পরম শ্রদ্ধায় স্মরণ করি-বেগম রোকেয়াকে

আনোয়ারা আলম

সময়ের তুলনায় অতি প্রাগ্রসর এক মহীয়সী নারী বেগম রোকেয়ার আসল নাম রুবাইয়া খাতুন তথা রোকেয়া খাতুন-এটি হুমায়ুন আজাদের মতে “ মুসলিম পিতৃতন্ত্রের কাছে এক মহীয়সী পুণ্যময়ীদের পংক্তি-প্রথাগত নারীর জন্য পরম প্রাপ্তি হলেও রোকেয়ার জন্য শোচনীয় স্বীকৃতি।”
বাঙালি নারীর সৃজনশীল উত্থানের সপক্ষে সবচেয়ে তীক্ষ্ণধী পর্যবেক্ষক ছিলেন বেগম রোকেয়া সাখাওয়াত হোসেন (১৮৮০-১৯৩২)‘ বিশশতকের এক প্রকৃত নারীবাদী লেখক, কুসংস্কার এবং প্রভুত্ববাদের বিরুদ্ধে সমালোচনায় মুখর ছিলেন আমৃত্যু। বিশ শতকের শুরুতে তিনি প্রথম নারীবাদী প্রবন্ধ ‘স্ত্রী জাতির অবনতি’ প্রকাশ করে উপ-মহাদেশের অবিসংবাদিত নারীবাদী প্রবক্তা হিসেবে প্রতিষ্ঠা পেয়েছিলেন।
ঐ সময়ের আলোকে একজন মুসলিম নারী হয়েও কিভাবে বিশ্বমানের নারীবাদী চৈতন্যের ধারক হতে পেরেছিলেন-তা পাশ্চাত্যের অনেকের কাছেও পরম বিস্ময়ের ছিল- এ প্রসঙ্গে পশ্চিম বাংলার বিখ্যাত লেখক কেতকী কুশারী ডাইসনের মূল্যায়ন প্রাসঙ্গিক “যদিও বঙ্গদেশে স্ত্রী শিক্ষা বিস্তারে হিন্দুসমাজই অগ্রণী তবুও বিশ শতকের গোড়ায় বঙ্গললনাদের মধ্যে থেকে সবথেকে রেডিকেল, বৈপ্লবিক প্রতিবাদের দৃঢ় কণ্ঠস্বর একজন মুসলিম মহিলার নাম বেগম রোকেয়া।”
পিতৃতন্ত্রের দীর্ঘ ইতিহাসে এই প্রথম কোন নারী কুসংস্কার আর সব ধরনের প্রভুত্ববাদের বিরুদ্ধে দাঁড়ালেন অমিত সাহসে। কেন যেন মনে হয় ১৯০৪ সালে একজন মুসলিম নারী তার লেখনীর ক্ষুরধার ব্যবহারে যা লিখেছিলেন এই একুশ শতকে তা কতটুকু সম্ভব হতো? তাঁর বিশেষত্ব এই যে সে সময়েই তিনি নারীপুরুষ সমতা, পারিবারিক আইনের নারীবিরোধী চারিত্র্য, গৃহকর্মের আর্থিক মজুরি, নারীর কম মজুরি-শোষণ ইত্যাদি বিষয়ে প্রতিবাদ করেছেন। বেগম রোকেয়ার চিন্তার আরেক মৌলিকত্ব ছিল এই যে ধর্মনিরপেক্ষতার মধ্যে তিনি নারীর স্বাধীনতা ও মুক্তির পথ দেখেছিলেন। ব্যক্তিজীবনের অবরোধ-যন্ত্রণা আমৃত্যু হাজারো বাধা ও কষ্ট সব কিছুকে নিয়ে এলেন সামাজিক বেদনা হিসেবে যার বহিঃপ্রকাশ তাঁর রচনায় যেখানে নারীর স্বায়ত্তশাসিত জীবনের স্বরূপ ও তা অর্জনের সংগ্রামে মানসিকভাবে সক্রিয় ছিলেন।
রোকেয়া চেয়েছেন নারী ও পুরুষে সম্পূর্ণ সাম্য “পুরুষের স্বার্থ এবং আমাদের স্বার্থ ভিন্ন নহে- একই। তাঁহাদের জীবনের উদ্দেশ্য বা লক্ষ্য যাহা, আমাদের লক্ষ্যও তাহা।” (রো.র,৩১)। রোকেয়া লিখেছেন- মেয়েদের জন্য। নির্যাতিতা অধিকারহীন মেয়েদের দুঃখ কষ্ট একটা একটা করে তুলে ও তার প্রতিবিধান করা ছিল তাঁর লেখার উদ্দেশ্য।
‘পদ্মরাগ’ উপন্যাস এ যেন তাঁর নিজস্ব জগৎ যা প্রার্থিত মেয়েদের জন্য। তিনি আত্মজীবনী না লিখেও মনের ইচ্ছে তুলে ধরেন গল্প কাহিনীতে যা ঐ সময়েও ছিল অভাবনীয়। তাঁর প্রথম রচনা ‘গৃহ’তে বলেছিলেন- এদেশের মেয়েরা সব অবস্থাতেই অভিভাবকের বাড়িতে থাকে, প্রাণীজগতের সবার ঘর আছে কিন্তু নেই কেবল মেয়েদের। (রো.র. পৃ: ৭৪)
পদ্মরাগের তারিণীভবন কলকাতায় এর পরিচালক ব্রহ্মবিধবা দীন তারিণী এবং চরিত্র সৃষ্টিতে রয়েছে বাস্তবতার ছায়া। এটি দুস্থ-নিঃস্ব-নারীদের ভবন-আর একই সাথে হিন্দু-মুসলিম নারীদের জন্য উন্মুক্ত-কী অসাম্প্রদায়িক চেতনা বেগম রোকেয়ার! অথচ ঐ সময়ে এটি ছিল অবাস্তব-নায়িকা সিদ্দিকী বিদায়কালে বলছে-‘এমন স্থান পাইলে স্বর্গেরও প্রয়োজন নাই”-(পৃ:৩৩১) রোকেয়ার স্বর্গ নারীর নিজস্ব আবাসস্থল- কি চমৎকার এ ভবন! একে অপরকে সাহায্য করছে সহানুভূতি ও মমতায়। নিজের জীবিকা অর্জনে এখানে যারা আছেন তাদের শিক্ষিকা টাইপিস্ট বা সেবিকা হবার পথ খোলা-ছুটিতে সবাই ভ্রমণে যায় একসাথে-স্বচ্ছন্দ স্বাধীন চলাফেরা-পর্দারও বাড়াবাড়ি নেই- এ ভবন যেন দুর্গতদের লড়াইয়ের দুর্গ-বেগম রোকেয়ার ঐ সময়ে কি নারীদের জন্য আধুনিক কোন বৃদ্ধাশ্রমের ভাবনা ছিল?
তারিণীভবন সংসারের ছবি নয়, সংসার থেকে পালানো মেয়েদের চিত্র-যাদের স্মৃতিচারণায় যে সংসারের ছবি তাতে প্রচলিত ধর্মীয় আচার বিচার বা রান্না খাওয়ার কথা নেই।
বরং আছে মানুষের সম্পর্কের জটিলতার কথা-এখানে বিবাহিত নারীরা ঐ জীবনে অকৃতকার্য হয়ে এ ভবনে নিরাপদ আশ্রয় পেয়েছে। ধর্মীয় বিধিনিষেধহীন মুক্ত পরিবেশে স্বর্গতুল্য শান্তি অনুভব করেছে।
বেগম রোকেয়ার সবচাইতে বড় বৈশিষ্ট্য ছিল সমাজ চিন্তা যেখানে ম্লান হয়ে গেছে, নিজের কথা- মেয়েদের শিক্ষা ও আত্মবিকাশের মাধ্যমে পূর্ণ বিকশিত একটি ব্যক্তিতে পরিণত করাই ছিল তাঁর বাসনা। সীমিত সুযোগের মধ্যে কাজ করেও নির্ভয়ে স্ত্রী শিক্ষা প্রচারের পক্ষে ও অবরোধের বিরুদ্ধে বলে গেছেন-তাঁর কর্মজীবন যেমন, তেমনি তাঁর রচিত সাহিত্যও তুলে ধরে সংগ্রামী এক মহীয়সী নারী রোকেয়ার পরিচয়।
লেখক : শিক্ষাবিদ, কলামিস্ট