পরিকল্পিত পরিবার, সুরক্ষিত মানবাধিকার

মাসুমা বিল্লাহ

বিশ্ব জনসংখ্যা দিবস ২০১৮, এবারের প্রতিপাদ্য ‘পরিকল্পিত পরিবার, সুরক্ষিত মানবাধিকার’। জাতিসংঘের সাম্প্রতিক এক সমীক্ষায় দেখা গেছে, পৃথিবীর দরিদ্রতম দেশগুলোর নারীরা জন্মনিয়ন্ত্রণ ব্যবস’া গ্রহণে আগ্রহী। বিশ্বের ২২২ মিলিয়ন নারী গর্ভধারণ এড়াতে চায় কিংবা দেরিতে গর্ভধারণ করতে চায়।
কিন’ সমস্যা হচ্ছে তারা কার্যকর পরিবার পরিকল্পনা সেবা পাচ্ছে না এবং সন্তান জন্ম দিতে গিয়ে প্রতিদিন প্রাণ হারান গড়ে ৮০০ নারী। পরিবার পরিকল্পনা সেবা দিয়ে প্রতিদিন এই ৮০০ নারীর মৃত্যুর একটা বড় অংশকে কি ঠেকানো যেত না? প্রতিদিন এই ৮০০ নারীর মানবাধিকার তথা বেঁচে থাকার অধিকার নিয়ে জোরালো করে ভাবতে হবে।
এবার দেশের কিছু প্রয়োজনীয় পরিসংখ্যান, সন্তান জন্মদানে সক্ষম ৩৮ লাখ বিবাহিত নারী কোন জন্ম নিয়ন্ত্রণ পদ্ধতি ব্যবহার করছেন না, প্রতিবছর মোট গর্ভধারণের ৪৮ শতাংশ অর্থাৎ প্রায় ২৭ লাখ হচ্ছে অনিচ্ছাকৃত গর্ভধারণ, বছরে প্রায় ১২ লাখ ইচ্ছাকৃত/আরোপিত গর্ভপাতের ঘটনা ঘটে।
বাংলাদেশের জনসংখ্যার অন্যতম সমস্যা হলো অল্প বয়সে বিয়ে ও সন্তান ধারণ। পরিবার পরিকল্পনার সাথে সুরক্ষিত মানবাধিকারের যে ডাক আজকে এসেছে, তা কোনভাবেই সার্থকতার মুখ দেখবে না যদি না বাল্য বিবাহকে ঠেকানো যায়। ২০১৪ সালে বাংলাদেশ ডেমোগ্রাফি অ্যান্ড হেলথ সার্ভের (বিডিএইচএস) রিপোর্টে দেখা গেছে, ১৫-১৯ বছর বয়সী কিশোরীদের মধ্যে শতকরা ৩১ ভাগ সন্তান জন্ম দিয়েছে বা গর্ভাবস’ায় আছে (শতকরা ২৫ ভাগ মা হয়েছে ও ৬ ভাগ গর্ভবতী)।
যে সকল কিশোরী মাধ্যমিক বা তার উপরে শিক্ষা গ্রহণ করেছে তাদের শতকরা ১৮ ভাগ সন্তান ধারণ করেছে অপরদিকে যারা কোনো শিক্ষা গ্রহণ করেনি তাদের শতকরা ৪৮ ভাগ সন্তান ধারণ করেছে। গ্রামাঞ্চলে বসবাসরত কিশোরীদের শতকরা ৩২ ভাগ সন্তান ধারণ শুরু করেছে যা শহরে বসবাসরত কিশোরীদের তুলনায় বেশি (শতকরা ২৭ ভাগ)। পরিবার পরিকল্পনার সাথে সম্পৃক্ত যে মানবাধিকার, বাল্য বিবাহের শিকার কিশোরীরা তা থেকে থেকে কোনও না কোনওভাবে বঞ্চিত, কিশোরী মায়েদের নিয়ে যে পরিকল্পনা সেখানে তার নিজেরই অংশগ্রহণ প্রায় নেই আর থাকলেও তা খুব সীমিত।
পরিবার পরিকল্পনা কি শুধু নারীর বিষয়? মজার ব্যাপার হলো পরিবার পরিকল্পনা পদ্ধতির বাহক মূলত নারী কিন’ পরিকল্পনা প্রণেতা বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই পুরুষ। নারী কী পদ্ধতি ব্যবহার করবে, কবে থেকে করবে তা নির্ধারণ করে দিবে পুরুষ, কিন’ পদ্ধতি ব্যবহার না করার দায়ভার পুরোটাই নারীর। জনপ্রিয়, বহুল ব্যবহৃত পদ্ধতিগুলো সবই নারীর জন্য বানানো এবং পুরুষের এখানে অংশগ্রহণ কম। তথাপি, পরিবার পরিকল্পনা পদ্ধতিতে একটা বড় ঝুঁকি হচ্ছে, দম্পতিদের স্বল্পমেয়াদি পদ্ধতির উপর নির্ভরশীলতা।
বাংলাদেশে বর্তমানে শতকরা ৫৪ জন সক্ষম দম্পতি আধুনিক জন্ম নিয়ন্ত্রণ পদ্ধতি (খাবার বড়ি, কনডম, ইঞ্জেকশন, ইমপ্লান্ট, আইইউডি বা কপার-টি ও স’ায়ী পদ্ধতি) ব্যবহার করে থাকেন, এর মধ্যে শতকরা ৪৫.৮ ভাগ দম্পতি স্বল্পমেয়াদি পদ্ধতিগুলো (খাবার বড়ি, কনডম, ইঞ্জেকশন) ব্যবহার করে থাকে। দেখা গেছে স্বল্পমেয়াদি পদ্ধতিগুলো ছেড়ে দেয়ার হারও বেশি হয়ে থাকে। গ্রহীতা সঠিক নিয়মে বড়ি খেতে ভুলে গেলে এবং অন্য কোনো বিকল্প পদ্ধতি ব্যবহার না করলে গর্ভধারণের আশঙ্কা থাকে। দীর্ঘস’ায়ী ও স’ায়ী পদ্ধতি (নারী বন্ধ্যাকরণ, পুরুষ বন্ধ্যাকরণ, ইমপ্লান্ট ও আইইউডি) ব্যবহারের হার খুব কম। এই হার বর্তমানে ৮ দশমিক ১ শতাংশ। প্রায় এক দশক ধরে দীর্ঘস’ায়ী ও স’ায়ী পদ্ধতির ব্যবহার বাড়ানোর চেষ্টা চলছে, কিন’ খুব বেশি সফল হওয়া যাচ্ছে না। বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, সরকারের উচিত দীর্ঘস’ায়ী ও স’ায়ী পদ্ধতির ওপর জোর দেওয়া।
বাংলাদেশ বর্তমানে ডেমোগ্রাফিক ট্রানজিশনের তৃতীয় পর্বে অবস’ান করছে, দেশে জন্মহার ও মৃত্যুহার দুই-ই হ্রাস পাচ্ছে এবং কর্মক্ষম জনগোষ্ঠীর (১৫-৪৫ বছর) হার মোট জনগোষ্ঠীর ৬২ শতাংশ। এখানে একটি বিষয় গুরুত্বপূর্ণ, ইউরোপ ও পৃথিবীর অন্যান্য উন্নত দেশ অর্থনৈতিক উন্নয়নের শিখরে পৌঁছার পর ডেমোগ্রাফিক ট্রানজিশনের তৃতীয় পর্বে প্রবেশ করে। পক্ষান্তরে বাংলাদেশ বিগত দশকে ক্রমাগত উন্নতি করলেও কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্য থেকে এখনও অনেক দূরবর্তী অবস’ানে থেকে ডেমোগ্রাফিক ট্রানজিশনের তৃতীয় পর্বে প্রবেশ করেছে, যার পরবর্তী অবধারিত অবস’া হল কর্মক্ষম জনগোষ্ঠীর সংখ্যা হ্রাস এবং বয়োবৃদ্ধ জনগোষ্ঠী বৃদ্ধি পাওয়া।
সুতরাং এই বিশাল কর্মক্ষম জনগোষ্ঠীকে ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ড হিসেবে দেশের উন্নয়নের কাজে লাগাতে পরিকল্পনামাফিক এগোতে হবে এবং তা করতে হবে অত্যন্ত দ্রুত। বয়সকাঠামোয় পরিবর্তনের কারণে প্রাপ্ত এই কর্মক্ষম জনসংখ্যাকে দক্ষ জনগোষ্ঠীতে রূপান্তরে ভালো কাজ বা হোয়াইট কলার জব এর সুযোগ তৈরি করতে হবে। আমাদের মোট জনগোষ্ঠীর ২৩ শতাংশের বয়স ১৪-১৯ বছর, যারা পপুলেশন মোমেন্টাম এফেক্ট হিসেবে ক্রমান্বয়ে প্রজনন বয়সে প্রবেশ করবে এবং জনসংখ্যা বৃদ্ধিতে ভূমিকা রাখবে ২০৩১ সাল পর্যন্ত।
বিশ্ব স্বাস’্য সংস’া বলছে, প্রতি মিনিটে সারা পৃথিবীতে জন্মায় যে ২৫০ শিশু তার ৯ জন শুধু বাংলাদেশেই জন্মাচ্ছে। জনসংখ্যা প্রক্ষেপণ/বিশ্লেষণ অনুযায়ী ২০৫০-৫৫ সালের দিকে দেশের জনসংখ্যা সি’তাবস’ায় পৌঁছাবে, যখন মোট জনসংখ্যা হবে প্রায় ২৩ কোটি। সুতরাং পরিবার পরিকল্পনাকে কেন্দ্র করে যে বিশাল কর্মযজ্ঞ সেখানে লোকবল ও অর্থবল সবই নিয়োগ করতে হবে উদারভাবে। এখানে উল্লেখ্য যে, পরিবার পরিকল্পনা বলতে এর পরিষেবা সমূহ, এ সংক্রান্ত নীতিমালা, প্রয়োজনীয় তথ্য, পরিকল্পনা সম্পর্কে জনগণের মনোভাব, অভ্যাস, পদ্ধতি, অনাকাঙ্ক্ষিত গর্ভধারণ, নিরাপদ গর্ভপাত সবকিছুই অন্তর্ভুক্ত । ডেমোগ্রাফিক ট্রানজিশনের তৃতীয় পর্বে দাঁড়িয়ে বাংলাদেশের পরিবার পরিকল্পনা কর্মসূচির মূল লক্ষ্য হওয়া উচিত ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ডের সর্বোচ্চ সুফল অর্জন, সকল সক্ষম দম্পতির হাতে পরিবার পরিকল্পনা সেবা পৌঁছে দেয়া এবং জনগোষ্ঠীর এলাকাভিত্তিক সুষম ব্যবস’াপনা।
খ্রিস্টপূর্ব ৩৪০ সালে অ্যারিস্টেটল তার ‘দ্য পলিটিক্স’ গ্রনে’ উল্লেখ করেছিলেন যে একটি নগরের জনসংখ্যা ততটুকুই হওয়া উচিত যতটুকু সেই নগর ধারণ করতে পারে। অর্থনীতিবিদ অ্যাডাম স্মিথের মতে, ভূমি সম্পদ হিসেবে পরিগণিত হবে তখনই যখন ভূমির সঙ্গে শ্রম যুক্ত হয়, অর্থাৎ অর্থনৈতিক উন্নয়ন ও জনসংখ্যা বৃদ্ধি একে অপরের পরিপূরক ও সহায়ক।
বাংলাদেশের প্রথম পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনায় (১৯৭৩-১৯৭৮) জনসংখ্যাকে উন্নয়নের প্রতিবন্ধক হিসেবে চিহ্নিত করা হয়, এবং ১৯৭৬ সালে প্রণীত প্রথম জনসংখ্যা নীতিতে জনসংখ্যাকে দেশের এক নম্বর সমস্যা হিসেবে চিহ্নিত করে তা নিয়ন্ত্রণের জন্য সমন্বিত উদ্যোগের কথা বলা হয়েছে। পরবর্তীতে বাংলাদেশের জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণ কর্মসূচি বিশ্বব্যাপী ব্যাপকভাবে প্রশংসিত হয়। বাংলাদেশের বর্তমান সরকার ‘জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণ’ থেকে ‘পরিকল্পিত জনসংখ্যা’র দিকে দৃষ্টিপাত করছে এবং কর্মক্ষম জনগোষ্ঠীর ‘ডিভিডেন্ট’ কে কাজে লাগিয়ে স্বল্পোউন্নত থেকে উন্নয়নশীলতার দিকে এগিয়ে যাচ্ছে।
বলা হয়ে থাকে, ডেভেলপমেন্টের ‘বেস্ট বাই’ হচ্ছে পরিবার পরিকল্পনা? পরিবার পরিকল্পনাতে প্রতি ১ ডলার বিনিয়োগ উন্নয়নকে ফেরত দেয় ১৪ ডলার। পরিবার পরিকল্পনা ৩০ শতাংশ মাতৃমৃত্যুকে থামিয়ে দিতে পারে, প্রতিহত করে ২০ শতাংশ নবজাতকের মৃত্যু, কমিয়ে দেয় ৬৬ শতাংশ অনিচ্ছাকৃত গর্ভধারণ এবং ৪০ শতাংশ অনিরাপদ গর্ভপাত। সুতরাং ‘ডিভিডেন্ট’ কে কাজে লাগাতে বাংলাদেশ ‘বেস্ট বাই’তে বাজেট বরাদ্দ রাখবে পর্যাপ্ত এটাই প্রত্যাশা।
জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ১৯৭৫ সালের ২৬ মার্চ প্রদত্ত এক ভাষণে বলেছিলেন, ‘একটা কথা ভুলে গেলে চলবে না যে, প্রত্যেক বৎসর আমাদের ৩০ লক্ষ লোক বাড়ে, আমার জায়গা হল ৫৫ হাজার বর্গমাইল। যদি আমাদের প্রত্যেক বৎসর ৩০ লক্ষ লোক বাড়ে তা হলে ২৫/৩০ বৎসরে বাংলার কোনো জমি থাকবে না হালচাষ করার জন্য। সে জন্য আমাদের পপুলেশন কন্ট্রোল, ফ্যামিলি প্ল্যানিং করতে হবে’। খ্রিস্টপূর্ব ৩৬০ সালে প্লেটো জনসংখ্যা বিষয়ে লিখতে গিয়ে উল্লেখ করেন, জনসংখ্যাধিক্য বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করে, যা গণতন্ত্রের জন্য সহায়ক নয়।
মনে রাখতে হবে, কেবল পরিকল্পিত জনসংখ্যাই জনশক্তি। আর পরিবার পরিকল্পনা সেবা দেওয়া মানে আসলে মানবাধিকার সেবাই সমুন্নত রাখা। আমরা এমন একটি বাংলাদেশ চাই যেখানে প্রতিটি গর্ভধারণ হবে কাঙ্খিত, প্রতিটি শিশুজন্ম হবে নিরাপদ, মাতৃমৃত্যু হবে রূপকথার গল্পে শোনা কোন বিষণ্ন ঘটনা।