হালিশহরে মাদ্রাসা ছাত্রের মৃত্যু

পরিচালকসহ সবাই লাপাত্তা

মোহাম্মদ রফিক

নগরের হালিশহর নয়াবাজার এলাকায় মাদ্রাসা ছাত্রের মৃত্যুর ঘটনাকে প্রাথমিকভাবে ‘আত্মহত্যা’ বলে দাবি করছে পুলিশ। কিন’ ঘটনার পর থেকে মাদ্রাসার পরিচালক মাওলানা মনির হোসেন ও বাবুর্চি আকতার মজুমদার লাপাত্তা হয়ে যাওয়ায় এটি ‘হত্যাকাণ্ড’ বলে ভিকটিমের পরিবারের দাবি জোরালো হচ্ছে।
নাহদাতুল উম্মাহ মাদ্রাসা কর্তৃপক্ষের দাবি, গত ৯ সেপ্টেম্বর রাত সাড়ে দশটায় টয়লেটের দরজা ভেঙে ভেনটিলেটরের সঙ্গে ‘ঝুলন্ত’ অবস’ায় শাহরিয়ার আলম সাকিব (১৩) নামের ওই ছাত্রকে উদ্ধার করে। পরে অচেতন অবস’ায় চট্টগ্রাম মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে গেলে সাকিবকে চিকিৎসক মৃত ঘোষণা করেন।
এ ঘটনায় ভিকটিমের বাবা ১০ সেপ্টেম্বর রাতে সাকিবকে হত্যা করা হয়েছে, এমন অভিযোগ এনে হালিশহর থানায় লিখিত একটি অভিযোগ দিয়েছেন। এতে আসামি করা হয়েছে মাদ্রাসার পরিচালক মো. মুনির হোসেন, কুমিল্লা সদর থানাধীন কমলপুর ৫ নম্বর ওয়ার্ডের আবু তাহেরের ছেলে আকতার হোসেন মজুমদার ও মাদ্রসার শিক্ষক মো. রাশেদুল ইসলাম।
পরিবারের অভিযোগ, ঘটনার পর থেকে হালিশহর থানা পুলিশ ‘রহস্যজনক’ ভূমিকা পালন করছে। চমেক হাসপাতাল থেকে সন্দেহভাজন প্রধান আসামি মনির হোসেনকে ধরে সোপর্দ করলেও তাকে ছেড়ে দিয়েছে পুলিশ। এর আগে সাকিবকে হাসপাতালে নেওয়ার পর শিক্ষক রাশেদ ও একজন ছাত্র পালিয়ে গেছে। ৯ সেপ্টেম্বর দিবাগত রাত ১টায় ঘটনাস’ল পরিদর্শন করে হালিশহর থানার এসআই ফয়সাল সরওয়ার ও এএসআই আমীর উদ্দিন। ঘটনাস’ল দেখে তারা মাদ্রাসা পরিচালকের ‘আত্মহত্যা’ দাবি নাকচ করে দেন। এসময় নাজিম নামে এক ছাত্র তাদের জানায়, বাবুর্চি আকতার হোসেন মজুমদার সাকিবকে পিটিয়ে মেরেছে বলে অভিযোগ করেন। কিন’ নাজিমের কথা আমলে নেয়নি পুলিশ।
একই রাত প্রায় ২টার দিকে চমেক হাসপাতালে গিয়ে সাকিবের মরদেহের সুরতহাল প্রতিবেদন তৈরি করেন এসআই ফয়সাল সরওয়ার। এরপর হাসপাতাল পুলিশ ফাঁড়ির হেফাজত থেকে মাদ্রাসার পরিচালক মো. মনির হোসেনকে ‘আটক’ করে থানায় নিয়ে যাওয়া হয়। ১০ সেপ্টেম্বর বিকালে সাকিবকে দাফনের পর তার বাবা নুরুল আলম শাহীন ও মামা মো. ইলিয়াছ রাতে থানায় মামলা করতে গেলে তা এজাহার হিসেবে না নিয়ে অভিযোগ হিসেবে গ্রহণ করেন।
জানতে চাইলে হালিশহর থানার ওসি মাহফুজুর রহমান বলেন, ‘ভিকটিমের হত্যার অভিযোগ করতেই পারে। কিন’ ময়নাতদন্ত রিপোর্ট পাওয়ার আগ পর্যন্ত কোনো মামলা কিংবা সন্দেহভাজন কাউকে আটক করা যাবে না।’ মাদ্রাসার পরিচালক মনিরকে ঘটনার রাতেই সাকিবের পরিবারের লোকজন ধরে চমেক হাসপাতাল পুলিশ ফাঁড়ির ইনচার্জকে হস্তান্তর করে। কিন’ ওই রাতেই মনিরকে আটক করে থানায় নিয়ে গেলেও তাকে ছেড়ে দেওয়া হলো কেন, প্রশ্ন করলে এড়িয়ে যান ওসি মাহফুজ। ঘটনার পরদিন থেকে মাদ্রাসা পরিচালক মনির ও বাবুর্চি আকতার হোসেন লাপাত্তা থাকা প্রসঙ্গে ওসি মাহফুজুর রহমান বলেন, ‘পালিয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই।’ জানতে চাইলে অ্যাডভোকেট আবদুস সাত্তার সারোয়ার বলেন, ‘যে কোনো ভিকটিমের পরিবার আত্মহত্যার দাবি নাকচ করে ঘটনাকে হত্যা বলে অভিযোগ করলে এবং কাউকে সন্দেহভাজন হিসেবে উল্লেখ করলে পুলিশ সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিকে ৫৪ ধারায় গ্রেফতার দেখিয়ে আদালতে পাঠাতে পারে। কিন’ সাকিবের ঘটনার ক্ষেত্রে আইনের এ নিয়ম না মেনে পুলিশ ময়নাতদন্ত রিপোর্টকে পাওয়াকে অজুহাত হিসেবে দাঁড় করাচ্ছে।’
ঘটনার রাত ১১টার দিকে ‘সাকিব টয়লেট থেকে বের হচ্ছে না। আমি ও জমিদার টয়লেটের দরজা ভেঙে তাকে উদ্ধারের চেষ্টা করছি’ এমনটি জানিয়ে তার মা সালমা বেগমকে ফোন করেন মনির হোসেন। কিন’ এর প্রায় দেড়ঘণ্টা আগে মনির হোসেন ভিকটিম সাকিবকে হাসপাতালে নিয়ে যেতে ‘অনলাইন অ্যাম্বুলেন্স সার্ভিস’কে ফোন করেন। ওই অ্যাম্বুলেন্সের চালক মোশারফ হোসেন সুপ্রভাতকে এ তথ্য নিশ্চিত করেছেন। পরিবারের প্রশ্ন, রাত সাড়ে ৯টার দিকে অ্যাম্বুলেন্সকে ফোন করা হলে একই রাত ১১টার দিকে সাকিব টয়লেটের ভেতর থেকে বের না হচ্ছে না মর্মে মোবাইল ফোনে তার মা সালমাকে কেন জানালেন। সাকিবের মায়ের দাবি, মাদ্রাসার বাবুর্চি তার ছেলেকে রাত সাড়ে আটটার দিকে পিটিয়ে মেরেছে। পরে টয়লেটে নিয়ে আত্মহত্যার নাটক সাজিয়েছে।
গতকাল বিকালে ওই মাদ্রাসায় গিয়ে দেখা মেলেনি মনির হোসেন, বাবুর্চি আকতার হোসেন ও শিক্ষক রাশেদুলের। এসময় সেখানে উপসি’ত ছিলেন মনির হোসেনের ছোটভাই মোবারক হোসেন। তিনি জানান, মাদ্রাসায় আবাসিক ২২ জন এবং অনাবাসিক ২০ জন ছাত্র রয়েছে। শিক্ষক তার বড়ভাই মনির হোসেনসহ চারজন। কিন’ ২২ জন আবাসিক ছাত্রের মধ্যে গতকাল শনিবার উপসি’ত ছিল ১৩জন। সাকিবের মৃত্যুর পর গত ৬ দিনের ব্যবধানে ৯ জন ছাত্রকে তাদের অভিভাবকরা নিয়ে গেছেন বলে জানান মোবারক হোসেন। মাদ্রাসা ভবনটি ছয়তলা। তিনতলা পর্যন্ত ফ্ল্যাট নির্মাণ সম্পন্ন করলেও বাকি তিন তলার শুধু ছাদ নির্মাণ করা হয়েছে। এটির মালিক মো. মিন্টু। তিন তলায় একটি ফ্ল্যাটের ছয় কক্ষ, একটি রান্নাঘর, চারটি টয়লেট রয়েছে। তিন তলার একটিসহ নিচে প্রথম ও দ্বিতীয় তলায় মোট পাঁচটি ভাড়াটিয়া পরিবার রয়েছে। ভাড়াটিয়াদেরও দাবি, সাকিব আত্মহত্যা করেনি। তাকে পিটিয়ে মেরে ফেলা হয়েছে।
এসময় মাওলানা মনির হোসেন ও বাবুর্চি আকতার হোসেন কোথায় প্রশ্ন করলে নিরুত্তর থাকেন মোবারক। এ প্রতিবেদকের সাথে কথা হয় আবু বক্কর, আবু জর ও আবদুর রহমান নামের তিন ছাত্রের সাথে। হেফজ বিভাগের ছাত্র আবু বক্কর জানায়, ঘটনার রাতে আমি ঘুমিয়ে ছিলাম। সাকিব খুব রাগী ছিল। কারো সঙ্গে তেমন মিশত না। ঘটনার রাতে সে ভাত খায়নি। শুধু বলে, আমি বাড়ি চলে যাব। সে লাল কলমে একটি চিঠি লিখেছিল। সে প্রায় সময় মায়ের কাছে চিঠি লিখত। তবে কী লিখত জানি না।
আরেকজন ছাত্র নাম প্রকাশ না করে বলেন, ঘটনার রাত সাড়ে আটটার দিকে লাল কলমে লেখা একটি চিঠির বিষয় নিয়ে বাবুর্চি আকতার হোসেন সাকিবকে পিটিয়েছেন। আবু জর নামে ছাত্র বলেন,‘ঘটনার পরদিন থেকে আমাদের বড় হুজুর (মনির হোসেন), তিন শিক্ষক ও বাবুর্চি মাদ্রাসায় আর আসেননি।’ গতকাল মনির হোসেনের তিনটি এবং বাবুর্চির একটি মোবাইল নম্বরে একাধিকবার কল করলে সেগুলো বন্ধ পাওয়া যায়। মাদ্রাসার বিপরীতে মুদি দোকানদার নুরুল আবছার জানান, ঘটনার পর থেকে হুজুর মনির হোসেন, বাবুর্চি মাদ্রাসায় আর ফেরেনি। এদিকে ঘটনাস’ল সেই টয়লেটে ঢুকে দেখা যায়, ছোট আয়তনের ওই টয়লেটে একটি কমোড রয়েছে। এ কমোড থেকে ভেন্টিলেটরের দূরত্ব সাড়ে তিন ফুট। এত কম দূরত্বের মাঝে চার ফুট ১০ ইঞ্চি লম্বা একটি ছেলে আত্মহত্যা করতে পারে না বলে মন্তব্য সংশ্লিষ্টদের।