প্যানক্রিয়াটাইটিস নিরাময়ে হোমিওপ্যাথি

ডা. প্রধীর রঞ্জন নাথ

আদিমযুগে পরিপাক ব্যাপারটা মানুষ না বুঝলেও ধীরে ধীরে জেনেছিল কোন খাবারটা খাবে আর কোনটা খাবে না। অবশ্য হজম বলতে লোকে বুঝতো মানুষের আত্মার কাজ। শেষ পর্যন্ত ক্লড বার্নার ঊনবিংশ শতাব্দীর মাঝামাঝি পরিপাকে অগ্ন্যাশয়ের গুরুত্বের কথা প্রথম উল্লেখ করেন। এরপর বিজ্ঞান অনেক এগিয়েছে। এখনতো আমরা প্যানক্রিয়াটাইটিসের জন্য জিনও দায়ী এটা জানতে পেরেছি। তাই প্যানক্রিয়াটাইটিস নিরাময়ে হোমিওপ্যাথিক ওষুধের প্রয়োগ সংকেত নিয়ে আজকের নিবন্ধ।
প্যানক্রিয়াস বা অগ্ন্যাশয় উদর গহ্বরের উপর লিভারের বাম লোবের এবং পাকস’লীর নিচে অবসি’ত। এর দৈর্ঘ্য ১৫-২০ সেন্টিমিটার এবং ওজন ৭৫ থেকে ১০০ গ্রাম। প্যানক্রিয়াসের আকার দেখতে অনেকটা হাতুড়ির মতো। এক প্রান্ত অর্থাৎ মাথার দিকটা প্রশস্ত ও অন্য প্রান্ত লেজের দিকটা সরু। চওড়া দিক ডিওডেনামের বক্রভাগের মধ্যে এবং সরু দিকটা প্লীহার ও পাকস’লীর নিচে পৃষ্ঠদেশের ১ম লাম্বার-ভার্টিব্রার সম্মুখ অংশে বাম কিডনির উপর থাকে।
এর প্রধান কাজ খাদ্য পরিপাকে সাহায্য করা আর রক্তে গ্লুকোজের মাত্রা নিয়ন্ত্রণ করা। এই দুটো কাজের জন্য অগ্ন্যাশয়ের দুটো ভাগ-এক্সোক্রিন আর এন্ডোক্রিন। এক্সোক্রিন অংশ থেকে বের হয় লাইপেজ উৎসেচক যা চর্বি জাতীয় খাদ্য পরিপাকে সাহায্য করে। অ্যামাইলেজ উৎসেচক যা কার্বোহাইড্রেট জাতীয় খাদ্য পরিপাক করে আর ট্রিপসিন উৎসেচক যা কিনা প্রোটিন জাতীয় খাদ্যকে পরিপাক করে।
এন্ডোক্রিন অংশ থেকে নিঃসৃত হরমোন ইনসুলিন এবং গ্লুকাগন রক্তে শর্করার মাত্রা নিয়ন্ত্রণ করে। এক্সোক্রিন অঞ্চলে অ্যাসিনার কোষের মধ্যে জাইমোজেন দানা থাকে যার মধ্যে উৎসেচকগুলো থাকে। স্বাভাবিক অবস’ায় এই উৎসেচকগুলো নিষ্ক্রিয় থাকে। খাবার হজমের সময়ে উৎসেচকগুলো প্যানক্রিয়াস থেকে অন্ত্রের মধ্যে এসে পড়ে এবং সক্রিয় হয়। কিন’ বিভিন্ন কারণে এই উৎসেচকগুলো অগ্ন্যাশয়ের মধ্যে যদি সক্রিয় হয়ে ওঠে তখনই প্যানক্রিয়াটাইটিস (অগ্ন্যাশয়ের প্রদাহ) দেখা দেয়।
প্যানক্রিয়াটাইটিসের লক্ষণ: প্যানক্রিয়াটাইটিস দু’রকম হতে পারে। অ্যাকিউট (হঠাৎ) এবং ক্রনিক (দীর্ঘস’ায়ী)। অ্যাকিউট প্যানক্রিয়াটাইটিসে রোগীর পেটের খুব ভিতরে বেদনা অনুভব হয়, জ্বর থাকে, বমি হয়, অত্যন্ত অসি’রতা, ক্ষুধাহীনতা, কোষ্ঠবদ্ধতা, পিপাসা উদগার, ঘর্ম, ক্ষীণ নাড়ী, মাথা বেদনা এই লক্ষণগুলো প্রকাশিত হয়। যদি প্যানক্রিয়াটাইটিস তীব্র হয় তবে রোগীর শ্বাসকষ্ট, কিডনি ফেলিওর এবং জন্ডিস দেখা দিতে পারে। মলে চর্বির মতো বা তেলের মতো পদার্থ ও প্রস্রাবে শর্করা নির্গত হতে পারে। প্যানক্রিয়াটাইটিসের দ্বিতীয় সপ্তাহে রোগীর শরীরে ইনফেকশন ছড়িয়ে পড়তে পারে (সেপসিস)। অ্যাকিউট প্যানক্রিয়াটাইটিসের ৯০% রোগীরই রোগটা হালকা। এদের অধিকাংশই সুস’ভাবে বাড়ি ফিরে যান এবং ১০% রোগীর প্যানক্রিয়াটাইটিস হয় তীব্র। এদের প্রায় অর্ধেকের মৃত্যু হয়।
প্যানক্রিয়াটাইটিসের কারণ: অ্যাকিউট প্যানক্রিয়াটাইটিসের প্রধান কারণগুলোর মধ্যে প্রথমেই পড়ে অ্যালকোহল। কেউ একবার মাত্র বেশিমাত্রায় অ্যালকোহল খেয়েই প্যানক্রিয়াটাইটিসের শিকার হতে পারেন। আর বেশিমাত্রায় রোজ খেলে তো কথাই নেই। এই অ্যাকিউটটাই ক্রনিক হয়ে দাঁড়ায়। এছাড়া দ্বিতীয় কারণ হলো গলস্টোন।
গলব্লাডারের পাথর এবং পিত্তের মধ্যে থাকা ছোট ছোট বালির দানার মতো গুঁড়ো (বিলিয়ারি স্লাজ) পিত্তনালীতে এসে ব্লক করে প্যানক্রিয়াটাইটিস সৃষ্টি করে। সংক্রমণের মধ্যে মাম্পস্ কক্সসাকি-বি এন্টোরো ভাইরাস, ইনফ্লুয়েঞ্জা, মিজলস, ম্যালেরিয়া, টাইফয়েড উল্লেখযোগ্য অর্থাৎ এই ইনফেকশনগুলো থেকে প্যানক্রিয়াটাইটিস হতে পারে।
ওষুধের মধ্যে কিছু অ্যান্টিবায়োটিক, ক্যানসারের ওষুধ, খিঁচুনির ওষুধ, ব্যথার ওষুধ, আমাশয়ের ওষুধ, টিবির ওষুধ ও পারদ সেবন থেকেও প্যানক্রিয়াটাইটিস হতে পারে। মোটা মোটা মানুষের রক্তের লিপিডের গণ্ডগোলের জন্য প্যানক্রিয়াটাইটিস হয়।
গোলকৃমি পিত্তনালী বা অগ্ন্যাশয় নালীতে ঢুকে গেলেও প্যানক্রিয়াটাইটিস হতে পারে। এছাড়া জন্মগত কারণ, গঠনগত বিকৃতি, জিনের তারতম্য, পেটে চোট লাগা এবং শরীরে ক্যালসিয়ামের আধিক্যেও প্যানক্রিয়াটাইটিস হতে পারে। তাই রোগীর ইতিহাসটা জানতে পারলে রোগ নির্ণয় খুব সহজ হয়ে যায়। অবশ্য ২০-৩০ শতাংশ ক্ষেত্রে কোনো কারণই জানা যায় না। কোন রোগী কতটা মারাত্মক পর্যায়ে প্যানক্রিয়াটাইটিসে ভুগবে তা আগেই ঠিক করে দেয় জিন।
পরীক্ষা নিরীক্ষা: রক্তের অ্যামাইনেজ, লাইপেজ, শ্বেতকণিকার সংখ্যা, বুকের এক্স-রে, উপরের পেটের আলট্রাসনোগ্রাফি এবং সিটি স্ক্যান, লিভার ফাংশন টেস্টের মাধ্যমে রোগের তীব্রতা এবং ব্যাপ্তি সম্বন্ধে ধারণা করা যায়।
প্রাথমিকভাবে পরীক্ষা করতে হলে রোগীকে চিৎ করে শুইয়ে দুই হাঁটু উদরের দিকে গুটিয়ে কনুইয়ের স’ানে এনে পাকস’লীর নিম্নদিক দিয়ে হস্ত দ্বারা পরীক্ষা করলে পাকস’লীর নিচে কিঞ্চিৎ বামদিকে একটা শক্ত মোটা দড়ির মতো পদার্থ হাতে অনুভব হবে ও এটি জোরে টিপলে রোগী ব্যথার কথাও বলবে।
যোগব্যায়াম: নিম্নলিখিত আসন অভ্যাসে প্যানক্রিয়াসের কর্মদক্ষতা বৃদ্ধি করে। যেমন : শশঙ্গাসন, শলভাসন, ধনুরাসন, তোলাঙ্গুলাসন, পদহস্তাসন, সর্বাঙ্গাসন, বজ্রাসন, শবাসন ইত্যাদি।
হোমিওপ্যাথিক প্রতিবিধান: প্যানক্রিয়াটাইটিস নিরাময়ে হোমিওপ্যাথিতে অত্যন্ত ফলদায়ক ওষুধ আছে। অত্যন্ত বিচক্ষণতার সাথে লক্ষণ সাদৃশ্যে নিম্নলিখিত ওষুধ প্রয়োগে এই রোগ আরোগ্য হয়। যথা ১) বেলেডোনা ২) কার্ব্বোভেজ ৩) কার্বো-এনি ৪) ক্যালকেরিয়া ৪) মার্কুরিয়স ৫) কোনিয়াম ৬) লাইকোপোডিয়াম ৭) আয়োডাম ৮) আইরিস-ভার্স ৯) ব্যারাইটা-মিউর ১০) থুজা ১১) আর্সেনিক ১২) ফসফরাস ১৩) ক্যালিবাই ১৪) ইউরেনিয়াম নাইট্রিকাম ১৫) হিপার সালফার উল্লেখযোগ্য। তারপরও চিকিৎসকের তত্ত্বাবধানে থেকে ওষুধ সেবন করা উচিত।
লেখক : হোমিও চিকিৎসক ও কলামিস্ট

  1. লেখক এর যোগাযোগের ঠিকানা খুব জরুরী, মোবাইল নং বা যোগাযোগের ব্যবস্থা করে দিতে পারলে খুবই উপকৃত হতাম আমার মোবাইল নং-01916036472

আপনার মন্তব্য লিখুন