লোকাল বাসে নারীর আসনে পুরুষ

‘পরিবর্তন দরকার হীন মানসিকতার’

মুহাম্মদ সাইফুল্লাহ

বুধবার সকাল ১১টা। গন্তব্য মুরাদপুর থেকে বিশ্ববিদ্যালয় ১ নম্বর গেইট। বাসে মেয়েদের নির্ধারিত আসনগুলো দখল করে বসে আছে কয়েকজন জোয়ান পুরুষ। বাস কিছুদূর যাওয়ার পর মাঝরাস্তায় দুটো মেয়ে বাসে উঠলেও তারা সিট না ছেড়ে দিব্যি বসে থেকে নিজেদের মধ্যে খোশগল্পে মেতে থাকল। বাস সহকারীর বারংবার অনুরোধ সত্ত্বেও উঠল না।
মেয়ে দুটো অনন্যোপায় হয়ে দাঁড়িয়েই গন্তব্যে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিলো। সামনের দিকে দাঁড়িয়ে থাকা অন্য পুরুষদের থেকে কিছুটা তফাৎ রেখে নিজেদের দাঁড়ানোর জায়গা ঠিক করে নিলো তারা। এরই মধ্যে গাড়ি একটুখানি ব্রেক করল, কি করল না, পেছন থেকে বখাটে চেহারার এক ছেলে মেয়ে দুটোর একজনের একেবারে গায়ের ওপর এসে পড়ল। এই প্রতিবেদকসহ প্রত্যক্ষদর্শী সবারই একই অভিমত-এভাবে দৃষ্টিকটূভাবে ছেলেটা গায়ের ওপর এসে পড়াটা যতটা না বাসের গতিজড়তাজনিত কারণ, তার চেয়েও অনেক বেশি ইচ্ছাকৃত!
নিজেকে গুটিয়ে নিয়ে মেয়েটিকে তার বান্ধবীর উদ্দেশে আক্ষেপ করে বলতে শোনা গেল, ‘সবসময় বাসে উঠলেই কোনো না কোনো পুরুষলোক এভাবে গায়ের ওপর এসে পড়বে। অথচ আমরা তো কোনোদিন কারো গায়ের ওপর গিয়ে পড়ি না।’
কথাগুলো বখাটে ছেলেটির কানে যেতেই তার ‘আঁতে ঘা’ লেগে যায়। মেয়েটিকে উদ্দেশ করে তার টিটকিরি, ‘সে এমন কোন ঐশ্বরিয়া রাই হয়েছে যে, আমার তার গায়ের ওপর গিয়ে পড়তে হবে? আয়নায় নিজের চেহারা দেখেছে কোনদিন?’
মেয়েটি একটিবার তার বান্ধবীর দিকে তাকিয়ে নিঃশব্দে হজম করল এ অপমান। একটা টুঁ শব্দও করলো না। কারণ হয়ত সে জানে যে, এটাই এ সমাজের নিয়ম! এরকম অপমান তাকে অতীতেও হাজারবার হজম করতে হয়েছে, ভবিষ্যতেও হয়ত আরো লক্ষ-নিযুতবার হজম করতে হবে। তাই এর সাথে অভ্যস্থ হওয়া ছাড়া কোনো বিকল্প নেই।
সুরাইয়া ইসলাম নামের বিশ্ববিদ্যালয় পড়ুয়া এক মেয়ে সুপ্রভাতকে বললেন, ‘লোকাল বাসগুলো মেয়েদের জন্য খুবই অনিরাপদ একটা বাহন। প্রত্যেকটি বাসে সবসময় এমন কিছু পুরুষ লোক থাকে যারা সবসময় কোনো না কোনোভাবে মেয়েদের গায়ে পড়ার চেষ্টা করে। একসময় এসব ব্যাপারে প্রতিবাদ করতাম, কিন্তু এখন আর করি না। যদি মেয়েদের জন্য আলাদা কোনো বাহনের ব্যবস্থা থাকত, তাহলে হয়ত আমাদের এমন অবস্থার মুখোমুখি হতে হতো না।’ চিটাগং উইমেন চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির সাবেক ভাইস প্রেসিডেন্ট আইভি হাসান সুপ্রভাতকে বলেন, ‘ব্যাপারটা পুরোপুরি মানসিক। এর পরিবর্তন শুধুমাত্র পার্লামেন্টে আইন পাস করে হবে না, এর জন্য পুরুষদের মানসিকতার পরিবর্তন দরকার। প্রত্যেকের ঘরেই তো মা-বোন-খালা-নানু থাকেন।’