পরিবারই হোক আনত্মর্জাতিক নারী দিবসের চেতনা ধারণের প্রথম জায়গা

জোবাইদা নাসরীন

‘সমান ভাবো, পরিপাটি করে নিজেকে গড়ো, বদলে দেওয়ার উপায় উদ্ভাবন করো’-এই সেস্নাগান সামনে রেখে পালিত হচ্ছে এবারের আনত্মর্জাতিক নারী দিবস। একটা সময় ছিল যখন পরিবারে জন্মের পর থেকেই লৈঙ্গিক রাজনীতির মধ্যে সনত্মানকে বড় করা হতো। অর্থাৎ পরিবারেই একটি শিশুকে শেখানো হয় সে ছেলে না মেয়ে। জন্মগ্রহণ করার পর থেকে গোলাপি হয়ে পড়ে নারীর রঙ, বিপরীতে ছেলেদের হয় নীল। শিশুরা কোনও ড়্গেত্রেই এ ধরনের পছন্দ-অপছন্দ নিয়ে জন্মগ্রহণ করে না। একটি গুরম্নত্বপূর্ণ গবেষণায় জানা যায় ছেলে এবং মেয়েরা ছোট বয়সে একইভাবে কান্না করে। পাঁচ বছর বয়সে ছেলে সন-ানরা এই তথ্য পায় যে তাদের রাগ আদৃত হবে কিন’ তারা তাদের নাজুকতাজনিত অনুভূতি প্রকাশ একেবারেই করতে পারবে না। এবং এটি মেয়েলি বিষয়।
সনাতনের বাইরে পরিবর্তিত মূল্যবোধ থেকেই আমরা মেয়েদের চিরায়ত বিষয়ের বিরম্নদ্ধে তাদের সফল করতে শেখাই। এখন সচেতন অভিভাবকেরা বাচ্চাকাল থেকেই একজন মেয়েশিশুকে ‘খারাপ স্পর্শ’, ‘ভালো স্পর্শ’ এগুলো সম্পর্কে ধারাণা দেন এবং যৌন হয়রানি এবং অন্যান্য পুরম্নষতান্ত্রিক আক্রমণের বিষয়ে সচেতন করেন। এর পাশাপাশি ক্যারিয়ার নির্বাচনে কিংবা লিঙ্গের সাংস্কৃতিক উপস’াপনে আমরা বর্তমানে নারীদের পছন্দের প্রথাগত বাইরের অনেক ধরনকেও জায়গা দেওয়া হচ্ছে, কিন’ তা করা হচ্ছে পুরম্নষের পৃথিবী সীমিত রেখেই। অন্যদিকে নারী সুলভতার প্রতি পুরম্নষের আগ্রহকে অনুৎসাহিত করা হয় এবং তাদের বুঝিয়ে দেওয়া হয় পুরম্নষের নারী সুলভতা কাঙ্ড়্িগত নয়। নারী শুধু সন-ান ধারণ করবে আর পুরম্নষ অন্য সকল সৃষ্টিশীল কাজের সঙ্গে যুক্ত হবে- প্রকৃতি বনাম সংস্কৃতির এই প্রথাবদ্ধ চর্চাকে বর্তমানের নারীরা চ্যালেঞ্জ করছে নিশ্চিতভাবেই। সাম্প্রতিক সময়ে যেভাবে অভিভাবকরা একজন মেয়েকে নিয়ে ফুটবল খেলোয়াড় কিংবা ভালো সাঁতারম্ন হওয়ার স্বপ্ন দেখতে পারেন, কিন’ কোনোভাবেই একজন পুরম্নষকে নার্স হিসেবে দেখতে চায় না। কারণ, এটি মেয়েসুলভ চাকরি বলে। যার কারণে নারী নার্সের তুলনায় বাংলাদেশে এখন পুরম্নষ নার্সের সংখ্যা খুব কম।
নিজে এবং অন্যের যত্ন নেওয়ার কাজে পুরম্নষদের যুক্ত করা খুবই গুরম্নত্বপূর্ণ। ‘নারীরা সুপার ওমেন’ এই জাতীয় বক্তব্যের মধ্য দিয়ে নারীর প্রশংসা হয়, নারীর ড়্গমতার স’তি হয় মাত্র কিন’ এটি একভাবে নতুন ঢংকে উসকে দেওয়া লিঙ্গীয় অসমতাকেই জিইয়ে রাখে। পুরম্নষের মধ্যে সহমর্মিতা এবং সযত্ন কাজের আগ্রহ তাকে নারী করে তোলার চেয়ে মানুষ হিসেবে তৈরি করবে। ছেলেদের এই বিষয় এরকম বলা মানে এই নয় যে এটি শুধু ছেলেদের বলা। এটি লৈঙ্গিক পার্থক্য ঘোচাতে অনেক গুরম্নত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। ছেলেদের শেখাতে হবে তাদের আবেগ লুকানো নয়, তাদের কীভাবে পরিবারের যত্ন নিতে হবে, তাদের কীভাবে এগুলোকে অমান্য করতে কঠোর হতে হয় সেটিও জানাতে হবে। তাদেরকে তাদের আগ্রহ এবং উৎসাহের প্রতি ধৈর্যশীল হওয়া শেখাতে হবে। বর্তমান অর্থনীতিকে বলা হয় গোলাপি অর্থনীতি। এই গোলাপি অর্থনীতির মূল জায়গা হলো সহযোগিতা, সহমর্মিতা এবং যত্ন, যা হয়তো সনাতনভাবেই নারীর কাছ থেকেই আশা করা হয়। আর এই তিন গুণ ছাড়া এখন আর শিল্প কারখানায় দ্রম্নত উন্নয়ন করা সম্ভব নয়। যার ফলে এই গোলাপি অর্থনীতিতে পিছিয়ে পড়ছে ছেলেরা। আমরা স্কুল পরীড়্গায় ছেলেদের অকৃতকার্যতা কিংবা পিছিয়ে পড়া নিয়ে চিনিত্মত হই এবং প্রতিবছর নারীরা যে শিড়্গায় এগিয়ে যাচ্ছে সেটি নিয়ে গর্ববোধ করি। কিন’ এই রেজাল্টের কোন লিঙ্গীয় বিশেস্নষণ দাঁড় করাই না।
‘মেয়েরা স্বভাবতই শানত্মহয়’ এবং ‘ছেলেরা একটু দুষ্টু প্রকৃতির হয়’- এই মতাদর্শীয় সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গি পড়্গানত্মরে ছোটবেলা থেকেই ছেলেটির পৌরম্নষদীপ্ততাকে সমর্থন জোগায়। ছোটবেলার দুষ্টুমির বাহবা বা মারধরের পারদর্শিতাকে আমরা সাহস হিসেবে গ্রহণ করি। আমরা তাকে নিয়ে কোনও টেনশন করি না। পরিবারেই একসঙ্গে বড় হওয়া আমাদের আদরের ভাইটি ঘরের বাইরে অন্য নারীর প্রতি কী আচরণ করছে আমরা তা জানি না কিংবা জানলেও ‘আমার ভাই এটা করতে পারে না’- জাতীয় মনোভাব ব্যক্ত করি। কিন’ আমরা কখনও মনে করতে পারি না যে সে ভাইয়ের সঙ্গে তার আচরণ সংক্রান- বিষয়ে ছোটবেলা থেকে কোনও কথা বলেছি কিনা। পরিবারে ছেলেটিকে মতাদর্শিক আচরণ শেখানোর আমাদের এই অনভ্যস-তাই নারীর প্রতি অসম্মান এবং ধর্ষণের ঝোঁক তৈরি করে।
পরিবারই হলো সমতার মতাদর্শ চর্চার প্রথম প্রতিষ্ঠান। সকল সন-ানকে নারীর পৃথিবী কিংবা পুরম্নষের পৃথিবী নয়- মানুষের পৃথিবীর সাথে কীভাবে পরিচয় করানো যায় সেটিই হওয়া দরকার প্রথম দায়িত্বের জায়গা। সেই সঙ্গে পরিবারের সাহায্যকারী নারীর শ্রমঘণ্টা, ন্যায্য মজুরিসহ সকল অধিকার নিশ্চিত করার মধ্য দিয়েই আমরা সবচেয়ে বেশি স্মরণ করতে পারি ৮ মার্চের শিড়্গাকে, এই শ্রমজীবী নারীরাই আমাদের বাতলে দিয়েছিল সমতার পৃথিবীর স্বপ্ন দেখার পথকে।