পরভাষাপ্রীতি গ্রাস করছে আমাদের

হাফিজ রশিদ খান

বিগত বিশ শতকের ১৯৯৯ সালের নভেম্বর মাসে জাতিসংঘের ইউনেস্কো কর্তৃক বাংলাদেশ ও বাঙালি জাতির ঐতিহাসিক মানসসম্পদ মহান একুশে ফেব্রম্নয়ারিকে আনত্মর্জাতিক মাতৃভাষা দিবসের স্বীকৃতি দেয়া হয়েছিল। ওই সময় খুব বড় এক আনন্দের বন্যা বয়ে গিয়েছিল সারাদেশজুড়ে। গৌরবের অনুভূতিও তাতে কম ছিল না। জাতীয় জীবনের গভীর বেদনাবহ অথচ আত্মমর্যাদাম-িত দিনটির বৈশ্বিক স্বীকৃতি অর্জনে সকল বাংলাভাষিকে ওই সময়ে স্বতঃস্ফূর্ত ভাবাবেগে উদ্বেলিত হতে দেখা গেছে। পাশাপাশি এও খেয়াল করবার বিষয় ছিল যে, ওই দিবসটি প্রধানত পৃথিবীর বিপন্ন ও লুপ্তপ্রায় অথবা বৃহৎ ভাষাভাষি জনগোষ্ঠীর হুমকির মুখে পতিত জাতিগত সংখ্যালঘু মানুষের ভাষাগুলোকে সুরড়্গা দেবার জন্যেই প্রতীকীভাবে উদযাপনে প্রণোদনা দেয়া হয়েছে। যাতে তাদের প্রতি বড় তরফের মানুষেরা বা শাসকগোষ্ঠী বা ড়্গমতাবানেরা সুনজর দিতে উৎসাহী হয় এবং ওই ড়্গুদ্র ভাষাভাষিরা যেন তাদের ভাষাকে অবহেলিত বা ‘অপর’ মনে করে বিমর্ষ মনে দিনাতিপাত না করে।
যুক্তি, মানবিক সংসক্তি ও সংবেদনার দিক থেকে উলিস্নখিত বিষয়গুলো নিঃসন্দেহে ইতিবাচক। সেই সঙ্গে এও প্রশ্ন জাগে মনে, উলিস্নখিত সংবেদনা ও সুবিবেচনার পথ ধরেই কি সবকিছু চলছে এখন বিশ্বজুড়ে? সারা দুনিয়ার দিকে দৃষ্টির গোলক
একটু ঘুরিয়ে আনলে আমাদের বোধের ভেতরে যে অনুভাবনা সঞ্চিত ও সঞ্চালিত হচ্ছে তা কি আমরা তলিয়ে দেখছি? কোনো দেশ বা ভূখ-ের ওপর কোনো বড় শক্তি যদি নানা আর্থসামাজিক-রাজনৈতিক কারণে আক্রমণাত্মকভাবে ঝাঁপিয়ে পড়ে বা লাগাতার হুমকি-ধমকি চালাতে থাকে- তার সঙ্গে ওই ভূখ-ের মানুষগুলোর আবেগ-অনুভূতির প্রধান বাহন ভাষা বা ভাষাবাহিত সভ্যতা-সংস্কৃতির কী দশা হয়, সে বিবেচনা কি থাকে তখন? থাকে না যে তার প্রমাণ ইতিহাসের পাতায় আছে ভুরি-ভুরি।
সেসব উদাহরণ টেনে প্রসঙ্গটাকে ভারাক্রানত্ম করতে চাই না। তা চে’ বরং ফিরি বাংলাদেশেই, যে-ভূখ- মহান একুশের অগ্নিতপ্ত ধারণার জন্ম দিয়েছে এবং সে ধারণাকে সঠিক পরিচর্যা দিতে সফল হয়েছে বলে দুনিয়ার লোকে এ দিনটিকে মানব অসিত্মত্বের পড়্গে একটি যুৎসই দিন বলে মেনে নিয়েছে।
দেখা যাচ্ছে, বাংলাদেশের পত্রপত্রিকা থেকে শুরম্ন করে বুদ্ধিজীবীদের প্রায় প্রত্যেকের লেখায় একুশের চেতনার কথা এবং আনত্মর্জাতিক মাতৃভাষা দিবসের কথা সমমর্যাদায়, একই সমতালে উচ্চারিত হচ্ছে। কেউ-কেউ তো শুধু একুশের চেতনাকে প্রাধান্যে রেখে, আনত্মর্জাতিক মাতৃভাষা দিবসের বিষয়টিকে গৌণ করে নিজেদের বক্তব্য পেশ করেছেন। তবে কি এঁরা ‘আনত্মর্জাতিক’ শব্দটার প্রতি কিছুটা সন্দেহ পোষণকারী ? তারা কি ভাবেন যে, ইরাকের তেলখনির মতো আমাদের ভাষাচেতনাও তথাকথিত আনত্মর্জাতিক বাজারে বিক্রি হয়ে গেল? ওইসব আনত্মর্জাতিক ডামাডোলের ভেতরে পড়ে মাতৃভাষাকে রাষ্ট্রীয়ভাবে প্রতিষ্ঠিত করার একুশের জনয়েত্রী খোদ বাংলাদেশেই বাংলাভাষার সার্বিক পরিবেশ-পরিসি’তি এখন কোন্ পর্যায়ে, কোনো সচেতন মানুষ যদি অকস্মাৎ এ মতো প্রশ্ন ছুঁড়ে দেন, কীভাবে নেবেন অন্যেরা, আনত্মর্জাতিক ভাষাচেতনায় উদ্বুদ্ধ জ্ঞানীগুণীরা ?
প্রকৃত অবস’া হচ্ছে, দিন যত যাচ্ছে নিজভাষার চেয়ে পরভাষার প্রতিই, বিশেষত ইংরেজির প্রতি, বাংলাদেশের মানুষের অনুচিত পড়্গপাতিত্ব বাড়ছে। এদেশের অতিসাধারণ মানুষও তাদের বিবাহ-আকিকা বা সামাজিক অনুষ্ঠানের আমন্ত্রণপত্রে মহাগৌরবে ইংরেজি ভাষা ব্যবহার করে সুখ পাচ্ছে। সমাজের উপরস’, যারা সুশীল কিংবা অভিজাত বলে নন্দিত-বন্দিত, তাদের আদব-কায়দা প্রকাশের ভাব-ভঙ্গিতে প্রধানত ইংরেজি ভাষাপ্রীতির কথা নাই-বা বললাম। একই সঙ্গে এই বাংলাদেশে বিশেষত ইংরেজি ভাষা জানা-বোঝা ও তার স্বচ্ছন্দ প্রয়োগে সুপরিসর জীবিকার্জনের পথ উন্মুক্ত হওয়ার বিষয়টিও ভাবনার প্রকোষ্ঠে জমা রাখা যাক। আরও অর্থনৈতিক ও অন্যান্য মর্যাদাযুক্ত আছে এমন বিদেশি ভাষার প্রতি পড়্গপাতের বিষয়টিও ধর্তব্যে থাকলে আরও ভালো। (যেমন : আরবি চীনা জাপানি ইত্যাদি ভাষা)। এখন তো খোদ সরকারি ও অন্যান্য বেশির ভাগ বেসরকারি শিড়্গা ও ব্যবসায়িক উদ্যোগেও ইংরেজিকে খুব মহার্ঘ ভাষিক উপাদান বলে মূল্যায়ন করা হচ্ছে। দেশের কিন্ডারগার্টেন থেকে উচ্চশিড়্গার সকল পর্যায়ে এমন পরভাষাপ্রীতি এর আগে এমন পর্যায়ে দেখা গেছে কী? কেজো বুদ্ধির লোকেরা হয়তো তাৎড়্গণিকভাবে অতিউৎসাহী হয়ে বলবেন, মুক্তবিশ্বের সঙ্গে তাল মেলাতে এর কোনো বিকল্প নেই। ঠিক পাশাপাশি কথা আসে, এই মুক্তবিশ্বভাবনায় স্বভাষা-স্বজাতি এসবের কোনো প্রাসঙ্গিকতা আছে কিনা। স্বদেশেই বাংলাভাষাকে হটিয়ে ভিনভাষা যদি পরিসর দখল করে নেয়, ওটাকে কি বলা যাবে? এটাই যদি আনত্মর্জাতিকতার অর্থ হয়, তাহলে একুশে এলে বাংলাভাষার প্রতি, বাংলা চিরায়ত গানের প্রতি, সংস্কৃতির আরও নানা অনুষঙ্গে দরদে উদ্বেলিত হই কেন? যেসব দেশ বা ভূখ- থেকে ‘আনত্মর্জাতিকতা’ আসে, তারাও কি আমাদের মতো অন্যভাষা, ভিনদেশি সহবত নিয়ে পড়ে থাকে সারাবছর?
না, আমি আনত্মর্জাতিক চেতনার রড়্গণশীল প্রতিপড়্গ নই। কোনো শিড়্গিত, সচেতন মানুষ তা হতেও পারে না। তবে এটুকু বুঝি যে, পরের মুখের ঝাল খেতে খেতে আমরা তাদেরি ঔরসে বা গর্ভের জাতক হয়ে বেখাপ-বেমানান হতে চলেছি যেন।