পাহাড়ধসের ঝুঁকিতে ৬ হাজার পরিবার লামায়

এম. বশিরুল আলম, লামা
lama-pahar-photo,18-jun'17

লামায় ছোটবড় পাহাড়ে জনবসতির ইতিহাস প্রায় ৫ দশকেরও বেশি সময় ধরে। এখানকার ৯০ ভাগ মানুষ পাহাড়ের চূড়া ও কোলঘেঁষে বসবাস করে আসছে। বান্দরবানের পাহাড়ি জনপদ লামা উপজেলা। বর্ষা মৌসুম এ অঞ্চল পরিণত হয় আতঙ্কিত জনপদে। তবে পরপর কয়েক বছরের পাহাড়ধস ট্রাজেডির কারণে এ পার্বত্য জনপদে বসবাসকারী অধিবাসীরা এখন পাহাড় দেখলে রীতিমত আঁতকে ওঠে। একের পর এক পাহাড়ধসে প্রাণহানির মত মানবিক বিপর্যয় ঘটলেও সরকারের পক্ষ থেকে নেয়া হয়নি পরিকল্পিত বসবাস কিংবা ঝুঁকিপূর্ণ বসবাসকারীদের নিরাপদে সরিয়ে নেওয়ার ব্যবস্থা।
প্রতি বছর মৌসুমের এই সময়টাতে এই উপজেলা পাহাড়ধসে প্রাণহানির ঘটনা ঘটে। সর্বশেষ গত বছরের জুলাই মাসে লামা উপজেলার হাসাপাতাল পাড়া এলাকায় একই পরিবারের ৫ জনসহ ৬ জন শিশু-নারী পাহাড় ধসে প্রাণ হারায়। এর আগে ২০১২ সালে পাহাড় ধসে ফাইতং ইউনিয়নে একই পরিবারে ১১ জনসহ তিন ইউনিয়নে ২৯ জন মানুষ প্রাণ হারায়। আহত হয়ে পঙ্গুত্ব বরণ করে অর্ধশতাধিক মানুষ। পরপর কয়েক দফা প্রকৃতির প্রাণঘাতি আচরণেও টনক নড়েনি এই উপজেলার পাহাড়খেকো, পরিবেশ বিদ্বেষীদের।
সামপ্রতিক টানা কয়েক দিনের হালকা ও মাঝারি বৃষ্টিপাতে শহর এলাকাসহ বিভিন্ন স্থানে ইতিমধ্যে পাহাড়ধস শুরু হয়েছে। বর্ষার শুরুতেই ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীকে উপজেলা প্রশাসন ও পৌরসভার পক্ষ থেকে মাইকিং করে নিরাপদ স্থানে সরে যেতে বলা হয়েছিল। কিন্তু এখনো কেউ নিরাপদে সরে যায়নি। স্থায়ীভাবে পুনর্বাসন করা না হলে পাহাড় ছাড়তে নারাজ ঝুঁকিতে বসবাসকারীরা। এখনি পাহাড়ের মৃত্যুঝুঁকিতে বসবাসকারী ওইসব পরিবারগুলোকে নিরাপদে সরিয়ে না নেয়া হলে আবারো পাহাড়ধসে মানবিক বিপর্যয়ের আশঙ্কা করছেন স্থানীয়রা।
সরেজমিন পরিদর্শনে দেখা গেছে, লামা পৌর শহরের হাসপাতাল পাড়া, বরিশাল পাড়া, বড় নুনারবিল পাড়া, চাম্পাতলী, নয়াপাড়া, সাবেক বিলছড়ি ও ছাগলখাইয়া এলাকায় পাহাড়ধস ঝুঁকিতে বসবাস করছে কয়েকশ পরিবার। এসব পরিবারের ঘরগুলোর কিছু পাহাড়ের পাদদেশে, কিছু খাঁজে আবার কিছু চূড়ায়। এভাবে উপজেলার আজিজনগর, ফাইতং, রুপসীপাড়া, লামা সদর, গজালিয়া ও ফাঁসিয়াখালী ইউনিয়নের দুর্গম পাহাড়ি এলাকার পাহাড় কেটে অপরিকল্পিতবাবে ঘরবাড়ি তৈরি করে বসবাস করে আসছে তিন হাজারেরও বেশি পরিবার। তাদের বেশির ভাগই হতদরিদ্র মানুষ। এসব পাহাড়ধসের ঝুঁকিতে থাকা মানুষের জন্য বর্তমানে উদ্বিগ্ন উপজেলা ও পৌরসভা প্রশাসন। পাহাড় কেটে বসবাসকারী হাসান, আমির আলমগির জানান, আমরা গরিব মানুষ। এখানে সমতলের জমির দাম আকাশওছোঁয়া। এত দরে আমাদের পক্ষে জমি কেনা অসম্ভব। তাই পাহাড়ের জমি কিনে বসবাস করছি। সচেতনমহল জানিয়েছেন, উপজেলার বিভিন্ন ইউনিয়নের পাহাড়ে অতিঝুঁকি নিয়ে বসবাসকারী এসব পরিবারে যে কোনো সময় বড় ধরনের বিপর্যয় নেমে আসতে পারে।
আজিজনগর ইউপি চেয়ারম্যান আলহাজ মো. জসিম উদ্দিন কোম্পানি জানান, নানা কারণে দরিদ্রতার রোষানলে পড়ে এখানকার মানুষগুলো সমতলে জমি কিনতে পারছে না বিধায় ঝুঁকিপূর্ণ ঘর ছেড়ে নিরাপদে আশ্রয় নেওয়া তাদের পক্ষে কোনো ক্রমেই সম্ভব হচ্ছে না। তবে ঝুঁকিপূর্ণ পরিবারগুলোকে নিরাপদ স্থানে গিয়ে আশ্রয় গ্রহণের জন্য দফায় দফায় তাগিদ দেওয়া হচ্ছে।
এদিকে লামা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা খিন ওয়ান নু বলেন, পাহাড়ে ঝুঁকিপূর্ণ বসবাসকারীদের সরে যেতে মাইকিংয়ের মাধ্যমে বারবার তাগিদ দেয়া হচ্ছে এবং এলাকায়-এলাকায় গিয়ে জন প্রতিনিধি, গণ্যমান্য ব্যক্তি ও পাহাড়ের পাদদেশে বসবাসকারীদের নিয়ে জনসচেতনতামূলক উঠান বৈঠক করা হচ্ছে।