পরিবর্তন চাই, সুন্দর পরিবেশের জন্য

আজহার মাহমুদ

এ যেন এক আলো-আঁধারের মহাকাব্য! সাড়ে ৫০০ এলইডি বাতির আলোতে ঝলমল করছে চট্টগ্রাম। হ্যাঁ আমি জাম্বুরি পার্কের কথা বলছি, যাত্রা শুরু করলো চট্টগ্রামের সবচেয়ে আধুনিক নজরকাড়া জাম্বুরি পার্ক, আগ্রাবাদ ১০ তলা ভবনের সামনে সাড়ে আট একর জমিতে গড়ে তোলা হয়েছে অত্যন্ত দৃষ্টিনন্দন এবং নজরকাড়া এই উদ্যান। এ উদ্যান তৈরি করতে ব্যয় হয়েছে সাড়ে ১৮ কোটি টাকা।
এতদিন সরকারি এই জমি পরিত্যক্ত অবস’ায় থাকায় মাদকসেবীদের জন্য ছিলো মাদকের অন্যতম আড্ডাস’ল, সেখানে গেলেই মিলত অবাধে মাদক আর মাদক। গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রী ইঞ্জিনিয়ার মোশাররফ হোসেনের উদ্যোগে অতি দ্রুততার সাথে গড়ে তোলা হয়েছে এ পার্ক, ৮ সেপ্টেম্বর বিকেলে পার্কের আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করেন মাননীয় মন্ত্রী।
প্রকল্পটি নেওয়া হয়েছিলো ২০১৫ সালে, স’াপত্য অধিদপ্তরের নকশায় ৮.৫৫ একর জমির ওপর রোপণ করা হয়েছে ৬৫ প্রজাতির ১০ হাজার গাছের চারা, এর মধ্যে আছে সোনালু, নাগেশ্বর, চাঁপা, রাধাচূড়া, বকুল, শিউলি, সাইকাস, টগর, জারুল সহ বিভিন্ন প্রজাতির ফলজ এবং বনজ বৃক্ষ। খোলা চত্বরে লাগানো হয়েছে বিভিন্ন জাতের সবুজ ঘাস, পার্কে বসার সুযোগও রাখা হয়েছে অতি সুন্দরভাবে, আর শুধু হাঁটার জন্য রাখা হয়েছে ৮ হাজার ফুট রাস্তা, ৫০ হাজার বর্গফুট জলাধার; দৃষ্টিনন্দন ফোয়ারা যে কারো নজর কাড়বেই। এ উদ্যানে, নিরাপত্তার জন্য বসানো হয়েছে ১৪ টি ক্লোজ সার্কিট ক্যামেরা, জলাধারের পাশে রয়েছে দুটি পাম্প হাউস, বৃষ্টি ও জোয়ারের পানির বিপদ থেকে রক্ষার জন্য পুরো পার্ক সড়ক থেকে তিন ফুট উঁচু করা হয়েছে, পানি নিষ্কাশনের জন্য রয়েছে অভ্যন্তরীণ মাস্টার ড্রেন।
পার্কে প্রবেশের জন্য রয়েছে ছয়টি গেট, উত্তর পাশে দুটি, দক্ষিণ পাশে দুটি, পূর্বপাশে ১০ তলা ভবনের সামনে একটি, পশ্চিম পাশে আগ্রাবাদ মা ও শিশু হাসপাতালের সামনে একটি বড় গেট আছে। নাগরিকদের জন্য উত্তর-পূর্বকোণ ও দক্ষিণ পশ্চিমকোণে রাখা হয়েছে আধুনিক গণশৌচাগার, পার্কে প্রবেশে নির্দিষ্ট কিছু নিয়ম কানুন বেঁধে দিয়েছে পার্ক কর্তৃপক্ষ। ছুটির দিন সহ প্রতিদিন সকাল থেকে রাত নয়টা পর্যন্ত খোলা থাকবে এ পার্ক। নিষেধ আছে, সেখানে খাবার নেওয়া যাবে না, জলাধারে গোসল করা যাবে না, গাছের ক্ষতি করা যাবে না, পার্কে প্রবেশের জন্য কোনো ধরনের ফি রাখেনি কর্তৃপক্ষ।
তবে এখানকার সবচেয়ে সুন্দর মুহূর্ত সন্ধ্যার পর, আলো-আঁধারির ঝলকানি যে কারোর ভালো লাগবে, আগামী কয়েক বছর সঠিকভাবে রক্ষণাবেক্ষণ ও পরিচর্যা করা হলে নতুন পর্যটন স্পট হয়ে উঠতে পারে এটিও, জাম্বুরি পার্ক মূলত শরীরচর্চার জন্য প্রশস্ত ও দীর্ঘ জগিং ট্র্যাক, একইসঙ্গে এটি হয়ে উঠেছে বিভিন্ন শ্রেণি পেশার মানুষের প্রশান্তির উন্মুক্ত উদ্যান।
মাননীয় মন্ত্রী মহোদয় বলেন, বান্ধবী নিয়ে আসেন, কবিতা পড়েন, আড্ডা দেন, কিন’ পার্ক নষ্ট করবেন না, তিনি এত সুন্দর বক্তব্য এবং অনুরোধের পরও এ পার্কের অবস’া নোংরা করে ফেলছে পার্কে আসা মানুষগুলো, তিনি বলেছেন পার্কের গাছগুলো বাড়তে দিন, দেখবেন রমনা পার্কের চেয়েও অনেক সুন্দর হবে এ পার্ক। প্রকৃতপক্ষে এ পার্কের দায়িত্বটা আমাদেরকেই নিতে হবে। সরকার উন্নয়ন করলে কি হবে, সমাজের কিছু অসুন্দর মানুষ রয়েছে, যারা পার্কে এসে উদ্যানটি নোংরা এবং ময়লায় ভরপুর করে রাখে। এ যে পার্কটি পরিচ্ছন্ন রাখা, এটা কার দায়িত্ব? এটাও কি সরকার কিংবা পার্কের কর্তৃপক্ষ করবে? আমাদের কি কোনো দায়িত্ব ও কর্তব্য নেই? পার্ক সুন্দর ও পরিচ্ছন্ন রাখার জন্য আমাদের তো কোনো কাজ করতে হচ্ছে না, কিন’ আমরা এ সুন্দর স’ানটিকে কেনো নোংরা করে রাখবো?
পার্কটি মূলত শরীরচর্চা ও প্রাকৃতিক পরিবেশে বিশ্রাম বা সময় কাটানোর জন্য গড়ে তোলা হয়েছে। চট্টগ্রামের মানুষের বিনোদনের কথা চিন্তা করেই সরকার এ প্রকল্প বাস্তবায়ণ করেছে। এখানে আমরাই সময় কাটাবো। আমাদের পরিবার পরিজন, বন্ধু-বান্ধবরাইতো ঘুরতে আসবে। তবে কোনো এ পার্কটিতে ময়লা ফেলে নোংরা করবো আমরা। আমাদের নিজেদের ভেতর কি কোনো সচেতনতা আর নৈতিকতা বোধ নেই! আমরা নিজেরা কতটা সচেতন এবং সুশৃংখল সেটা কি আমরা একবারও চিন্তা করি?
আমরা আগে নিজেদের পরিবর্তন করি, তারপর দেশ সমাজ এমনিতেই পরিবর্তন হয়ে আসবে। আমাদের আচরণ, ব্যবহার, চালচলন এসকল বিষয়ে আরো সুন্দর হতে হবে। আমরা যেখানে সেখানে ময়লা, থুথু, এবং আবর্জনা ফেলতে সংকোচ বোধ করি না। আমাদের এসকল অসুন্দর মানসিকতা পরিবর্তিত আনতে হবে আগে। তারপর আমরা অন্য বিষয় নিয়ে ভাবতে পারবো। তাই আসুন, আগে নিজে পরিবর্তন হই এবং অন্যদের পরিবর্তনে উদ্বুদ্ধ করি। মনে রাখবেন আপনার পরিবর্তন মানেই দেশের পরিবর্তন।