফুলী টানেল, মহেশখালীর মাতারবাড়ী বিদ্যুৎ প্রকল্প, চট্টগ্রাম-কক্সবাজার রেললাইন, কক্সবাজার বিমানবন্দর সমপ্রসারণ, ঢাকা-চট্টগ্রাম-কক্সবাজার বেড়িবাঁধ ও রিং রোড, এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে, ফ্লাইওভার, জলাবদ্ধতা নিরসন প্রকল্প বাস্তবায়ন এবং এলএনজি টার্মিনাল স্থাপন অন্যতম। ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক চার লেনে উন্নীত করায় পণ্য পরিবহনে দীর্ঘসূত্রিতার অবসান হয়েছে।
পতেঙ্গায় বিশ্বমানের পর্যটন কেন্দ্র
বঙ্গোপসাগরের তীরে পাহাড়, নদীঘেরা চট্টগ্রাম প্রকৃতির এক স্বর্গরাজ্য। চট্টগ্রাম পাহাড়, সমুদ্র আর নদীবেষ্টিত একটি সুন্দর শহর শুধু নয়, জেলা ও বিভাগীয় শহর। ছোট-বড় পাহাড়, টিলা নিয়ে গড়ে ওঠা এ শহর খুবই সুন্দর ও দৃষ্টিনন্দন। সমুদ্র,পাহাড় অসংখ্য ছোট-বড় নদীর এক অপূর্ব মিলনক্ষেত্র। বন্দরনগরী চট্টগ্রামে পর্যটনের জন্য যেসব উপাদান আবশ্যক সবই আছে ; শুধু ছিল না সমন্বিত উদ্যোগ। চট্টগ্রাম নগরীর সাগর তীরবর্তী পর্যটন এলাকা পতেঙ্গা সমুদ্র সৈকতের উন্নয়ন ও সৌন্দর্য বর্ধনের মাধ্যমে চট্টগ্রামে বিশ্বমানের পর্যটন কেন্দ্র গড়ার স্বপ্নে কাজ করছে সিডিএ। চলমান আউটার রিং রোড প্রকল্পের আওতায় এ উদ্যোগ।
দেশি-বিদেশি পর্যটক আকর্ষণ করতে পরিকল্পিতভাবে পতেঙ্গা সমুদ্র সৈকতকে আধুনিকায়নের পরিকল্পনা বাস্তবায়ন হচ্ছে। কর্ণফুলীর মোহনা থেকে বঙ্গোপসাগরের তীর ঘেঁষে ৫ কিলোমিটার এলাকায় গড়ে তোলা হবে আধুনিক ও বিশ্বমানের পর্যটন কেন্দ্র। প্রকল্পের আওতায় পতেঙ্গা সমুদ্র সৈকতে নির্মাণ করা হবে ওয়াকওয়ে, বসার জন্য সুন্দর ও সুপরিসর আসন, শিশুদের জন্য কিডস কর্নার, ফুড কোড, গ্রিন জোন, খেলার মাঠ, কেবল কার,উন্নত মানের রাইড, সাগরে নিরাপদে ওঠানামার জন্য জেটি, সাঁতারের পর গোসলের ব্যবস্থা, কার পার্কিং এবং আধুনিক ও স্বাস্থ্যসম্মত টয়লেটের ব্যবস্থা থাকবে পাঁচতারকা হোটেল, রেস্টুরেন্ট, কাফেটেরিয়া, বিনোদন কেন্দ্রগুলিতে। সৈকতের পাশেই সিঙ্গাপুরের আদলে গড়ে তোলা হবে বিলাসবহুল স্মার্ট সিটি।
২০১৯ সালের মধ্যে কক্সবাজারমুখী গাড়ি সহজেই পতেঙ্গার নেভাল একাডেমির পাশ দিয়ে নির্মাণাধীন টানেল হয়ে কর্ণফুলীর ওপারে চলে যেতে পারবে। দেশের প্রথম এবং একমাত্র এ টানেলটি চালু হলে এ অঞ্চলের অর্থনৈতিক সম্ভাবনার নতুন দ্বার উন্মোচিত হবে। সরকারের গৃহীত ঢাকা-চট্টগ্রাম-কক্সবাজার অর্থনৈতিক করিডোর বাস্তবায়ন আরও একধাপ এগিয়ে যাবে। কর্ণফুলী নদীর ওপারে গড়ে উঠবে অর্থনৈতিক জোন ও সমৃদ্ধ আরও এক মহানগরী। মূল শহরের সঙ্গে নদীর অন্য প্রান্তের সরাসরি যোগাযোগ স্থাপিত হওয়ার পাশাপাশি বিকশিত হবে পর্যটন শিল্প। চাপ কমবে নদীর উপর থাকা অন্য দুই সেতুর। একই সঙ্গে যোগাযোগ স্থাপিত হবে প্রস্তাবিত সোনাদিয়া সমুদ্রবন্দরের সঙ্গে।
যানজটমুক্ত স্বপ্নের স্মার্ট চট্টগ্রাম
চট্টগ্রাম নগরীর যানজট সমস্যার সমাধান , চট্টগ্রাম বন্দর, ইপিজেড ও বিমানবন্দরমুখী বিকল্প পণ্য পরিবহন সড়ক যোগাযোগ নেটওয়ার্ক গড়ে তোলা, শহর রক্ষা, শিল্পায়ন, আবাসন ও পর্যটনের প্রেক্ষাপটে গুরুত্বপূর্ণ ও সবচেয়ে বড় প্রকল্পটি হচ্ছে আউটার রিং-রোড। ট্রাঙ্ক রোড নেটওয়ার্কের আওতায় দুটি রিং রোড এবং মহানগরীর চারপাশে বৃত্তাকার সড়ক যোগাযোগ নেটওয়ার্ক গড়ে তুলতে ছয়টি রেডিয়েল রোড নির্মাণের অংশ হিসেবে আউটার রিং রোড প্রকল্পের কাজ শুরু হয় কয়েক বছর আগে। ইতোমধ্যে পতেঙ্গা থেকে ফৌজদারহাট পর্যন্ত আউটার রিং রোডের কাজ প্রায় শেষের পথে। ফৌজদারহাট থেকে বায়েজিদ বোস্তামি পর্যন্ত চিটাগাং বাইপাসের নির্মাণকাজও শেষ পর্যায়ে। বায়েজিদ থেকে অক্সিজেন এবং অক্সিজেন থেকে বঙ্গবন্ধু এভিনিউ হয়ে কাপ্তাই রাস্তার মাথা পর্যন্ত সড়ক ইতোমধ্যে নির্মিত হয়েছে।
প্রকল্পের দ্বিতীয় পর্যায়ে চাক্তাই-কালুরঘাট আউটার রিং রোড প্রকল্প বাস্তবায়িত হলে যানজট নিরসনের পাশাপাশি কর্ণফুলীর তীরবর্তী সন্নিহিত পিছিয়েপড়া এলাকার উন্নয়ন, পর্যটন শিল্পের বিকাশ সহ বৃত্তাকার এই সড়কটি বিস্তীর্ণ এলাকার আর্থসামাজিক উন্নয়নের ক্ষেত্রেও বড় ধরনের ভূমিকা রাখবে।
আউটার রিং রোড প্রকল্পের মাধ্যমে শহরের ভিতরে প্রবেশ না করেই দক্ষিণ বা উত্তর চট্টগ্রামের যানবাহন সমূহ বিভিন্ন গন্তব্যে যাতায়াত করতে পারবে। চাক্তাই খালের মুখ থেকে বারিক বিল্ডিং পর্যন্ত রাস্তা রয়েছে। ফলে নগরীর চারদিকে একটি বৃত্তাকার সড়ক যোগাযোগ ব্যবস্থা তৈরি হবে। দক্ষিণ চট্টগ্রাম থেকে ঢাকার গাড়িগুলো শহরে প্রবেশ না করে টানেল হয়ে পতেঙ্গা থেকে আউটার রিং রোড ধরে ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কে চলে যাবে।
এ ছাড়াও চট্টগ্রাম শহরের যানজট ও জনদুর্ভোগ কমাতে নগরীর প্রধান সড়কের ওয়াসা থেকে বিমানবন্দর পর্যন্ত এক্সপ্রেসওয়ে নির্মাণ করা হচ্ছে। এক্সপ্রেসওয়েটি নগরীর প্রধান সড়কের আখতারুজ্জামান চৌধুরী ফ্লাইওভারের সাথে যুক্ত হবে। ১৬ দশমিক ৫ কিলোমিটার দীর্ঘ এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে নির্মিত হলে চট্টগ্রাম শহর এলাকা এবং এর দক্ষিণ অংশের সাথে উন্নত যোগাযোগ ব্যবস্থার সৃষ্টি হবে। এতে যানজট হ্রাস পাবে এবং বিমানবন্দরে যাতায়াতের পথ সুগম হবে। ২৪টি র‌্যাম্প সহ এক্সপ্রেসওয়েটির মোট দৈর্ঘ্য হবে ২৮ দশমিক ৫ কিলোমিটার। এক্সপ্রেসওয়েটি নির্মিত হলে চট্টগ্রাম শহরের গণপরিবহন ও যানচলাচলে বৈপ্লবিক পরিবর্তন সাধিত হবে। চট্টগ্রাম মহানগরে বিভিন্ন সেবা সংস্থার মাধ্যমে প্রায় ৫০ হাজার কোটি টাকার উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়িত হচ্ছে। এসব উন্নয়ন প্রকল্প নিয়ে সাধারণ মানুষের মাঝে কিছুটা মিশ্র প্রতিক্রিয়া থাকলেও সরকারের উন্নয়ন কর্মকাণ্ড জনসম্মুখে তুলে ধরা,জলাবদ্ধতা নিরসন প্রকল্পের সুফল জনগণের দোরগোড়ায় পৌঁছে দেয়ার লক্ষ্যে জনসচেতনতা সৃষ্টির জন্য মহানগরীর প্রতিটি পাড়া মহল্লায় চউক চেয়ারম্যান আবদুচ ছালাম এর সভা-সমাবেশ, উঠান বৈঠক ইতোমধ্যে সাধারণ মানুষের প্রশংসা কুড়িয়েছে।
চট্টগ্রাম শহরের প্রায় প্রতিটি সরু রাস্তাকে চার লেনে উন্নীতকরণ ও চারটি ফ্লাইওভার নির্মাণসহ ৩০টি উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়িত হয়েছে। এর বাইরেও বর্তমানে চট্টগ্রাম শহরে ১৪ হাজার কোটি টাকার জলাবদ্ধতা নিরসন প্রকল্পসহ ১১টি মেগা প্রকল্প চলমান রয়েছে।
এসব প্রকল্প বাস্তবায়িত হলে চট্টগ্রামের মানুষের দীর্ঘদিনের আকাঙ্ক্ষা জলাবদ্ধতা ও যানযটমুক্ত চট্টগ্রাম, বিশ্বমানের পর্যটননগরী চট্টগ্রাম এবং বাণিজ্যিক রাজধানী চট্টগ্রাম প্রতিষ্ঠা লাভ করবে বলে মনে করেন নগর পরিকল্পনাবিদ ও সুশীল সমাজের প্রতিনিধিবর্গ।

লেখক : প্রাবন্ধিক, কলামিস্ট
ঊসধরষ: ংঁসধযসঁফ৭৮@মসধরষ.পড়স