পিতার স্মরণ

উৎপলকান্তি বড়ুয়া

-কেন ডেকেছো বলো তো দোয়েল?
টিয়ের প্রশ্নের সাথে সাথে ছোট্ট টুনটুনিও জানতে চায়।
-হ্যাঁ, কেনো ডেকেছো বলো না দোয়েল! চুপ করে আছো কেনো? একে একে তো আমরা সবাই এসে হাজির হলাম।
-তাইতো! আমরাতো অনেকেই একসাথে এসে হাজির হলাম তোমার কথা মতো। টিয়ে, পায়রা, চড়-ই, লোজঝোলা, কাক, ডাহুক একসাথে জানতে চায় আজ দোয়েল সবাইকে কেন এসে হাজির হতে বললো এখানে?
-কেন আসতে বলছি, সে তো বলবো। একটু অপেক্ষা করো। এখনও শালিক, ময়না, কোকিল,বক ওরা এসে উপসি’ত হয়নি। ওরা আসুক।
-কিন’ আমাদের সবাইকে হঠাৎ একসাথে আসতে বলার কারণটা তো বলো দোয়েল!
পায়রা দোয়েলকে প্রশ্ন করার এই ফাঁকেই শালিক, ময়না, কোকিল ও বক এসে হাজির হয়। সমস্বরে বলে ওঠে,
-এইতো! ওঠে আমরা এসে পড়েছি।
-হ্যাঁ, তোমরা সবাই এসে পড়েছো। তোমাদের ধন্যবাদ দিচ্ছি, তোমরা আমার ডাকে সাড়া দিয়েছো বলে।
-এবার তো বলো দোয়েল কেন আসতে বললে? কাকের যেনো তর সইছে না এবার।
-বলছি, শোনো।
সবাই দোয়েলের দিকে অধীর আগ্রহ নিয়ে তাকিয়ে আছে। দোয়েল বলতে থাকে।
-আমরা এখানে উপসি’ত সবাই এই অঞ্চলের বনে বাদারে, জলে-জঙ্গলে, নদী, ডোবা, ঝিলে, গাছ-গাছালিতে বসবাস করি। এখানে সুখে দুখে পাশাপাশি আদিজন্ম থেকে শুরু করে বাস করছি আমরা। আমরা যে মাটি, জল-জঙ্গল, গাছ-বন, আলো-হাওয়ায় আছি, এ অঞ্চলটার নাম বাংলাদেশ। আর এই সবুজ শোভাময় সজীব সুন্দর দেশের মাটি জল হাওয়া নদী বিল ঝিলে আমাদের নিত্য সুখের বসবাস। জানো তো, এই দেশের নাম বাংলাদেশ। মানুষদের পাশাপাশি আমাদেরও এই দেশ বাংলাদেশ। এই বাংলাদেশেই আমরা বাস করি।
-হ্যাঁ তাইতো জানি, আমরা বাংলাদেশে বাস করি। কোকিল খুব সহজ করে উপসি’ত সকলের মনের কথাটা বললো যেনো।
-তোমরা সকলে নিশ্চয়ই জানো, প্রতিটা দেশের মতো এ দেশেরও একজন স্রষ্টা আছে। তাঁকে জাতির পিতা বলা হয়ে থাকে। আর আমাদের এই বাংলাদেশে জাতির পিতা কে জানো তো!
-জানি তো! জানবো না কেনো? ওনার নাম বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। টিয়ে,পায়রা, টুনটুনি, ময়না ও বক প্রায় সমস্বরেই বলে ওঠে।
-জানো তো, আজ জাতীয় শোক দিবস। জাতির পিতা বঙ্গবন্ধুর শাহাদাত বার্ষিকী।
আজ আমরাও শোক দিবস পালন করবো। বঙ্গবন্ধুর স্বাধীন এই দেশে আমরাও স্বাধীন। এই দেশে বসবাসকারী হয়ে তাঁর উদ্দেশ্যে জাতীয় শোক দিবস পালন করা আমাদেরও কর্তব্য, তাই না। কি বলো তোমরা?
-হ্যাঁ হ্যাঁ হ্যাঁ। ঠিক ঠিক ঠিক। ঠিক বলেছো দোয়েল। আমরাও জাতির পিতার উদ্দেশ্যে জাতীয় শোক দিবস পালন করবো। উপসি’ত টিয়ে, পায়রা, টুনটুনি, চড়-ই, শালিকসহ সবাই একসাথে বলে ওঠে।
সবাইকে থামিয়ে দিয়ে কাক তার কর্কশ গলায় বলে,
– দেখো বন্ধুরা, মানুষরা কিন’ দোয়েলকে জাতীয় পাখির মর্যদা দিয়েছে। আমাদের পাখি কূলের মর্যদাকে অনেক উপরে তুলেছে।
সাথে সাথে লেজঝোলা তার লম্বা রঙিণ লেজ দুলিয়ে বলে উঠলো-হ্যাঁ, তাইতো! আমাদেরও কর্তব্য আছে। জাতির পিতাকে সম্মান করা। জাতীয় শোক দিবসে তাঁকে শ্রদ্ধা জানানো, তাঁকে স্মরণ করা।
-তা ছাড়া আমরাও তো এ দেশে বসবাসকারী। আমরাও জাতির পিতার স্বাধীন বাংলাদেশের পাখি। এ দেশের স্বাধীন আলো হাওয়ায় আমরা প্রতিদিন বাঁচি,জীবন যাপন করি। তাঁকে স্মরণ-শ্রদ্ধা করা অবশ্যই আমদেরও দায়িত্ব। পায়রা বাকুম বাকুম চমৎকার সুর তুলে কথাগুলো বলে।
-আমি জানতাম, তোমরা আমার কথা রাখবে। আজ,এখান থেকেই তাহলে শুরু হোক। জাতির পিতার প্রতি শ্রদ্ধা এবং স্মরণ আমরা আজ এখানেই করবো। আর তা এখনই।
– জানো, কচুরিপানা পুকুরের পাশেই খোকাটার পড়ার ঘর। আমি সে পাশ দিয়ে প্রায় সময়ই আসা-যাওয়া করে থাকি। সে খুব সুন্দর সুন্দর কবিতা পড়ে। আমি শুনি। আমার খুব ভালো লাগে। আজ যে কবিতাটা খোকার মুখে পড়তে শুনেছি সেটা জাতির পিতাকে নিয়ে লেখা কবিতা পড়ছিলো। সে সেটা তাঁর স্কুলে আজ জাতীয় শোক দিবসের অনুষ্ঠানে পাঠ করবে।
-ওমা তাই নাকি! বক ও চড়-ই একসাথে বলে ওঠে।
-তা হলে কবিতাটি আমাদের শোনাও দেখি তো। আমরা শুনি। কাক ও টিয়ে ডাহুককে খোকার আবৃত্তি করা কবিতাটি শোনানোর জন্য অনুরোধ করে।
ডাহুক আমতা আমতা করে বলে,
-পুরোটা হয়তো আমি খোকার মতো করে বলতে পারবো না। তবু যেটুকু মনে আছে তা চেষ্ঠা করতে পারি, বলেই কবিতা পড়া শুরু করে ডাহুক,
মুজিবুরের দু’চোখ ভরা / স্বপ্ন রঙিণ সাধ,
সহ্য না তাঁর মিথ্যে শাসন / শোষণ-অপবাদ।
দেশের মাটি মা বাবা তাঁর / দেশের মাটি মিত্র,
মুজিব মানে এই বাংলা / দেশেরই মানচিত্র।
-বাহ্বা খুব সুন্দর। খুব সুন্দর। বলে ময়না খুশিতে বেশ লাফিয়ে ওঠে। সাথে বাকী সকলেও খোকার কাছ থেকে শোনা কবিতাটা ডাহুকের মুখে শুনে প্রশংসা করে।
ডাহুকের কথা মতো উপসি’ত সকলেই জাতির পিতার উদ্দেশ্যে এক মিনিট দাঁড়িয়ে নিরবতা পালনের মাধ্যমে শ্রদ্ধা জ্ঞাপন করে।
শ্রদ্ধা জ্ঞাপন শেষে কোকিল সবার উদ্দেশ্যে বলে ওঠে, -চলো বন্ধুরা খোকার কাছ থেকে জানা ডাহুকের কাছে শোনা জাতির পিতাকে নিয়ে কবিতাটা আমরা সবাই একসাথে পাঠ করি।
-তাই তো! খুব সুন্দর প্রস্তাব! তাই হোক। বলে টুনটুনি যেনো খুশিতে লাফিয়ে ওঠে।
উপসি’ত টিয়ে, পায়রা, টুনটুনি, দোয়েল, চড়-ই, শালিক, লেজঝোলা, কাক, কোকিল, ময়না, বক ও ডাহুক সারা বন রাঙিয়ে সমস্বরে কবিতাটি আবৃত্তি করে-
দেশের মাটি মা বাবা তাঁর / দেশের মাটি মিত্র
মুজিব মানে এই বাংলা / দেশেরই মানচিত্র।