পথশিশুদের শৈশব রাষ্ট্র ও সমাজের দায়িত্ব রয়েছে

রায়হান আহমেদ তপাদার

আজ যে শিশু, আগামী দিনে সে পিতা, দেশের নাগরিক ও নেতৃত্ব প্রদানকারী একজন পরিপূর্ণ মানুষ। নশ্বর এই পৃথিবীতে একজন চলে যায় আরেকজনের আগমনের মাধ্যমে সে স’ান পূর্ণ করে। এড়্গেত্রে একজন যোগ্য শিশুই পারে সমাজকে বিকশিত করতে, আলোকিত করতে। শিশু গড়বে দেশ, যদি পায় পরিবেশ।বসত্মুত প্রশ্ন জাগে এই শিশুদের জন্য সত্যিকারের একটা বাসযোগ্য বাংলাদেশ কি আমরা গড়তে পেরেছি? শিশুরা কতটা নিরাপদে আছে আমাদের দেশে! তাদের বেঁচে থাকার অধিকার, পূর্ণমাত্রায় বিকাশের অধিকার,শাসন-শোষণ
নির্যাতন-কুপ্রভাব, পাচার, পতিতাবৃত্তি থেকে নিরাপদ থাকার অধিকার এবং পারিবারিক, সাংস্কৃতিক ও সামাজিক জীবনে পুরোপুরি অংশগ্রহণের অধিকার ইত্যাকার বিষয়ে আজও আমরা সামগ্রিক সাফল্য অর্জন করতে পারিনি। সাধারণত উপযুক্ত শিড়্গা প্রদান, স্বাস’্য পরিচর্যা এবং আইনগত নাগরিক ও সামাজিক সেবা প্রদানের মাধ্যমে শিশুদের অধিকার গুলো সংরড়্গণ করা হয়ে থাকে। যা কেবলমাত্র রাষ্ট্রীয় সুশাসন, প্রচলিত আইন ও নীতির যথার্থ প্রয়োগের মাধ্যমেই বাসত্মবায়ন সম্ভব। সেড়্গেত্রে প্রাথমিক শিড়্গার বিসত্মার, শিশুর দরিদ্র বিমোচনের লড়্গ্যে নানাবিধ অর্থনৈতিক কর্মসূচি গ্রহণ, ঝুঁকিপূর্ণ শিশু শ্রম থেকে শিশুদের নিবৃত্ত করা, নারী ও শিশু নির্যাতনের বিরম্নদ্ধে কঠোর আইন প্রণয়ন ও বাসত্মবায়ন করা, শিশুর জীবন রড়্গা ও সুস্বাসে’্যর নিশ্চয়তা বিধান করা, অতঃপর শিশুর শারীরিক ও মানসিক বিকাশ ও উন্নয়নে রাষ্ট্র কর্তৃক সার্বিক প্রচেষ্টা গ্রহণ মূলত এর আওতাভুক্ত।
উলেস্নখ্য, জাতিসংঘের শিশু অধিকার সনদ অনুযায়ী ১৮ বছরের কম বয়সী সকল মানুষকে শিশু হিসেবে সংজ্ঞায়িত করেছে। এমনকি শিশু অধিকার বিষয়ে বলা হয়েছে, শিশুর শারীরিক ও মানসিক অপরিপক্কতার কারণে জন্মের আগে ও পরে তাকে উপযুক্ত আইনি সুরড়্গাসহ বিশেষ নিরাপত্তা ও পরিচর্যা দিতে হবে। অর্থাৎ শিশুর নিরাপত্তা ও সুষম বিকাশের জন্য প্রত্যেক জাতির ঐতিহ্য ও সাংস্কৃতিক মূল্যবোধের যথাযথ গুরম্নত্ব দেয়া প্রয়োজন। অথচ আমাদের দেশে আমরা শিশুদের ড়্গেত্রে সেই মানবিক মূল্যবোধ, মর্যাদা, ন্যায়বিচার ও শানিত্মর ভিত্তি সার্বিক অর্থে প্রতিষ্ঠিত করতে পারিনি।
রাজধানী ও সারাদেশে এমন অগণিত শিশু রয়েছে যাদের পথেই জন্ম, পথেই বসবাস। এক পরিসংখ্যানে জানা যায়, রাজধানীসহ সারাদেশে যে প্রায় ৩৪ লাখ পথশিশু রয়েছে তাদের শতকরা ৮০ ভাগেরই জন্ম ফুটপাতে। বাংলাদেশের দূর-দূরানত্ম থেকে স্বজনহারা এসব পথশিশু এসে শহর-বন্দরে জড়ো হয়। দারিদ্র্যের নির্মম কষাঘাতে, অবহেলা, অযত্নে এসব শিশুরা মাদকাসক্ত হয়ে নানাপ্রকার অপরাধমূলক কর্মকা-ে জড়িয়ে পড়ছে।
বাংলাদেশসহ সারা বিশ্বেই সুবিধাবঞ্চিত শিশুদের দেখা মেলে। বিশেষ করে উন্নয়নশীল, স্বল্পন্নোত বা অনুন্নত দেশগুলোতে এদের দেখা বেশি মেলে। আমাদের দেশেও চারদিকে তাকালেই এধরনের শিশুর দেখা মেলে। রাসত্মা বা ফুটপাত যাদের ঠিকানা। বড়লোকের আহ্লাদে বড় হয়ে ওঠা শিশুদের পাশাপাশি এরাও বড় হয়। অভাব যাদের জীবনে নিত্যসঙ্গী। খোলা আকাশ যাদের মাথার ওপর ছাদ হয়ে থাকে। জন্মের পরপরই তারা পৃথিবীর এক অন্যরকম চিত্র দেখতে দেখতে বড় হয়ে ওঠে। ধনী-গরিবের ব্যবধান তারা জন্মের পরেই দেখতে পায়।
রাজধানী ঢাকায় পথশিশুর সংখ্যা বেশি এবং এসব পথশিশুর জীবন ও জীবিকা নির্বাহ অত্যনত্ম ঝুঁকিপূর্ণ। এদের অসহায়ত্তের সুযোগ নিয়ে নানা অপরাধমূলক কাজে ব্যবহার করছে সুযোগসন্ধানী মানুষ। শিশুরা একটু ভালো থাকার আশায় না বুঝেই সেসব কাজে জড়িয়ে যাচ্ছে এসব পথশিশুর অনেকেই। তাদের সামনে তো ভালো থাকার বিকল্পও নেই। এভাবে ছোট ছোট অপরাধ থেকে বড় অপরাধে জড়িয়ে পরাটাই স্বাভাবিক। এমনকি এসব পথশিশুকে বেছে নিচ্ছে মাদক কেনা-বেচায়।
আমাদের বুঝতে হবে প্রতিটি শিশুই তার মেধাশক্তি নিয়ে জন্ম নেয়। শিশুদের মধ্যেই সুপ্ত থাকে প্রতিভা। তারাই হবে দেশ ও জাতির কান্ডারি। এসব অনেক শিশুর মধ্যেই লুকিয়ে আছে বৈমানিক, বিজ্ঞানী, কবি, শিল্পী, সাহিত্যিক বা চিকিৎসক। পরিবেশ পরিসি’তিতে কারো মেধাশক্তি বিকশিত হয় আর কারো বিকশিত হয় না বা হওয়ার সুযোগ পায় না। এই মেধাশক্তি যদি নেতিবাচক কোনো কাজে ব্যবহার করে তাহলে সেটা সমাজের জন্য ভয়ংকর হয়ে ওঠে। এসব শিশুদের কাজে লাগাতে হলে তাদের সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করতে হবে। বড় হয়ে ওঠার সঙ্গে সঙ্গে এসব শিশু পেটের ড়্গুধা মেটাতে নানা রকম কাজ বেছে নেয়। এসব কাজের মধ্যে রয়েছে হকার, শ্রমিক, রিকশাচালক, ফুল বিক্রেতা, আবর্জনা সংগ্রাহক, হোটেল শ্রমিক, বুনন কর্মী, কুলি, বিড়ি শ্রমিক, ঝালাই কারখানার শ্রমিক ইত্যাদি বিভিন্ন রকম ঝুঁকিপূর্ণ কাজ; যা আমরা আমাদের চারদিকে তাকালেই এর বাসত্মবতা টের পাই।
বছর বছর পথশিশুদের নিয়ে বিভিন্ন অনুষ্ঠানে, টকশোতে সমবেদনা ঝরে, এদের নিয়ে নানা পরিকল্পানা পদড়্গেপের কথা শোনা যায়। কিন’ এর বাসত্মবায়নের হার খুবই অপ্রতুল। ফলস্বরূপ ছিন্নমূল শিশুরা তাদের অধিকার থেকে বঞ্চিতই থেকে যাচ্ছে। অথচ, আর দশটা স্বাভাবিকভাবে বেড়ে ওঠা শিশুর মতোই এদের রয়েছে পুষ্টিকর খাদ্য, বস্ত্র, বাসস’ান, শিড়্গা ও চিকিৎসার অধিকার। কিশোর কবি সুকানত্ম ভট্টাচার্য শিশুর জন্য একটি নিরাপদ বাসযোগ্য পৃথিবী গড়ে তোলার যে অঙ্গীকার করেছিলেন, তা আজও সম্ভব হয়নি। দেশের পথশিশুদের সুরড়্গা ও অধিকার প্রতিষ্ঠার লড়্গ্যে একটি দিবসও পালিত হয় আমাদের দেশে।
বাংলাদেশে পথশিশু সংখ্যা যাইহোক না কেন, তা দেশের প্রকৃত উন্নয়নের অনত্মরায়। একটা বিরাট অংশ যদি অযত্নে আর অবহেলায় বেড়ে ওঠে, তাহলে দেশের প্রকৃত অগ্রগতি ড়্গতিগ্রসত্ম হবে। পথশিশুদের শিড়্গার অধিকার নিশ্চিত করার সঙ্গে সঙ্গে তাদের পুষ্টিকর খাদ্য ও বাসস’ানের নিশ্চয়তা দিতে হবে। আটকাতে হবে তাদের বিপথে যাওয়া থেকে। সন্ত্রাসী কার্যক্রমে যেন কেউ না জড়ায় সেদিকে খেয়াল রাখতে হবে। পথশিশুর শিড়্গায় অনেক বেসরকারি সংস’াও কাজ করছে। তবে তা অপর্যাপ্ত। বিভিন্ন কারণে ঢাকা মহানগরী ছাড়াও অন্য বিভাগীয় শহরগুলোতে ভাসমান শিশুর সংখ্যা বাড়ছে। তবে রাজধানীতে এই সংখ্যা বেশি কারণ বেঁচে থাকার সুযোগ এখানেই বেশি। এসব পথশিশুদের সমাজের সম্পদ হিসেবে গড়ে তোলার জন্য রাষ্ট্রের পাশাপাশি নাগরিক হিসেবে আমদেরও দায়িত্ব রয়েছে। সবাইকে সেই দায়িত্ব পালনে এগিয়ে আসতে হবে।
পরিশেষে বলা যায়, বাংলাদেশ জাতিসংঘের শিশু অধিকার সনদের প্রতি সম্মান দেখিয়ে তা প্রতিপালনের জন্য ১৯৯০ সালে সেই সনদে স্বাড়্গর করে। এমনকি জাতিসংঘের নির্ধারিত বিভিন্ন সূচকে বাংলাদেশের অর্জন কম নয়। সেড়্গেত্রে শিশু অধিকার বাসত্মবায়নের সূচকে আমাদের এগিয়ে যেতে হবে। শিশুদের দারিদ্র্য বিমোচন, পুষ্টি, স্বাস’্য সেবা, নিরাপদ আশ্রয় নিশ্চিত করাসহ হতদরিদ্র ও ছিন্নমূল শিশুদের পুনর্বাসন, পর্যায়ক্রমে শিশু শ্রম নিরসন, শিশুদের রাজনৈতিক কর্মকা- বে্যবহার বন্ধ করা ও তাদের শারীরিক ও মানসিক বিকাশে শিড়্গা ও বিনোদনের উপযুক্ত সুযোগ নিশ্চিত করার লড়্গ্যে বাসত্মবভিত্তিক কর্মপরিকল্পনা ও কার্যক্রম গ্রহণ করা প্রয়োজন।
মানবাধিকার নিশ্চিতকরণ ও সামাজিক ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠায় প্রতিটি শিশুর অধিকারকে যথাযথ সম্মান প্রদর্শনপূর্বক শিশুর অধিকার সংরড়্গণের মাধ্যমে একটি কর্মড়্গম ভবিষ্যৎ প্রজন্ম গড়ে তোলার ড়্গেত্র প্রসত্মুতের দায়িত্ব রাষ্ট্র ও সমাজের রয়েছে। সেটা এড়িয়ে যাওয়ার কোনো সুযোগ নেই। আর মনে রাখতে হবে, যোগ্য শিশু বিনির্মাণে রাষ্ট্র ও সমাজের পৃষ্ঠপোষকতা অনস্বীকার্য।