পহেলা বৈশাখ গ্রামীণ আনন্দে

বিপুল বড়ুয়া

পহেলা বৈশাখকে নিয়ে আমাদের আনন্দের সীমা নেই-উচ্ছ্বাসের শেষ নেই। এ মুহূর্তে মনে পড়ে যায় সর্বজীব-জীবনের স্বসিত্ম-নিরম্নদ্বেগের জন্য রবীন্দ্রনাথ চারদিক মাতিয়ে বর্ষ আবাহনকে ছড়িয়ে দিয়েছেন চরাচরে-‘…এসো এসো, এসো হে বৈশাখ/তাপস নিঃশ্বাসে বায়ে মুমূর্ষুরে দাও উড়ায়ে/বৎসরের আবর্জনা দূর হয়ে যাক/যাক পুরাতন স্মৃতি যাক ভুলে যাওয়া গীতি/অশ্রম্ন বাষ্প মুছে যাক্ জরা/অগ্নিস্নানে শুচি হোক ধরা…।’
যেহেতু পহেলা বৈশাখকেই ছুঁয়ে আমাদের জীবনের দৌড় শুরম্ন সেহেতু তার শুরম্নটা কেমন হবে এবং তার উত্তর ড়্গেত্র আমরা নিজেরাই সুনির্বাচিত-স্বনির্বাচিত করে ফেলি। কেমন হবে? আনন্দ-আনন্দ আর আনন্দ। এই তো সেরা শুরম্ন। আনন্দের চেয়ে জীবনে দ্বিতীয় এমন কিছু কি আছে-যা দিয়ে চমকে দেওয়া যায় চারপাশকে-গৃহ প্রাঙ্গণকে-কাছে দূরের প্রিয়জনকে দ্রম্নত ধাবমান সময়ের কাঁটাকে।
পহেলা বৈশাখের প্রতি ড়্গণ-মুহূর্ত-কী গ্রামীণ জীবন-কী শহুরে জীবন সবখানে জুড়ে আছে আনন্দের মধুর সঞ্চালন। প্রাণ ভরে উপভোগের অবিরাম তৃষ্ণা। আমাদের দীর্ঘ সময়ের সতৃষ্ণ মন প্রাণ যেনো ব্যাকুল হয়ে চেয়ে থাকে-অপেড়্গায় থাকে পহেলা বৈশাখের এই ভারি পয়মনত্ম দিনটির জন্য প্রাণভরে উপভোগের জন্য চারপাশের তথা জগৎসংসারের এক মহা আনন্দযজ্ঞের পাঁচমিশালী উৎসবের। মধুর ঝলমলে রকমারি আয়োজনের।
সপ্তাহ পনের দিন আগে হতে ঘরদোর; গোলা-হাল লাঙল, সিন্দুক-ধানগোলা সযত্নে ধুয়ে মুছে সাফসুতরো করার ধুম পড়ে যায়। নতুন বছরের দিনে খুব ভোরেই শুরম্ন নানা কর্মকাহন। ভাদি গাছের গোটা দাঁতে চিবিয়ে-ঘিলা গায় ঢলে-ঘষে দে ছুট ছোটদের স্নানে। গোয়ালের গরম্ন নিয়ে কারো পুকুরে নেমে যাওয়া-পরম যত্নে গা ঘষে স্নান করানো। উঠোন দোরে চালের পিটুলি দিয়ে চোখ ভরানো আলপনা আঁকা-সব সব আনন্দঘন কা- সারা নববর্ষের প্রথম প্রভাতে। নূতন কাপড় পরে চারদিকে ঘুরে বেড়ানোর সে আনন্দ তো আছেই।
সেই কাকভোরে ছোট ছোট ছেলেমেয়েদের ঝরে পড়া চৈত্রের শুকনো পাতা-ম্যাড়ম্যাড়ে ডাল-শুটি কুড়িয়ে বাড়িঘাটার আশেপাশে বসে আগুনের হালকা কুন্ডলী জ্বেলে মেতে উঠে অপার সে আনন্দের ‘যাক্’ গানে। সুরে সুরে সে গানের মর্মার্থ-আমাদের বাড়ির সব দুঃখ-কষ্ট, বিষাদ-ব্যথা-বড়লোকের ঘরে-অন্য ঘরে যাক। তাদের ধনসম্পদ-টাকা পয়সা আমাদের বাড়ি আসুক…। ঘর সংসারের জন্য মঙ্গল প্রার্থনার ছোটদের সে কী আকুল নিবেদন।
বাড়ির বয়স্কজনদের নির্মল জল দিয়ে পা ধুয়ে দেওয়ার মহা আনন্দে সবার মেতে উঠার কী চমৎকার দৃশ্য চোখে পড়ে আজো। এ সময় ছোটদের ঈদের দিনের খুশির সালামির মতো বেশ কিছু টাকাটুকা হাতে আসে যা-মেলার খরচাপাতির জোগানও হয়ে পড়ে। মেলা-খেলায় ঘুরে বেড়ানোর মওকাও মিলে যায় বলতে গেলে।
বাড়িতে খাওয়া দাওয়ায় তো আরো উচ্ছ্বাস। শেষ চৈত্র দিনের বহুমাত্রিক ‘পাজন’-পুকুরে বড় জাল ফেলে রম্নই-কাতলা তুলে জমিয়ে রান্নার পর পাতে বসে পেটপুরে খাওয়া-এত সব তো পহেলা বৈশাখের মধুর চালচিত্র। যার উপভোগের তো কোনো তুলনাই নেই।
এই পহেলা বৈশাখে দেশ বাংলার প্রত্যনত্ম অঞ্চল-জনপদে সেই যে মেলা-খেলার ধুম পড়ে যায় তা কি দারম্নণ উপভোগের। নানা আর্থ-সামাজিক টানাপড়েনে থেকেও দেখা যায় এই দিনে জনমানসের কী প্রাণচাঞ্চল্য। কী ঘুরে বেড়ানোর মৌতাত তাদের অনত্মরে।
মেলা বসেছে-খোলা মাঠে-বটপাকুড়ের চাতালে-নদীর কূলে। জমজমাট উলস্নাস আয়োজন। সারি সারি রকমারি দোকানপাট। খাজা-গজা, পিঠে-পুলি, চুড়ি-ফিতে-সাজনের ম্যালা কিছু, বাঁশি-টমটম গাড়ি-সেই অবাক করা তালপাতার সেপাই, নাগরদোলার মড় মড় শব্দে উপর নিচে ঘুরছে, বিকিকিনিতে ব্যসত্ম সমসত্ম দোকানি-বড়ছোট ক্রেতারা। মেলার শেষ প্রানেত্ম ঢাউস তাঁবু-সামিয়ানা টেনে চলছে দ্য গ্রান্ড সার্কাস-ব্রাহ্মণবড়িয়ার মোহন মিয়ার সাড়াজাগানো পুতুল নাচ-কখনো কখনো শো বসে যায় ‘জয়দুর্গা’ অপেরার নাচে গানে ভরপুর যাত্রা-বিজয় বসনত্ম বা একটি পয়সা।
শুধু কী মেলার আনন্দ? পহেলা বৈশাখের খেলাধুলার পাঠ সে তো আরো বিশাল অধ্যায়। এই দিনে মেতে উঠে গ্রামীণ জনপদ নানা খেলা আয়োজনে-উপভোগে। সেই স’ানীয়দের আয়োজনে-বলীখেলা, হাডুডু খেলা, লাঠিখেলা, তুম্বুরম্ন খেলা, ঘিলাখেলা, চিহি খেলা, কুড়ি খেলা, দুধা খেলা, চিহি খেলা, ষাঁড়ের লড়াই, এমনি অনেক অনেক স’ানীয়-অঞ্চল বিশেষের খেলা-আয়োজনে মনপ্রাণ ভরে নেমে পড়ে গ্রামীণ বসতের লোকজন এই পহেলা বৈশাখে।