পাখি চায় উড়তে

কানিজ ফাতিমা

দূরের আকাশ, গাছ-গাছালি, খেলারমাঠ আর ওই যে দূরে দেখা যাচ্ছে ইশকুল, দূর থেকেও ঢং ঢং ঢং ঘণ্টার শব্দ শোনা যায়, যেখানে হাজার হাজার শিশুরা লেখাপড়া করে, আনন্দ উল্লাস করে, সেখানেই পড়ে থাকে পাখির মন। চার দেয়ালের বন্দি খাঁচায় পাখির দম আটকে যায়। পাখি চায় উড়তে, ডানা মেলে উড়তে।
প্রতিদিন ভোরে ঘুম থেকে উঠে প্রথমেই সাহেবদের ঘরের কাজের জন্য ছুটতে হয় তাকে। কচি কচি দুটি হাতে ছাই আর সাবানে হয় মাখামাখি। পাখি গুন গুন করে ছড়া কেটে কাজ করে।
আমি হব সকাল বেলার পাখি
সবার আগে কুসুমবাগে উঠবো আমি ডাকি।
মনে মনে ভাবে, ইশ্‌ যদি আমি ইশকুলে যেতে পারতাম তাহলে কত ছড়া আর কবিতা শিখতে পারতাম! লিখতে পারতাম! কত বন্ধু থাকতো! ইশকুলের মাঠে খেলতে পারতাম!
পরক্ষণে আবার ভাবে,
যদি সত্যিই পাখি হতাম। আমার দুটি পাখনা থাকতো ঠিক দূরের ওই পাখিটার মতো! তাহলে কত্ত মজাই না হতো। আমি উড়ে যেতাম! আর উড়ে যেতাম। ঘুরে বেড়াতাম পুরো আকাশ জুড়ে। কেউ আমাকে ধরতে পারতো না। সবাইকে ফাঁকি দিয়ে সারাদিন শুধু ঘুরতাম।
মাকে কতবার বলি, এইসব কাজ আমার ভালো লাগে না। আমার পড়তে মন চায়। আমি ইশকুলে যাবো। অমনি মা বলে, ওসব নাকি আমাদের জন্য নয়। আমরা নাকি গরিব। শহরে আসার পর থেকে মাও যেন কেমন হয়ে গেছে। সারাদিন শুধু কাজ আর কাজ। তার চেয়ে গ্রামে ছিলাম, ভালো ছিলাম। আহা! কত সুন্দর আমাদের গ্রাম। সকাল বেলা পাখির গানে ঘুম ভাঙতো। আর রাতে জোছনা দেখতে দেখতে ঘুমিয়ে পড়তাম। সারাটা দিন শুধু পাখির মতো ডানা মেলে উড়তাম। একদিন মা বলেছিলো, আমার ডানা কেটে দেবে। আজ মনে হয় আমার ডানা সত্যিই কেটে গেছে। ইচ্ছে হলেই আমি আর উড়ে যেতে পারি না। সারাদিন শুধু কাজ আর কাজ। বেগম সাহেবের মেজাজ খুব চড়া। একটু থেকে একটু হলেই দুই গালে ঠুস ঠাস বসিয়ে দেন। মা বলে গরিব হয়ে জন্মালে নাকি মার খেতে হয়। মা বলেন, একদিন আমার সব সয়ে যাবে।
একদিন মা কে ফাঁকি দিয়ে আমি সত্যি সত্যি উড়ে যাবো। কেউ আমাকে ধরতেও পারবে না।
একদিন পাখির মা পাখিকে একটি নতুন বাসায় নিয়ে গেলেন। বললেন, এখন থেকে এটাই তোর বাড়ি। সাহেবদের কথা মতো কাজ করবি। দু’বেলা পেট ভরে খেতে পারবি। পাখি তার মাকে জাপটে ধরে বললো,
-মা তোমাকে ছাড়া আর ছোট ভাইটাকে ছাড়া আমি থাকতে পারবো না।
-দেখ পাখি, পাগলামি করিস না। আমি তোদের দু’জনকে খাওয়া পরন দিতে পারবো না। তুই এখানে খুব ভালো থাকবি। আমি মাঝে মাঝে তোকে দেখতে আসবো।
সেই যে গেলো আর কোনদিন ফিরে এলো না। তখন থেকে সাহেবদের সিঁড়ির নিচের ছোট ঘরটাই পাখির বন্দি খাঁচা। ইচ্ছে হলেই পাখি উড়ে যেতে পারে না। জীবনটা আরো সংকীর্ণ হয়ে গেলো তার। সারাদিন শুধু কাজ আর কাজ। একটুও অবসর নেই। পাখি ভুলে গেছে তার নাম ‘পাখি’। ভুলে গেছে কবিতা , যা সে গুন গুন করতো। আজ কাজের ফাঁকে মায়ের কথা খুব মনে পড়ছে পাখির। সকাল থেকেই শরীরটা আর যেন চলছে না। সকালবেলা কাজ করতে গিয়ে দুধের বাটিটা হাত ফসকে পড়ে গেছে। আর সেজন্য অনেক মারও সহ্য করতে হয়েছে পাখিকে। পাখি বুঝতে পারছে, তার জ্বর আসছে। সারাদিন অনেক কষ্ট করে সব কাজ সামলে নিয়েছে । ধৈর্য ও চরম সীমায় গিয়ে পৌঁছেছে তার। রাতে গুটিসুটি মেরে পড়ে রইলো এক কোণে, খাঁচার ভেতর। আজ মাকে খুব মনে পড়ছে । একবার এরকম জ্বর হয়েছিলো তার, মা রাত জেগে মাথায় পট্টি দিয়েছিলো, পরে ডাক্তারও দেখিয়েছিলো। মা কে খুব অনুভব করছে পাখি। ইশ্‌ যদি মায়ের বুকের ওম পেতাম তাহলে হয়তো কষ্টটা একটু হালকা হতো।
ভাবতে ভাবতে কোথায় যেন হারিয়ে যাচ্ছে সে। নীল আকাশে ডানা মেলে উড়ছে। দুহাত মেলে হাওয়ার তালে ভাসছে। মনে মনে ছড়া কাটছে,
আমি হব সকাল বেলার পাখি
সবার আগে কুসুমবাগে উঠবো আমি ডাকি।
সূয্যিমামা জাগার আগে উঠবো আমি জেগে
হয়নি সকাল ঘুমো এখন মা বলবেন রেগে।
ছড়ার তালে তালে পাখি মুক্ত হাওয়ায় তার ডানা দুটি মেলে ধরলো। নীল আকাশটা চোখের সামনে ভেসে উঠলো। আশ্চর্য! আকাশেও স্কুলের ঘণ্টাধ্বনি শোনা যাচ্ছে। ঢং ঢং ঢং। বাচ্চাদের হৈ চৈ শব্দ শোনা যাচ্ছে। দূর হতে ভেসে আসছে হাজারো কণ্ঠস্বর….
‘মেঘের কোলে রোদ হেসেছে
বাদল গেছে টুটি
আজ আমাদের ছুটি ও ভাই
আজ আমাদের ছুটি।’