পাহাড় ধসে নিহত ১১

নিজস্ব প্রতিবেদক, রাঙামাটি

রাঙামাটিতে পাহাড় ধসে ১১ জনের মৃত্যু হয়েছে। নানিয়ারচর উপজেলায় মঙ্গলবার ভোররাতেই পৃথক চার স’ানে ১১ জনের মৃত্যু হয়েছে। নিহতরা হলেন নানিয়ারচর উপজেলার ৩ নম্বর বুড়িঘাট ইউনিয়নের ধর্মচরন কার্বারি পাড়ার স্মৃতি চাকমা (২৩), তার ছেলে আয়ুব দেওয়ান (দেড় বছর), ফুলদেবী চাকমা (৫৫) ও ইতি দেওয়ান (১৯), ধর্মচরণ ইউনিয়নের রমেল চাকমা (১৪), সুরেন্দ্র চাকমা (৫৫), রাজ্যদেবী চাকমা (৫০) ও সোনালী চাকমা (১৩), ঘিলাছড়ি ইউনিয়নের মনতলা পাড়ার বৃষ কেতু চাকমা (৬০), হাতিমারা পাড়ার রিপেন চাকমা (১৪), রীতা চাকমা (৮)। ২০১৭ সালের ১২ জুন ১২০ জনের মৃত্যুর ঠিক ৩৬৫ দিনের মাথায় আবারো পাহাড় ধসে প্রাণ গেল ১১ জনের।
নানিয়ারচর উপজেলার ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান কোয়ালিটি চাকমা জানিয়েছেন, গত তিনদিন ধরে টানা বর্ষণের কারণে উপজেলার বিভিন্ন স’ানে পাহাড় ধসের ঘটনায় এ দুর্ঘটনা ঘটে। নানিয়ারচর উপজেলায় অতীতে এমন ঘটনা না ঘটনায় প্রস’তিও তেমন একটা ছিলো না বলে জানান তিনি।
তিনি বলেন, দুর্ঘটনার স’ানগুলো একটির চেয়ে একটির দূরত্ব যেমন অনেক বেশি, আবার এলাকাগুলো দুর্গম, তাৎক্ষণিকভাবে উদ্ধার কাজও সম্ভব হয়নি।
রাঙামাটির জেলা প্রশাসক একেএম মামুনুর রশীদ জানিয়েছেন, নিহতদের সবার পরিবারকে ২০ হাজার টাকা করে বরাদ্দ দেয়া হয়েছে। আমরা পরিসি’তি মোকাবেলায় সর্বোচ্চ চেষ্টা চালাচ্ছি।
জেলা প্রশাসন ছাড়াও রাঙামাটি পার্বত্য জেলা পরিষদের পক্ষ থেকেও নিহতদের পরিবারকে ১০ হাজার টাকা করে অর্থ সহায়তা প্রদান করা হয়েছে বলে জানিয়েছেন রাঙামাটি পার্বত্য জেলা পরিষদ চেয়ারম্যান বৃষ কেতু চাকমা।
টানা বর্ষণে বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে রাঙামাটি জেলা। বিভিন্ন এলাকায় অন্তত ২৫টি স’ানে পাহাড় ধসের ঘটনা ঘটেছে। এতে কোন জানমালের ক্ষতি না হলেও ঝুঁকিতে পড়েছে অসংখ্য সরকারি-বেসরকারি স’াপনা। রাঙামাটি শহরের শাহ উচ্চ বিদ্যালয়, রাণী দয়াময়ী উচ্চ বিদ্যালয়সহ বেশ কিছু শিক্ষা প্রতিষ্ঠান পাহাড় ধসের কারণে ঝুঁকিতে পড়েছে। এছাড়া পরিবার পরিকল্পনা প্রশিক্ষণ কেন্দ্রের নবনির্মিত ভবনের বিশাল দেয়াল ধসে পড়েছে।
রাঙামাটি শহরের টেলিভিশন উপকেন্দ্র আশ্রয়কেন্দ্রে মঙ্গলবার বিকাল পর্যন্ত ১১০টি পরিবার আশ্রয় নিয়েছে, যাদের প্রায় সবাই পাশ্ববর্তী রূপনগর, শিমুলতলি এলাকার বাসিন্দা। এছাড়াও রাঙামাটি বেতারকেন্দ্র আশ্রয়কেন্দ্রেও শতাধিক পরিবার আশ্রয় নিয়েছে। পৌর এলাকায় প্রস’ত রাখা হয়েছে ২১টি আশ্রয়কেন্দ্র। রাঙামাটির আবহাওয়া পর্যবেক্ষণকেন্দ্র জানিয়েছে, সোমবার ভোর ছয়টা থেকে মঙ্গলবার ভোর ছয়টা পর্যন্ত রাঙামাটি জেলায় ২৫৪ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে।
রাঙামাটির জেলা প্রশাসক একেএম মামুনুর রশীদ জানিয়েছেন, ইতোমধ্যেই শহরের ঝুঁকিপূর্ণস’ানের মানুষকে সরে যেতে বলা হয়েছে। খোলা হয়েছে ২১টি আশ্রয়কেন্দ্রও। পর্যাপ্ত খাদ্য, অর্থ ও ওষুধ মজুদ আছে।’
রাঙামাটি-চট্টগ্রাম সড়ক ছাড়াও রাঙামাটি-খাগড়াছড়ি, রাঙামাটি-বান্দরবান সড়কের একাধিক স’ানে সড়কে ফাটল কিংবা ধসের কারণে যান চলাচল বিঘ্নিত হয়েছে। তবে প্রতিটি স’ানেই সেনাবাহিনীর সদস্যরা স’ানীয় এলাকাবাসীর সহযোগিতায় সড়ক চালু করার চেষ্টা চালাতে দেখা গেছে।
রাঙামাটি বাস মালিক সমিতির সভাপতি মঈনুদ্দিন সেলিম জানিয়েছেন, সড়কে সমস্যার কারণে আমাদের যাত্রীবাহী বাস গত দুদিন ধরে চলাচল বন্ধ আছে। তবে ছোট গাড়ি চলছে বলে জানিয়েছেন তিনি। রাঙামাটি সড়ক ও জনপদ বিভাগের উপ-সহকারী প্রকৌশলী আবু মুছা জানিয়েছেন, রাঙামাটি চট্টগ্রাম সড়কের ঘাগড়ার দেপ্প্যছড়ি, মগাছড়ি, বীরশ্রেষ্ঠ মুন্সী আব্দুর রউফ স্কোয়ার এলাকা, পাসপোর্ট অফিস এলাকাসহ বেশ কিছু স’ানে সড়কের ফাটল ও পাহাড় ধসের কারণে যোগাযোগ ব্যবস’া বিঘ্নিত হচ্ছে। তবে যান চলাচল স্বাভাবিক আছে।
এদিকে টানা বৃষ্টিপাতের কারণে ভয় ও উদ্বেগ ছড়িয়ে পড়েছে রাঙামাটিতে। এরই মধ্যে নানিয়ারচরে ১১ জনের মৃত্যুর ঘটনার পর আরো বেশি আতংকিত হয়ে পড়েছেন স’ানীয়রা। তবে আশাবাদের বিষয় হলো, মঙ্গলবার বিকাল তিনটার পর থেকে বৃষ্টি কমে আসায় ঘর ছেড়ে বাইরে বেরিয়ে আসতে থাকেন মানুষ।
শহরের রিজার্ভবাজার এলাকার বাসিন্দা রাজু শীল জানিয়েছেন, আমরা এখন বৃষ্টি হলেই আর রাতে ঘুমাতে পারিনা। রাঙামাটির মানুষের কাছে এখন বৃষ্টি ভয়ের আরেক নাম। একই কথা বলেছেন ভেদভেদী এলাকার বাসিন্দা সাইফুলউদ্দীনও। শুধু রাজু বা সাইফুল নয়, পুরো রাঙামাটিবাসীর ভয় আর উদ্বেগের কারণ এখন বৃষ্টি।