পুরো সিঙ্গাপুরই বন্দর! সাগর ব্যবহার করে বাড়ানো হচ্ছে আয়তন

ভূঁইয়া নজরুল, সিঙ্গাপুর ঘুরে এসে

সাগর ব্যবহার করে বেড়ে উঠছে দক্ষিণ পূর্ব এশিয়ার বৃহত্তম ও ব্যস্ততম বন্দর সিঙ্গাপুর। শুধু সাগর নয়, ১৯৬৫ সালে স্বাধীন হওয়া সিঙ্গাপুরের কয়েক ডজন ছোটো ছোটো দ্বীপ কাজে লাগিয়েও গড়ে উঠেছে বন্দর। ক্যাবলকার থেকে নিচের দিকে তাকালে সিঙ্গাপুর সিটির চারপাশেই দেখা যায় বন্দরের দৃশ্য। পুরো সিঙ্গাপুরটাই যেনো একটি বন্দর, যেখানে বছরে হ্যান্ডেলিং হয় গড়ে তিন কোটি ২২ লাখ ইউনিট কনটেইনার। এর বিপরীতে আমাদের দেশের ৯২ শতাংশ আমদানি-রপ্তানি পণ্য হ্যান্ডেলিং করা চট্টগ্রাম বন্দরে গত বছর হ্যান্ডেলিং হয়েছে ২৩ লাখ ৪৬ হাজার ৯০৯ একক কনটেইনার ।
বিশ্বের বিভিন্ন দেশ থেকে মাটি এনে সিঙ্গাপুরের আয়তন বাড়ানোর কথা জানান বাংলাদেশি এক ক্যাপ্টেন। ২০০৮ সালে অরিয়েন্ট শিপিং ম্যানেজমেন্ট (ওএসএম) নামের হংকংভিত্তিক একটি শিপিং কোম্পানিতে কাজ করতেন বাংলাদেশি ক্যাপ্টেন মামুনুর রশিদ। বর্তমানে দেশীয় কোম্পানি ভ্যানগার্ড শিপিং ম্যানেজমেন্ট প্রাইভেট লিমিটেডে কর্মরত এই ক্যাপ্টেন বলেন, ‘২০০৮ সালে আমরা বড় বড় জাহাজে করে ক্যাম্বোডিয়া থেকে মাটি এনে সিঙ্গাপুরে ব্রেক ওয়াটারের (বাঁধ) ভেতরে ফেলতাম। এতে সিঙ্গাপুরের স’লভাগের আয়তন বেড়েছে এবং বন্দরের জন্য বিভিন্ন স’াপনা তৈরি করা হয়েছে।’
তিনি আরো বলেন, বর্তমানে বাথুরান্তি নামক এলাকায় একটি দ্বীপের চারপাশে মাটি ভরাট করে বিশাল বন্দর গড়ে তোলার পরিকল্পনা নিয়ে মাটি ভরাটের কাজ করছে সিঙ্গাপুর।
এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ক্যাম্বোডিয়া, ভিয়েতনাম, মিয়ানমার ও ইন্দোনেশিয়াসহ বিভিন্ন দেশ থেকে নদীর ড্রেজিং করা মাটি এনে দেশটি সাগর ভরাট করতো। এখনো এই কার্যক্রম অব্যাহত রেখেছে।
গত সপ্তাহে সিঙ্গাপুর ভ্রমণের সময় সান্তোস দ্বীপ এলাকায় ক্যাবলকার থেকে দেখা যায়, সাগরের অংশে বাঁধ দেয়ার কাজ চলছে। আর স’লভাগের অংশে চলছে স্কেভেটর দিয়ে মাটি ভরাটের কাজ। উপর থেকে দেখা যায়, সিঙ্গাপুরের উভয় পাশেই চলছে বন্দরের কনটেইনার হ্যান্ডেলিং কার্যক্রম।
মাটি ভরাটের বিষয়টির সত্যতা পাওয়া যায় উইকিপিডিয়া থেকে প্রাপ্ত তথ্যানুসারে। সেখানে উল্লেখ রয়েছে, ১৯৬৫ সালে স্বাধীন হওয়া সিঙ্গাপুরের আয়তন ছিল ৫৮২ বর্গ কিলোমিটার। বিভিন্ন দেশ থেকে মাটি এনে ভরাটের মাধ্যমে বর্তমানে সিঙ্গাপুরের আয়তন বেড়ে হয়েছে ৬৯৯ বর্গ কিলোমিটার এবং ২০৩৩ সালের মধ্যে আরো ১০০ বর্গ কিলোমিটার আয়তন বাড়ানোর লক্ষ্যমাত্রা নিয়ে এগুচ্ছে দেশটি।
সিঙ্গাপুর বন্দরের কার্যক্রম প্রসঙ্গে জানতে চাইলে সিঙ্গাপুরের নাগরিকত্ব পাওয়া বাংলাদেশি সিঙ্গাপুর কার্গো শিপ প্রাইভেট লিমিটেডের পরিচালক ক্যাপ্টেন শওকত আলী বলেন, ‘দিনে ৫০০ জাহাজ হ্যান্ডেল করা সিঙ্গাপুর বন্দর সক্ষমতায় অনেক এগিয়ে। একটি জাহাজ থেকে পণ্য খালাসের জন্য একসাথে কাজ করে ৮টি গ্যান্ট্রি ক্রেন। আর ২৪ ঘণ্টার মধ্যে একটি জাহাজ থেকে কয়েক হাজার কন্টেইনার নামিয়ে আবার লোড করে দেয়ার ক্ষমতা রাখে সিঙ্গাপুর বন্দর।’
তিনি আরো বলেন, ‘দেশটির মধ্যে থাকা অসংখ্য দ্বীপকে তারা বন্দর হিসেবে ব্যবহার করছে। ভৌগোলিক অবস’ানগত কারণে এখান থেকে এশিয়া ও বিশ্বের অন্যান্য দেশের বন্দরগুলোতে সহজ যাতায়াত ব্যবস’া রয়েছে। জ্বালানি তেলের জন্য আন্তর্জাতিক রুটের অনেক জাহাজ এখানে ভিড়ে।’
সিঙ্গাপুর ভ্রমণের সময় কথা হয় সেখানে অবস’ানরত বাংলাদেশি শিপিং কোম্পানি পাইওনিয়ার শিপিং এজেন্সির ব্যবস’াপনা পরিচালক আবদুল খালেক পারভেজের সাথে। তিনি বলেন, ‘সিঙ্গাপুর বন্দর সক্ষমতায় এগিয়ে যাচ্ছে আর আমরা চট্টগ্রাম বন্দরে পিছিয়ে যাচ্ছি। আমাদের এখানে সিঙ্গাপুর থেকে পণ্য নিয়ে গিয়ে বহির্নোঙ্গরে অপেক্ষা করতে হয় ১২ থেকে ১৫ দিন আর জেটিতে গিয়ে আরো পাঁচ থেকে ছয় দিন। এভাবে একটি দেশের বাণিজ্যিক কার্যক্রম চলতে পারে না। ওদের একটি জাহাজ থেকে পণ্য খালাসের জন্য ৮টি গ্যান্ট্রি ক্রেন কাজ করলেও আমাদের চট্টগ্রাম বন্দরে রয়েছে চারটি গ্যান্ট্রি ক্রেন এবং এরমধ্যে আবার দুটি বিকল।’
তিনি আরো বলেন, ‘আমাদের বন্দরের সক্ষমতা বাড়াতে হবে। একইসাথে বহির্নোঙ্গর থেকে দ্রুত মালামাল নিয়ে যাওয়ার জন্য লাইটার জাহাজের (ছোটো জাহাজ) সংখ্যাও বাড়ানো প্রয়োজন। আর যদি বাড়ানো না যায় তাহলে মধ্যবর্তী সময়ের জন্য অন্য দেশ থেকে লাইটার জাহাজ ভাড়ায় নেয়ার অনুমোদন দেয়া যেতে পারে।’
উল্লেখ্য, সিঙ্গাপুর বন্দর থেকে বাংলাদেশসহ দক্ষিণ পূর্ব এশিয়ার দেশগুলোতে মাদার ভ্যাসেলের (বড় জাহাজ) মাধ্যমে কনটেইনার ও পণ্য এসে থাকে। এসব কনটেইনার ও পণ্য ফিডার ভ্যাসেলের (মাঝারি জাহাজ) মাধ্যমে চট্টগ্রাম আনা হয়। চট্টগ্রাম থেকে শিপিং কোম্পানিগুলো কনটেইনার ও পণ্য ফিডার ভ্যাসেলে করে সিঙ্গাপুর নিয়ে যায় এবং সেখান থেকে মাদারভ্যাসেলে উঠিয়ে দেয়া হয় পশ্চিমা দেশগুলোর বন্দরের উদ্দেশে।