পাহাড়ের পাদদেশে ঝুঁকিপূর্ণ বসবাস বন্ধ করা জরম্নরি

মোহাম্মদ মনজুরম্নল আলম চৌধুরী

প্রতি বছর বর্ষার আগে প্রশাসন চট্টগ্রামের পাহাড় এবং পাহাড় পাদদেশে বসবাসরত মানুষের বসতি বসিত্ম বা বাড়িঘর উচ্ছেদের তোড়জোড় শুরম্ন করে। চট্টগ্রাম এবং পার্বত্য চট্টগ্রামে প্রায় প্রতি বছরই পাহাড় ধসে মানুষ মারা যায়। তখন চারিদিকে হৈ চৈ পড়ে যায়। শুরম্ন হয় নানানমুখি তৎপরতা। বসিত্ম আর ঘরবাড়ি চিরতরে উচ্ছেদের হুঙ্কার শোনা যায় প্রশাসন থেকে এবং রাজনৈতিক নেতাদের মুখ থেকে। বর্ষা বিদায় হয় উচ্ছেদ হওয়া মানুষগুলো আবার ধীরে ধীরে ফিরতে থাকে পুরানো সেই ঝুঁকিপূর্ণ বসতিতে। কেটে দেয়া পানি, গ্যাস, বিদ্যুতের সংযোগ আবার চালু হয়ে যায় অনেকটা যেন স্বয়ংক্রিয়ভাবে।
পাহাড় দখলকারী সিন্ডিকেটের অশুভ অপতৎপরতা, দখলদারিত্ব শুরম্ন হয় প্রশাসনের নাকের ডগায়। সেই আগের মতোই অবৈধ দখলে চলে যায় ঝুঁকিপূর্ণ পাহাড় ও পাহাড় পাদদেশ। নিম্ন আয়ের অভাবী মানুষও ভুলে যায় মর্মানিত্মক দুর্ঘটনায় নিহত স্বজনদের কথা। আবার নতুন করে শুরম্ন করে জীবন সংগ্রাম ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায়। প্রতি বছরেই পাহাড় ধসে অস্বাভাবিক, অনভিপ্রেত ও অনাকাঙিড়্গত মৃত্যু ঘটে থাকে মানুষের। তারপরেও উচ্ছেদের পর বার বার এরা ফিরে আসে সেই মৃত্যুকূপে। ২০১৭ সালের ১৪ অক্টোবর দিবাগত রাত ১ টার দিকে ফিরোজশাহ কলোনির ১ নম্বর ঝিলে পাহাড় ধসে ৩ জনের প্রাণহানির ঘটনা ঘটে আর সেটিই ছিল পাহাড় ধসের সর্বশেষ দুর্ঘটনা।
রাজনৈতিক এবং স’ানীয় প্রভাবশালী মহল পাহাড় কেটে বা পাহাড়ের পাদদেশ দখল করে যুগের পর যুগ ঘরবাড়ি বানিয়ে তা ভাড়ায় দিয়ে রেখেছে বা নিজেরা ভোগ দখল করে আসছে। এক তথ্য থেকে জানা যায়, চট্টগ্রাম মহানগরী এবং আশেপাশে প্রায় ৫০০ পাহাড় রয়েছে সরকারি ও বেসরকারি মালিকানাধীন। ভয়ানক তথ্য হচ্ছে এসবের মধ্যে ২৮ টি পাহাড় হচ্ছে অতি ঝুঁকিপূর্ণ যেখানে ৬৮৪ টি পরিবার বসবাস করছে প্রতিনিয়ত মৃত্যুঝুঁকি নিয়ে।
পাহাড় দখল কাটা ও ধ্বংসে রাজনৈতিক, সামাজিক ও বিত্ত বৈভবে বলীয়ান প্রভাবশালী ব্যক্তি এবং বিভিন্ন সংস’া ও প্রতিষ্ঠানের কতিপয় নীতিবিবর্জিত কর্মকর্তা কর্মচারী এই দখলদারিত্ব ও দুর্বৃত্তায়নের সাথে জড়িত বলে জানা যায়। পরিবেশ অধিদপ্তর চট্টগ্রামে অদ্যাবধি পাহাড় কর্তন বন্ধ করতে পারেনি। ভূমিদস্যুরা রাতের আঁধারে কখনও বা প্রকাশ্য দিবালোকে পাহাড় কেটে সাবাড় করে দিচ্ছে। পাশাপাশি পাহাড়পাদদেশ কেটে সমতল করে দখল করে ঘরবাড়ি তুলছে। সবুজ গাছপালা, লতাপাতা সমানে কেটে চলেছে। কীটপতঙ্গ, বিভিন্ন প্রজাতির জীবজন’ ও প্রাণি এতে হারিয়ে যাচ্ছে যা দেশের পরিবেশ ও প্রতিবেশের অপূরণীয় ড়্গতিসাধন করছে।
ভারসাম্যহীন করে তুলছে দেশের পরিবেশ ও প্রতিবেশকে। দেশের জীব বৈচিত্র্য ও বিভিন্ন বিরল প্রজাতির প্রাণি ধীরে ধীরে বিলুপ্ত হয়ে যাচ্ছে। আবার চট্টগ্রাম, পার্বত্য চট্টগ্রামসহ দেশের বিভিন্ন পাহাড়ি এলাকা ধবংসের পাশাপাশি মানুষের বসবাসের হুমকি এবং ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠছে। এদিকে ১২ লাখ বাসত্মুচ্যুত রোহিঙ্গাদের আশ্রয় দিয়ে কক্সবাজার, উখিয়া ও টেকনাফের পাহাড় এবং সংরড়্গিত সব বনাঞ্চল ইতোমধ্যে উজাড় হয়ে গেছে। যা দেশের প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের জন্য আরেকটি বিরাট হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে।
দেশের প্রচলিত এবং বিরাজমান আইনের মাধ্যমে পাহাড় কাটা, পাহাড় দখল, পাহাড় পাদদেশে ঝুঁকিপূর্ণ বসবাস বন্ধ করার যথেষ্ট সুযোগ রয়েছে বলে বিশেষজ্ঞ মহলের অভিমত। বিভিন্ন পাহাড় ও পাহাড় পাদদেশে বসবাসরত মানুষের ঘরবাড়ি উচ্ছেদ করে তা প্রশাসনের কর্তৃত্বে নিয়ে আসতে হবে। এসব জায়গায় বিদ্যুৎ, পানি, ওয়াসা সহ সকল সেবা প্রদানকারী সংস’া ও প্রতিষ্ঠানকে পুনরায় সংযোগ প্রদান থেকে বিরত রাখার জন্য কঠিন ও কঠোর শাসিত্মর বিধান করা খুব জরম্নরি হয়ে উঠেছে। অবৈধ দখলকারীরা রাজনৈতিক, আর্থিক ও সামাজিকভাবে যত প্রভাবশালী হউক না কেন চট্টগ্রামের কর্ণফুলী ও ঢাকার বুড়িগঙ্গা নদীর অবৈধ উচ্ছেদের মতো কঠোরভাবে সকল প্রভাব প্রতিপত্তি, রাজনৈতিক আশ্রয় প্রশ্রয় ও রক্তচড়্গুকে উপেড়্গা করে উচ্ছেদ কার্যক্রম পরিচালনা করতে হবে অবাধে, নির্বিঘ্নে ও নির্ভয়ে।
প্রশাসন বেসরকারি পাহাড়ের মালিকদেরকে তাঁদের জায়গা বুঝিয়ে দিয়ে তাতে যেন আর কোন অবৈধ দখলদার আবার দখল করতে না পারে সেব্যাপারে তাদেরকেও সতর্ক করে দিতে হবে। পাশাপাশি তাঁরা নিজেরাও যেন পাহাড় কাটতে না পারে সে ব্যাপারে যথাযথ ব্যবস’া ও কার্যকর উদ্যোগ গ্রহণ করতে হবে। জেলা প্রশাসন এবং পরিবেশ অধিদপ্তরকে অবশ্যই তাঁদের দায়িত্ববোধ ও কর্তব্যবোধ সততা, নিষ্ঠার সাথে এবং সকল লোভ লালসার ঊর্ধ্বে উঠে পালন করতে হবে।
কঠোর নজরদারিতে রাখতে হবে দেশের সকল পাহাড় পর্বতমালাকে। আইনের নির্মোহ, প্রভাবমুক্ত প্রয়োগ করার পাশাপাশি পাহাড় কাটা, দখলের বিরম্নদ্ধে সজাগ ও সতর্ক দৃষ্টি রাখতে হবে সংশিস্নষ্ট সকলকেই। কেউ পাহাড় কাটা বা অবৈধ দখল করতে এলে সাথে সাথে তা প্রতিরোধের ব্যবস’া করে দখলদারদেরকে আইনের আওতায় আনতে হবে।
মানুষকে আইনের সুষ্ঠু প্রয়োগ এবং কঠোর শাসিত্মর বিধান ছাড়া পাহাড় কাটা, পাহাড় বা পাহাড় পাদদেশে অবৈধ বসবাস থেকে বিরত রাখা যাবে না। দেশ ও জনগণের জানমালের নিরাপত্তার খাতিরে দায়িত্বপ্রাপ্ত সকল সরকারি প্রতিষ্ঠান ও সংস’া তাদের ওপর অর্পিত দায়িত্ব ও কর্তব্য পালনে সজাগ, সতর্ক, সচেতন হবে বলে জাতির প্রত্যাশা।
লেখক : প্রাবন্ধিক