পথিকৃৎ সাহিত্যিক

আবুল মোমেন

বাংলা গদ্যের সূচনা হয়েছিল খ্রিস্টান পাদ্রি আর হিন্দু পণ্ডিতদের হাতে ঊনবিংশ শতাব্দীর গোড়ায়। বাঙালি মুসলমান সুলতানি আমলে পদাবলী করেছে, কিছু পরে আরাকান রাজসভায় কাব্যচর্চা করেছে। পুথিসাহিত্যের ইতিহাসও কম পুরোনো নয়, যাতে মুসলিম লেখকদের অবদানই বেশি। তবে গদ্য রচনায় তাঁদের অংশগ্রহণ ঊনবিংশ শতাব্দীর শেষ দিক থেকেই ভালভাবে শুরু হয়।
কথাসাহিত্যে বাঙালি মুসলমানের গুরুত্বপূর্ণ অবদান শুরু হয় আরও পরে। এ ক্ষেত্রে মীর মশাররফ হোসেনের নাম সবার আগে আসবে – মূলত বিষাদসিন্ধুর কারণে। ইসমাইল হোসেন সিরাজী সাহিত্যের সব শাখায় বিচরণ করলেও সৃজনশীল রচনা হিসেবে এসবের মান ততটা উচ্চস্তরের নয়। উপন্যাস হিসেবে কাজী ইমদাদুল হকের আবদুল্লাহ এবং নজিবর রহমান সাহিত্যরত্নের আনোয়ারা প্রথম পাঠক ও সমালোচকদের নজর কাড়ে। বেগম রোকেয়া, কাজী আবদুল ওদুদ, কাজী নজরুল ইসলামের মত গুরুত্বপূর্ণ মুসলিম লেখক উপন্যাস রচনা করলেও তাঁদের এসব সৃষ্টির সাহিত্যমূল্য এবং তাঁদের মূল অবদানের প্রেক্ষাপটে ততটা বেশি নয়। এদিক থেকে মাহবুব উল আলমের গল্প ও উপন্যাসের মান বাংলা সাহিত্যের বিচারে যথেষ্ট উন্নত। একটিমাত্র উপন্যাস লিখে কথাসাহিত্যের পথ-রচনায় সহায়তা করেছেন মনীষী হুমায়ুন কবিরের মত প্রতিভাবান বুদ্ধিজীবী। এর আগে আবুল মনসুর আহমদ ব্যঙ্গাত্মক সাহিত্যের মাধ্যমে সমাজে বিরাজমান অসংগতি ও কুসংস্কারের তীব্র সমালোচনা করেছেন। আবুল ফজল তাঁর সমাজ সংস্কারক ও প্রগতিচেতনার ধারায় মানবতাবাদী আদর্শভিত্তিক উপন্যাস রচনা করেছেন। আবু রুশদ-এর প্রয়াসেও কিছু সীমাবদ্ধতা ছিল- নাগরিক আভিজাত্যের গণ্ডির বাঁধন ভেঙে জীবনের বৃহত্তর পরিসরে তিনি আসতে পারেননি। গ্রামবাংলার সাধারণ কৃষিসমাজের যে জীবন এবং তার আধুনিক জীবন গঠনের প্রয়াস, রাজনীতির নানান বাঁক, সমাজের অগ্রগতি ও পিছুটান, জাতি ও রাষ্ট্রগঠনের বিচিত্র অভিজ্ঞতার বয়ান লেখার দায় পালনে এগিয়ে এলেন শওকত ওসমান, আবু জাফর শামসুদ্দীন, সরদার জয়েনউদ্দীন আর আবু ইসহাক প্রমুখ। এঁদের বলা যায় বাঙালি মুসলিম কথাসাহিত্যের দ্বিতীয় প্রজন্ম। এঁদের প্রায় এক দশকের কনিষ্ঠ সৈয়দ ওয়ালিউল্লাহ পূর্ববঙ্গের মুসলিম গ্রামসমাজের বয়ানই লিখলেন, কিন্তু তাঁর মৌলিকত্ব ও স্বাতন্ত্র্যে বাংলা সাহিত্যে বিশিষ্ট হয়ে থাকলেন।
শওকত ওসমান, আবু জাফর শামসুদ্দীন ও সরদার জয়োনউদ্দীন রাজনীতি সচেতন লেখক এবং বাঙালি জাতির অগ্রযাত্রার বিষয়ে এক ধরনের অঙ্গীকারাবদ্ধ ছিলেন। এঁরা মাদ্রাসায় শিক্ষিত, গ্রামেই বড় হয়েছেন এবং বাঙালি মুসলিম সমাজকে ভালোভাবেই জানেন। শেষোক্ত দু’জন প্রথম জীবনে রাজনীতিতে সক্রিয় ছিলেন। তবে তিনজনই চিন্তাচেতনায় ছিলেন প্রগতিশীল, অসাম্প্রদায়িক এবং সমাজতন্ত্রের প্রতি আস্থাশীল। তবুও তুলনায় শওকত ওসমান প্রধানত সাহিত্যিশিল্পী – রাজনীতি তাঁর মানসের প্রধান প্রণোদনা হলেও জীবনের অন্যান্য বিষয়ও তাঁকে ভাবিয়েছে, লেখায় সেসব তুলে আনতে উদ্বুদ্ধ করেছে।
আবু জাফর শামসুদ্দীনের পদ্মা মেঘনা যমুনা, সরদার জয়েনউদ্দীনের অনেক সূর্যের আশা বাংলার মুসলিম সমাজের রাজনৈতিক অভিযাত্রাকে তুলে ধরার ব্রত থেকেই যেন লেখা। উপন্যাসের কুশীলবরা সেই ইতিহাসের ধারা ও বাঁক, অগ্রগতি ও পিছুটান, সম্ভাবনা ও ব্যর্থতার বয়ান নির্মাণে ভূমিকা পালন করেছে, শওকত ওসমান জননী উপন্যাসে গ্রামীণ সমাজ এবং তার এক বিশিষ্ট নারী-চরিত্রকে ঘিরে অনেক চরিত্রই তুলে আনেন – মুসলিম রাজনীতির প্রেক্ষাপট ছাপিয়ে মানব-জীবনের পরিসরেই তাঁদের ফুটিয়ে তুলতে চান।
যখন শওকত ওসমান রাজনীতির অঙ্গনে পদচারণা করেন তখন রূপকের আশ্রয় নিয়ে তীব্র ব্যঙ্গের কষাঘাতে একেবারে লক্ষ্যভেদী হতে চেয়েছেন তাঁর ক্রীতদাসের হাসি পাকিস্তান আমলে রচিত হয় সামরিক স্বৈরাচারকে ব্যঙ্গ ও আক্রমণের বিষয়বস্তু করে। আমাদের সাহিত্যে এটি একটি ব্যতিক্রমী সাহসী সংযোজন। এ তাঁর আদর্শিক লড়াই বটে, কিন্তু সাহিত্যেরই ফর্মের মধ্যে থেকে তা চালালেন। তাঁর গল্পে এবং অন্যান্য উপন্যাসেও আমরা দেখি রাজনীতি বা রাজনৈতিক ইতিহাসের প্রেক্ষাপটে কিংবা চৌহদ্দিতে তিনি আটকে থাকেননি। জীবনেরই গল্প বলার চেষ্টা করে গেছেন।
শওকত ওসমান পশ্চিমবঙ্গ থেকে দেশভাগের পরে এদেশে এসেছেন, মাদ্রাসা শিক্ষার পরে উচ্চতর পর্যায়ে বাংলা সাহিত্য নিয়ে পড়েছেন। বাংলাদেশের গ্রামের সাথে তাঁর প্রত্যক্ষ পরিচয় নেই, তা গড়ে উঠেছে নাগরিক সমাজের সাথে।
কিন্তু এদেশটি, বিশেষত এর সচেতন শিক্ষিত নাগরিক সমাজের জীবনের বড় অংশ জুড়েই আছে রাজনীতি- সেই ’৪৭-এর দেশভাগের পর থেকেই। শওকত ওসমান বেশিদিন আগন্তুক হয়ে থাকেননি। জাতির মূলধারা কেবল চিনে নেননি তা বিনির্মাণে সক্রিয় অংশ নিয়েছেন, ভাবনা-চিন্তা দিয়ে তার রূপায়ণে ভূমিকা পালন করেছেন। সেই থেকে শওকত ওসমান পূর্ব বাংলার সাহিত্যিক বুদ্ধিজীবীদের অগ্রসেনাদের একজন। বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পরে সে অবস্থান আরো পাকাপোক্ত হয়েছে। পঁচাত্তরের নারকীয় হত্যাকাণ্ডের পরে তিনি দেশান্তরী হয়ে নিজের পক্ষপাত ও অবস্থান স্পষ্ট করলেন। এটি কেবল বঙ্গবন্ধুর প্রতি আনুগত্য বা তাঁর দলের প্রতি পক্ষপাত প্রকাশ করে না, বরং এ থেকে মুক্তিযুদ্ধ ও স্বাধীনতার চেতনা ও অসাম্প্রদায়িক গণতান্ত্রিক বাংলাদেশের প্রতি তাঁর অবিচল সামূহিক অঙ্গীকারই প্রকাশ পায়। যিনি রণাঙ্গনের যোদ্ধা নন, যাঁর লড়াইয়ে মূল অস্ত্র কেবল কলম ও লেখা তাঁর জন্যে দেশত্যাগীর উদ্বাস্তুজীবন কেবল অনিশ্চিতিতে ভরা নয়, দারুণ কষ্টকর ও হতাশাময় হতে পারে। শেষ পর্যন্ত তা হয়েও ছিল। তবে বাংলাদেশের লড়াকু ছাত্রজনতা কখনো হাল ছাড়েনি বলে তাঁর জন্যে স্বদেশ প্রত্যার্তনের মত বাস্তবতা তৈরি করতে পেরেছিল। দেশে ফিরে শওকত ওসমান তাঁর লড়াইকে আরো শাণিতই করলেন। এ পর্যায়ে বাংলাদেশকে সঠিক পথে ফিরিয়ে আনার সংগ্রাম জীবনের মুখ্য বিবেচ্য বিষয় হয়ে উঠেছিল অন্য অনেকের মতই।
বাংলাদেশ, বহু বছর পরে, বঙ্গবন্ধু-কন্যার নেতৃত্বে তার প্রতিষ্ঠিত পথে ফিরে এসেছে। এর পেছনে শওকত ওসমানের ভূমিকা অনস্বীকার্য। তবে বাংলাদেশের এই সঠিক বাংলাদেশ হয়ে ওঠার ফিরতিযাত্রা বা অভিযাত্রা এখনো শেষ হয়নি। তাই শতবর্ষে তাঁকে স্মরণ ও শ্রদ্ধাঞ্জলি জানাতে গিয়েও বলতে হবে যে তাঁর অভাববোধ এখনও শেষ হয়নি। শওকত ওসমান পরিণত বয়সেই মৃত্যুবরণ করেছিলেন বটে, কিন্তু বাংলাদেশ যে এখনো রাষ্ট্র হিসেবে পরিণত হয়ে উঠতে পারেনি! তাই শওকত ওসমানের মত মানুষের অভাব এখনো ভীষণভাবে অনুভূত হচ্ছে দেশে। তবে লেখকের শরীরী মৃত্যু ঘটলেও লেখার মাধ্যমে তাঁরা তো অমর।
শওকত ওসমান এদেশের অমর পথিকৃৎদের একজন। শতবর্ষে তাঁকে গভীর শ্রদ্ধা জানাই।

আপনার মন্তব্য লিখুন