প্রকাশক, সংস্কৃতি সংগঠক সৈয়দ মোহাম্মদ শফি

আজিজুল কদির

চট্টগ্রামে প্রকাশনা জগতের অন্যতম পথিকৃৎ ও সংস্কৃতি সংগঠক সৈয়দ মোহাম্মদ শফি। সৈয়দ মোহাম্মদ শফির জন্ম ১৯৩৩ সালের ১৩ জানুয়ারি। ১৯৫১ সালে চট্টগ্রামে প্রকাশনা সংস্থা ‘বইঘর’ এবং ১৯৬৫ সালে ‘শিশু সাহিত্য বিতান’ নামে শিশু গ্রন্থ প্রকাশনী প্রতিষ্ঠা করেন তিনি। এ দুটি প্রতিষ্ঠান থেকে দেশের খ্যাতিমান লেখকদের বই প্রকাশ, লেখক শিল্পীদের পৃষ্ঠপোষকতা ও আতিথেয়তা দিয়ে প্রকাশক হিসেবে ব্যাপক সুনাম অর্জন করেন। তাঁর প্রকাশিত এখলাস উদ্দিন আহমদের ‘অন্য মনে দেখা’ বইটি শ্রেষ্ঠ বই হিসেবে স্বীকৃতি পায় জার্মানিতে। প্রকাশনা জগতে বিশেষ অবদান রাখার জন্য জাতীয় গ্রন্থকেন্দ্র স্বর্ণপদক পান সৈয়দ মোহাম্মদ শফি। পৈতৃক নিবাস বোয়ালখালী উপজেলার পোপাদিয়া গ্রামে। বাবা সৈয়দ নুরুল আলম, মা সৈয়দা চেমন আরা বেগম। দুভাই আর দুবোনের মধ্যে তিনি দ্বিতীয়। তবে জন্ম তাঁর চট্টগ্রাম নগরীর আন্দরকিল্লায়। তাঁর বাবা ১৯২৬ সালে আন্দরকিল্লায় ‘দি আর্ট প্রেস’ নামে একটি ছাপাখানা প্রতিষ্ঠা করেন, যা চট্টগ্রামে আধুনিক মুদ্রণজগতের অন্যতম হিসেবে পরিচিত ও সমাদৃত ছিল।
যতদূর জানা যায় সেই সময় প্রথম অফসেট পদ্ধতিতে ছাপার কাজ শুরু করেছিল ‘দি আর্ট প্রেস’ । এক পর্যায়ে সৈয়দ মোহাম্মদ শফি ঝুঁকে পড়েন প্রকাশনা শিল্পের দিকে এবং ১৯৫১ সালে প্রতিষ্ঠা করেন নিজস্ব প্রকাশনা সংস্থা ‘বইঘর’। ধীরে ধীরে ছাপাখানা থেকে প্রকাশক হয়ে উঠেন। বেশ কিছু ভারতীয়, বিশেষ করে কোলকাতার লেখকের বইও বইঘর থেকে প্রকাশিত হয়েছে। অল্প কিছু দিনের মধ্যে চারিদিকে ছড়িয়ে পড়ে বইঘর ও শিশুসাহিত্য বিতানের সুনাম।
প্রতিষ্ঠালগ্ন থেকে বইঘর ও শিশুসাহিত্য বিতান থেকে প্রকাশিত বইয়ের সংখ্যা প্রায় পাঁচ শতাধিক । প্রকাশনা জগতে জড়িত হওয়ার সুবাদে অনেক লেখক, শিল্পীর সঙ্গে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক গড়ে উঠে তাঁর। তাদের বেশিরভাগই জাতীয় পর্যায়ে প্রতিষ্ঠিত। বইঘর থেকে যাঁদের বই বেরিয়েছে তাদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলেন- বেগম সুফিয়া কামাল, সৈয়দ মুজতবা আলী, আবুল ফজল, সৈয়দ আলী আহসান, কবির চৌধুরী, সৈয়দ শামসুল হক, শামসুর রাহমান, আল মাহমুদ, মুনীর চৌধুরী, আবদুল হাই, ওয়াহিদুল হক, হাসনাত আবদুল হাই, হাসান আজিজুল হক, বদরুদ্দিন উমর, আলাউদ্দিন আল আজাদ, সরদার জয়েন উদ্দিন, সুচরিত চৌধুরী, পূর্ণেন্দু দস্তিদার, বোরহান উদ্দিন খান জাহাঙ্গীর, শওকত আলী, এখলাস উদ্দিন আহমদ, হায়াৎ মামুদ, দ্বিজেন শর্মা, আবুল মোমেন, আবুল মনসুর প্রমুখ। এ ছাড়া, ভারতের নীলরতন মুখার্জি, অসীম রায়, প্রেমেন্দ্র মিত্র, মিহির সেন, লীলা মুজমদারসহ বেশ কিছু লেখকের বই বেরিয়েছে বইঘর থেকে।
প্রকাশিত উল্লেখযোগ্য বইয়ের মধ্যে রয়েছে সৈয়দ মুজতবা আলীর ‘পূর্ব পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা’, পূর্ণেন্দু দস্তিদারের ‘স্বাধীনতা সংগ্রামে চট্টগ্রাম’, আবুল ফজলের ‘রেখাচিত্র’, এখলাস উদ্দিন আহমদের ‘এক যে ছিল নেংটি’ ও ‘ছড়ায় ছড়ায় ছন্দ’, হায়াত মাহমুদের ‘রবীন্দ্রনাথের কিশোর জীবনী’।
খ্যাতিমান লেখক শিল্পীদের অনেকেই বিভিন্ন সময় চট্টগ্রাম এলে বই ঘরে উঠতেন, সৈয়দ শফির বাসায় আতিথেয়তা গ্রহণ করতেন। সৈয়দ শফির বাসায় এসেছেন – পল্লীকবি জসীম উদ্‌্‌দীন, শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদীন, কাইউম চৌধুরী, কামরুল হাসান, হাশেম খান, রফিকুন্নবী (রনবী), মুস্তফা মনোয়ার প্রমুখ। জয়নুল আবেদীন ও কামরুল হাসান তাঁর বাসায় বসে অনেক ছবি এঁকেছেন । হাশেম খান টাপুর টুপুর বইয়ের প্রচ্ছদসহ পুরো বইয়ের অলংকরণ করেছেন তাঁর বাসা থেকে। এছাড়া তাঁর বাসায় শিল্পী রশিদ চৌধুরী, আবুল বরকত অলিভি, শহীদ কাদরী এঁরাও এসেছিলেন।
উন্নত মানের বই প্রকাশ করা, বাজারজাতকরণ, সব কিছুই ভালো মনোযোগ ও পরিশ্রমের বিষয় ছিল তাঁর কাছে। ১৯৯০ সালের পর থেকে সৈয়দ শফির শারীরিক অসুস্থতা দেখা দেয়। পর্যায়ক্রমে চোখের অসুখ, হার্টের অসুখ, চোখ ও হার্টের অস্ত্রোপচার ইত্যাদি কারণে প্রকাশনা ব্যবসা গুটিয়ে আনেন।
কাজের স্বীকৃতি হিসেবে সৈয়দ মোহাম্মদ শফি ব্যক্তিগতভাবে এবং তাঁর প্রতিষ্ঠান বিভিন্ন সম্মাননা ও পুরস্কারে ভূষিত হয়েছে। ‘বইঘর ও ‘শিশুসাহিত্য বিতান’ ১৯৬৪ সাল থেকে বেশ কয়েক বছরই বইয়ের অঙ্গসজ্জা ও গঠন সৌকর্যের জন্য জাতীয় গ্রন্থকেন্দ্র থেকে পুরস্কার পেয়েছে।
১৯৫৯ সালে আবুল ফজল সংবর্ধনা, ১৯৬১ সালে সেন্ট প্ল্যাসিডস উচ্চ বিদ্যালয়ের রবীন্দ্র জন্মশতবার্ষিকী, ১৯৬৩ সালে চট্টগ্রাম মুসলিম হলে আবুল ফজল হীরকজয়ন্তী উদ্‌্‌যাপনে তাঁর সক্রিয় ভূমিকা ছিল। সৈয়দ মোহাম্মদ শফির প্রকাশনা জগতে প্রেরণা ও সাহস যুগিয়েছেন তাঁর সহধর্মিণী নাসিম বানু। তিনি ১৯৬১ সালে যশোরের ইতনা গ্রামের আবদুল কুদ্দুসের একমাত্র মেয়ে নাসিম বানুকে বিয়ে করেন । তিনিও একজন লেখিকা। প্রকাশনা জগতের অন্যতম পথিকৃৎ ও সংস্কৃতি সংগঠক এই গুণী ব্যক্তি ২০১৪ সালের ৯ অক্টোবর মৃত্যুবরণ করেন।
লেখক : সাংবাদিক