পবিত্র মে’রাজ : নবীর শান ও উম্মতের কল্যাণ

হাফেজ মুহাম্মদ আনিসুজ্জমান

মহান আল্লাহ্‌ তাআলাই সমস্ত প্রশংসার হকদার, যিনি আরশ্‌ ও কুরসীসহ সমগ্র উর্ধজগত শুধু সৃষ্টিই করেন নি, বরং সেখানে তাঁর প্রিয়তম বান্দাকে পরিভ্রমণ করিয়েছেন। তাঁর পবিত্রতা, যিনি সকল অক্ষমতা ও অপারগতা থেকে সম্পূর্ণ পবিত্র। তাঁর কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপন করি, যিনি তাঁর সৃষ্টির মধ্যে সর্বোচ্চ মকামে আমাদেরই প্রিয় নবীকে অধিষ্ঠিত করেছেন। তাঁর প্রতি ও তাঁর সকল সাহাবী ও বংশধরগণের প্রতি অসংখ্য দরূদ ও সালাম।
আল্লাহ্‌ তা’ আলার একত্বে আমাদের বিশ্বাস অকপটে প্রকাশ করি, যা ছাড়া আখেরে মুক্তির উপায় নেই। তিনিই ইলাহ্‌। তিনি বিনে কোন ইলাহ্‌ নেই। আর আমাদের মুক্তির অবতার ও ছাহেবে কাওসার সায়্যিদুল আবরার হযরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আল্লাহর সৃষ্ট ও উপাসক এবং তাঁরই প্রিয়তম রাসুল।
আল্লাহ তাআলার অনুপম, অতুলনীয় সৃষ্টি আমাদের প্রিয় নবী। তাঁর কোন উপমা নেই, তুলনা নেই, এক কথায়-সৃষ্টিতে তাঁর মত আর কেউ নেই। তাঁর অসংখ্য মু’জিযার মধ্যে অত্যুজ্জ্বল ঘটনা মে’রাজুন্নবী (দ.)। তাঁর হাকীকতের সত্যত্রয় ধাপে ধাপে সেই উর্ধযাত্রার তিনটি স্তরে উদ্ভাসিত হয়েছিল। সর্বশেষ স্তর সিদরা থেকে সেই আওআদনার লা-মকানে, যা বুঝবার বা বুঝাবার সাধ্য আমাদের নেই। বর্ণনা যাঁরা করেছেন কুরআন সুন্নাহর আলোকে, তাঁদের কথার কিছু পূনরাবৃত্তি করে নিজেদের বিশ্বাস প্রকাশের শুধু প্রয়াস চালানো মাত্র।
রাসূলুল্লাহ্‌ (দ.) র উর্ধগমনের শেষ গন্তব্য নিয়ে উলামায়ে উম্মত থেকে প্রাপ্ত তথ্য নানা মুনির নানা মত। কেউ বলেছেন সিদরাতুল মুন্তাহা পর্যন্ত, কেউ বলেছেন আরশ পর্যন্ত, আর কেউ বা বলেছেন, তিনি আরশেরও উর্ধে তাশরীফ নিয়ে গেছেন। ইমাম বুখারী (রহ.) র বর্ণিত হাদিসে রয়েছে ‘পরাক্রমশালী আল্লাহ্‌ রাব্বুল ইয়যত (রাসুলুল্লাহ্‌র) নিকটবর্তী হলেন, অতঃপর (একে অপরের) আরো নিবিড় নৈকট্য চাইলেন। এমনকি আল্লাহ তাআলা রাসূলুল্লাহর দুই ধনুক পরিমাণ, কিংবা এর চাইতেও নিকটতম হয়ে যান।” এ হাদীসের ব্যাখ্যায় উল্লেখযোগ্য মনীষীদের মন্তব্য, “রাসূল প্রেমময় আল্লাহর বরকতময় ঐশীরূপ স্বচক্ষে অবলোকন করেছেন।” (আইনী, ফতহুল বারী, নিবরাস, শরাহ আকায়েদ প্রভৃতির বরাতে গাযযালিয়ে যমান সায়্যিদ আহমদ সাঈদ কাযেমী রহ.) বুখারী শরীফের মূল হাদীসে বর্ণিত কিছু শব্দ হুবহু পবিত্র কুরআনের সুরা নাজ্‌ম’এ বর্ণিত শব্দমালা সরাসরি উক্ত হয়েছে। সুরা নাজম্‌ থেকে মে’রাজ সম্পর্কিত আয়াতগুলোর তর্জমা পত্রস্থ হল, “দীপ্তিমান প্রিয় নক্ষত্র (মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহিওয়া সাল্লাম)’র শপথ, যখন সেই প্রিয়সত্তা মে’রাজ থেকে প্রত্যাবর্তন করেন। তোমাদের সঙ্গী না বিভ্রান্ত হয়েছেন, না বিপথগামী। আর তিনি কোন কথা নিজের খেয়াল খুশীমতে বলেন না। সেটা তো ওহীই, যা তাঁর প্রতি প্রত্যাদেশ করা হয়। তাঁকে শিক্ষাদান করেছেন মহাশক্তিমান, ক্ষমতাধর সত্তা। অতঃপর তা স্থির হয়েছে, যা ছিল আসমানের সবচেয়ে উঁচু প্রান্তে। অতঃপর তিনি তার নিকটবর্তী হলেন, আরো নৈকট্য চাইলেন। ফলে তাঁদের মধ্যে দু’ ধনুকের মত ব্যবধান রইল, অথবা আরো কম। তারপর তিনি তাঁর ওই বান্দার প্রতি যা প্রত্যাদেশ করার তা করলেন। যা তিনি চোখে দেখলেন অন্তর তা অস্বীকার করেনি। তবে তিনি যা দেখেন তাতে তোমাদের কি সংশয় রয়েছে? নিঃসন্দেহে তিনি তাঁকে আরেক বার সিদরায়ে মুন্তাহার নিকট থেকে দেখেছিলেন, যেখানে রয়েছে জান্নাতুল মা’ওয়া। যখন সিদরাকে তা আচ্ছাদিত করেছিল যা আচ্ছাদিত করে থাকে। দৃষ্টি না লক্ষ্যচূত হয়েছে না বিভ্রাটগ্রস্থ।
নিঃসন্দেহে তিনি অবলোকন করেছেন তাঁর মহান পালনকর্তার নিদর্শনাবলি”। (আয়াত নং ১-১৮)
গাযযালিয়ে যমান (রহ.) এ প্রসঙ্গে ইবনে কাসীরের রেওয়ায়েত উদ্ধৃত করেছেন যে, হুযূর করিম (দ.) ইরশাদ করেন, “অতঃপর জিবরীল (আ.) আমাকে নিয়ে রওয়ানা হওয়ার পর সিদরাতুল মুন্তাহা পর্যন্ত পৌঁছি। ওটাকে মেঘের মত কিছু কিছু বস্তু ঢেকে নিয়েছে। যাতে ছিল প্রত্যেক প্রকার রং। এরপর জিবরীল আমাকে একাকী ছেড়ে দেয়। আমি আল্লাহ্‌র উদ্দেশ্যে সিজদাবনত হলাম।” অর্থাৎ এখান থেকে জিবরীল (আ.) ফিরে গেলেন। বুখারী শরীফের ব্যাখ্যাকারী ইমাম শা’বানী বর্ণনা করেন যে, এখানে একখানা সবুজ রংয়ের সিংহাসন উপস্থিত হল যার নাম রফরফ। তার সাথে বিশেষ একজন ফেরেশতার আগমন হয়। জিবরীল তারই নিকট মে’রাজের মহান অতিথিকে সোপর্দ করে ফিরে যান।
সুরা বনি ইসরাঈল‘র প্রারম্ভেও মে’রাজের বর্ণনা বিদ্যমান। ১ম আয়াতের শেষ ভাগে বলা হয়েছে, “তিনি শোনেন, তিনি দেখেন।” রূহুল মাআনী গ্রন্থকার বলেন, ‘তিনি’ সর্বনাম দ্বারা রাসূলুল্লাহ্‌ (দ.) কে বুঝানো হয়েছে। সুরা নাজম’র এক আয়াতে আছে, আল্লাহ্‌ তাঁর বান্দার প্রতি যা ওহী করার তা করেছেন। আবার এটাও রয়েছে যে, তিনি নিজ মহান রবের নিদর্শনাবলি দেখেছেন। তাহলে ওখানে প্রিয় নবীর শোনারও দেখার বিষয়টি সাব্যস্থ হয়ে যায়। সুরা বনী ইসরাইলের এক আয়াতে এ মু’জিযাকে বিশ্বাসী ও অবিশ্বাসীদের ‘পরীক্ষার বিষয়’ স্থির করার কথাও ঘোষিত হয়েছে। একাধিকবার পবিত্র কুরআনে বর্ণিত বিষয়ে কোন ভাবেই তো সংশয় রাখা যায় না। রূহুল বায়ান গ্রন্থকার হযরত ইমাম জাফর সাদিক (রাদি.) থেকে বর্ণনা করেন, তিনি বলেছেন, ‘আল্লাহ তাআলা তার বান্দার প্রতি ওহী করেছেন অর্থাৎ সে রাতে যে কালাম করেছেন। তা কোন মাধ্যম ব্যতীত, যা গোপনে তাঁর (দ.) ক্বলব মুবারকে স্থাপিত হয়ে গেছে।
বেহেশতে ভ্রমণকালে হুযূর (দ.) হযরত বেলাল (রাদি.) র জুতার আওয়াজ শুনেছিলেন। ওই সময়ে হযরত বেলাল বেহেশত নয়, ছিলেন দুনিয়াতে। এ আওয়াজ যদি দুনিয়ার আওয়াজ বুঝানো হয়, ফলে বলতে হবে, নবীজি অনেক দূরের আওয়াজ শুনেন। আর যদি এটা কিয়ামতের পর চলার আওয়াজ হয়ে থাকে, তাহলে মানতে হবে যে পরে অস্তিত্বপ্রাপ্ত এ রকম আওয়াজ তিনি অনেক পূর্বেই পেয়ে গেছেন, যা আরো অনেক বেশি উৎকর্ষের। অথবা হযরত বেলাল একই সময় দুনিয়াতেও বিচরণশীল, ফের প্রিয় নবীর গোলামীর কল্যাণে বেহেশতেও, যার পদধ্বনি নবুওয়তের পবিত্র কানে শ্রুত হয়েছে। যদি নবীর গোলামদের শান এমন হয়, তবে কি আমরা ভাবতে পারব যে মুনিবের শান কেমন হবে?
মে’রাজ হতে উম্মতের জন্য কুদরতের পক্ষ হতে আমাদের নবী উপহার এনেছেন পাঁচ ওয়াক্ত নামায। যা বেহেশতের চাবি, মুমিনের মে’রাজ। যার মধ্যে আল্লাহ্‌ ও রাসূলের আলাপচারিতা তাশাহ্‌হুদের সূরতে বিদ্যমান। এ নামাযের সংখ্যা পঞ্চাশ থেকে হ্রাস পেয়ে পাঁচে এসে ঠেকেছে। যদিও আল্লাহ্‌র হাবীব (দ.) উম্মত পাঁচ ওয়াক্ত পড়বে, কিন্তু সওয়াবের হিসাবে পঞ্চাশই বহাল থাকবে। মে’রাজের সফরে প্রিয় নবী বেহেশত দোযখ পরিদর্শন করে এসেছেন। তাই উম্মতের নামায বেহেশতের চাবি হওয়ার প্রবল যুক্তি রয়েছে। সুরা বাকারার শেষ দুটি আয়াতও মে’রাজ থেকে তোহ্‌ফা স্বরূপ নবীজিকে প্রদান করা হয়। আরো একটি আনন্দের বার্তা আমরা পাপী উম্মতের জন্য এটা রয়েছে যে, সিদরাতুল মুন্তাহা থেকে অগ্রসর হওয়ার সময় নবীজি জিবরীল (আ.) কে জিজ্ঞেস করেছিলেন ‘আল্লাহর নিকট তোমার বিশেষ আবেদন থাকে তো বলো।’ তখন জিবরীল আরয করেন, আল্লাহর কাছে এটাই আবেদন করবেন যে হাশরের দিন আপনার উম্মত পুল সিরাত অতিক্রম করার সময় আমি আমার ডানা জোড়া সেথায় বিছিয়ে দিতে চাই, যাতে তারা সহজে তা পার হয়ে যায়, এ মে’রাজ নবীরও শান উম্মতের ও কল্যাণ।

লেখক : আরবী প্রভাষক, জামেয়া আহমদিয়া সুন্নিয়া আলীয়া মাদ্রাসা। খতিব : হযরত খাজা গরীব উল্লাহ শাহ (র.) মাজার জামে মসজিদ।