পাঠদানে ‘নাট্যপদ্ধতি’

শামসুদ্দীন শিশির

পাঠদানে নাট্য পদ্ধতির ব্যবহার বেশ গুরুত্বপূর্ণ। শিক্ষার্থীদের সামনে সমাজের বিমূর্ত বিষয়গুলোকে নাটিকার মাধ্যমে উপস্থাপন করে সহজে হৃদয়ঙ্গম করার মাধ্যমটি বেশ গ্রহণযোগ্যতা পেয়েছে। আমাদের চট্টগ্রামে ‘বিটা’ দীর্ঘদিন থেকে এ কাজ নিরলসভাবে করে যাচ্ছে। কিছুদিন আগে অর্থাৎ ২৭ নভেম্বর’ ২০১৬ বিটা এবং অলিয়ঁস ফ্রাঁসেস এর যৌথ উদ্যোগে থিয়েটার এডুকেশন ডে, উপলক্ষে একটি সেমিনারের আয়োজন করা হয়। সেমিনারে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপক ছিলেন বিটা’র নির্বাহী পরিচালক শিশির দত্ত। আলোচক ছিলেন ড. কুন্তল বড়ুয়া, রনজিৎ রক্ষিত, অঞ্চল চৌধুরী, শুভেচ্ছা বক্তব্য প্রদান করেন অলিয়ঁস ফ্রঁসেস-এর পরিচালক। নাটকের মাধ্যমে উঠে আসে সমাজচিত্র, মানুষের দৈনন্দিন জীবনাচার এবং সামাজিক বৈষম্যের কথা। তাৎক্ষণিক একটি নাটকের মাধ্যমে বাল্যবিবাহের কুফল সম্পর্কে স্কুল শিক্ষার্থীদের বাস্তব ধারণা দেয়া হলো। স্কুলের শিক্ষার্থীরাই নাটকে অংশ গ্রহণ করেছে। দর্শকরা চমৎকারভাবে উপভোগ করেছেন।
শিশুরাই তাদের অধিকারের কথাগুলো নাটকের মাধ্যমে উপস্থাপন করতে পারে। যেমন শিশুদের খাদ্যের অধিকার, বস্ত্রের অধিকার, তাদের শিক্ষা লাভের অধিকার, মিলেমিশে বসবাসের অধিকার, নিরাপত্তালাভের অধিকার এবং চিকিৎসা পাওয়ার অধিকার।
নাটক একটি শিল্প। মানুষ শিল্প থেকে আনন্দ পায়। আনন্দ উৎস থেকে আসে জ্ঞান। অপার ইতিবাচক জ্ঞানও মানুষকে সৃষ্টিশীল করে তোলে। আনন্দ ও জ্ঞান মানুষকে নতুন পথ-মত সৃষ্টির নির্দেশনা দেয়। নাটকও তেমনি আনন্দের মধ্যদিয়ে সামাজিক বাস্তবতাকে তুলে ধরে মানুষকে আনন্দ দেয়। সাথে সাথে সামাজিক বৈষম্যের বার্তাও পৌঁছিয়ে দেয়। এর থেকে পরিত্রাণের উপায়ও বাতলিয়ে দেয়। এ্যারিস্টটল বলেছেন, এই অনুকরণের বিষয় হলো মানুষ ও তার ক্রিয়াকলাপ। নাট্যে ক্রিয়াশীল মানুষেরই অনুকরণ হয়। ফলে শিল্প একদিকে যেমন ভাবের ও বোধের কর্ম অন্যদিকে শিল্প একটি বৌদ্ধিক কর্ম।
তথ্যপ্রযুক্তির সঠিক ব্যবহার অর্থাৎ শিক্ষার্থীর বুঝে নেওয়ার ক্ষমতা অনুসারে এই মাধ্যমের ধারাবাহিক পর্যায় এবং সৃজনশীল শিক্ষাদান পদ্ধতি শৈশব থেকেই শিক্ষার্থীদের মনে স্থায়ী দাগ কাটতে সাহায্য করে। উন্নতিশীল দেশসমূহে ক্লাশরুম হচ্ছে শিক্ষা, সামাজিক ও বৈশ্বিক পাঠশালা। তারা এখানে ডকুমেন্টরি ফিল্ম, কার্টুন, পাপেট শো, থিয়েটার পদ্ধতির মাধ্যমে চারপাশের প্রকৃতি, জীবন, ও জ্ঞান – বিজ্ঞানের নানা বিষয়ের সাথে পরিচিতি লাভ করে, এ ভাবেই তাদের কাছে শিক্ষা আনন্দদায়ক জ্ঞানচর্চার বিষয় হয়ে ওঠে।
আমাদের দেশে এখন শৈশবেই শিক্ষাকে আনন্দের সাথে নিতে নানা মহল থেকে বলা হচ্ছে, সরকারও বেশ কিছু কর্মসূচি নিয়েছে, তবে আমাদের অবকাঠামোগত ঘাটতি একটি বড় সমস্যা, পাঠদানে সৃজনশীল শিক্ষকের অভাবও রয়েছে। আমাদের দেশের শিক্ষার সাথে সংশ্লিষ্ট পক্ষ এবং শিক্ষকরা পাঠদানে এখনো সনাতন পদ্ধতিকেই আঁকড়ে আছেন। শিক্ষার্থীর ওপর নানা বিধিনিষেধ আরোপ, তাদের ব্যর্থতায় শাস্তি দান, মুখস্থ শিখে আসা এবং কিছু নির্ধারিত বই থেকে তাদের জ্ঞানের পরিধি নির্দিষ্ট করে দেয়া ইত্যাদি। এক্ষেত্রে আমাদের শিক্ষাপদ্ধতি, শিক্ষাব্যবস্থা ও শিক্ষাদানের উদ্যোগে বৈচিত্র্যের অনুপস্থিতি ও প্রকট।
এক্ষেত্রে আলোচ্য ‘নাট্য’ পদ্ধতিকে একটি সৃজনশীল উদ্যোগ হিসেবে আখ্যায়িত করা যেতে পারে। শিক্ষক প্রশিক্ষণে শিক্ষাদানের সৃজনশীল মাধ্যমের ব্যবহার অন্তর্ভুক্ত করা যেতে পারে কিংবা বিশেষজ্ঞদের নিয়ে তাঁদের জন্য স্বল্পকালীন কোর্স ও হতে পারে। শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে এখানে অন্তত মাসে ১ দিন বিশেষ ক্লাস নিয়ে এটি করা যেতে পারে। শিক্ষার্থীরা অভিনয় চর্চায় যুক্ত হবে। যে সব বিষয় আমাদের পরিবার, সমাজ, রাষ্ট্রে সংকটের সৃষ্টি করছে সেগুলির সাথে প্রত্যক্ষ পরিচয় ঘটাতে এবং তা থেকে প্রতিকারের পথ চিহ্নিত করতে এ ধরনের মূর্ত শিক্ষা মাধ্যম এখন সময়োপযোগী। সেই সাথে সৃজনশীল নানা মাধ্যমে এসবের চর্চা চলতে পারে।
‘বাংলাদেশে শিক্ষাদানে নাট্য পদ্ধতি : প্রয়োগ ও সম্ভাবনা’ গ্রন্থে হালিম প্রামাণিক নাট্যদান পদ্ধতির ভাবনার তত্ত্বগত ধারণায় লিখেছেন, ‘থিয়েটার বা ‘নাট্য’ এমনি একটি শিল্প মাধ্যম বা ঘটমান প্রক্রিয়া। একটি নির্দিষ্ট স্থানে, নির্দিষ্ট সময়ে দর্শক সম্মুখে জীবন্ত মানুষের সাথে জীবন্ত মানুষের ক্রিয়া প্রতিক্রিয়া। যেমন চিত্রকরের অন্যতম মাধ্যম রং, ভাস্করের মাটি, পাথর কিংবা কংক্রিট সাহিত্যিকের শব্দ। থিয়েটারের মাধ্যম জীবন্ত মানুষ। অন্যান্য সকল শিল্পকর্মের মত থিয়েটার সৃষ্টি করা হয় মানুষের জন্যই।
তাই বলা হয় থিয়েটার খেলার মতোই একটি খেলা। খেলা বলেই এর জন্য চর্চা, পুনর্নির্মাণ ও সহযোগিতা দরকার হয়। এ খেলায় দর্শকবৃন্দের সাথে অভিনেতাদের ক্রিয়া প্রতিক্রিয়ায় জীবন্ত প্রবাহ সৃষ্টি হয়।
তাই থিয়েটার বা নাটক আজও সমাজের মানুষের প্রয়োজনে, শুধুমাত্র নিছক আনন্দদানের জন্য নয়, তা শিক্ষাদানের জন্যও টিকে আছে। প্রাচীন গ্রিক নাট্যে লক্ষ্য করা যায় সেই সমাজের জীবনদর্শন ও সমাজব্যবস্থার শ্রেণিবৈষম্য ও শ্রেণিদ্বন্দ্ব। মধ্যযুগে নাট্যের মাধ্যমে গির্জা অভ্যন্তরে সাধারণ মানুষকে ধর্মীয় শিক্ষাদান করা হতো। যিশু খ্রিষ্টের জন্ম, মৃত্যু ও পুনরাবির্ভাবের মহিমান্বিত জীবনকাহিনী, যিশুর শিষ্য সাধু সন্তদের জীবনকাহিনী এবং মানুষের নৈতিক গুণাবলীর সমন্বয়ে নাটকগুলো উপস্থাপিত হতো। অপরদিকে মধ্যযুগে বাংলার লৌকিক নাট্যাভিনয়ে লোকশিক্ষার বিষয়টি সুস্পষ্ট প্রতীয়মান।
অতএব, আমাদের সমাজ-সংস্কৃতির বৈষম্যগুলো, আনন্দগুলো নাটকের মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের উপস্থাপনের ফলে বিষয়ের বিমূর্ত দিকগুলো সহজেই শিক্ষার্থীদের কাছে মূর্ত হয়ে উপস্থাপিত হবে। সে দিকে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিবর্গ, সরকারের নীতিনির্ধারকদের দৃষ্টি আকর্ষণ করছি। পিছিয়েপড়া জনগোষ্ঠীর সন্তানদের কাছে স্বল্প সময়ে অনেক বেশি বার্তা পৌঁছে দেওয়ার জন্য পাঠদানে নাট্য পদ্ধতি ফলপ্রসূ অবদান রাখবে।
লেখক : শিক্ষক, শিক্ষাগবেষক

আপনার মন্তব্য লিখুন