পথপ্রান্তে অবহেলিত মুক্তিযুদ্ধের শহীদদের কবর সম্পর্কে দুটো প্রস্তাব

শিমুল বড়ুয়া

মাস বিজয়ের মাস, স্মৃতিকাতরতার মাস, বিগত বছরের ভুল-ভ্রান্তি-প্রাপ্তি মূল্যায়নের মাস, সর্বোপরি তারই প্রেক্ষিতে সুন্দর আগামী বিনির্মাণের জন্য কর্মসূচি প্রণয়নের মাস। ডিসেম্বর মাসে আমরা বাংলাদেশের প্রতিটা নাগরিক যেমন বিজয়ের আনন্দে, শত্রুমুক্ত স্বাধীন বাংলাদেশ প্রাপ্তির আনন্দে উল্লসিত হই; তেমনি পাকসেনাবাহিনীর নির্মম অত্যাচার-নির্যাতনে ভয়াবহ গণহত্যায় স্বজন হারানোর বেদনায় অশ্রুসিক্ত হই, স্মৃতিকাতর হই। এই সশস্ত্র সংগ্রাম তথা মুক্তিযুদ্ধ চলে দীর্ঘ নয় মাসব্যাপী, এতে ত্রিশ লক্ষ লোক শহীদ হয়েছেন, ইজ্জত-সম্ভ্রম হারিয়েছেন দুই লক্ষ মা-বোন। আমরা এক সাগর রক্তের বিনিময়ে লাভ করি সবুজের মাঝে লাল বৃত্ত খচিত একটি অনন্য সুন্দর পতাকা।
দক্ষিণ এশিয়ার মধ্যে আমরাই গর্ব করে বলতে পারি উত্তরাধিকার সূত্রে নয় কঠিন সশস্ত্র সংগ্রামের মধ্য দিয়ে আমরা একটি স্বাধীন রাষ্ট্র পেয়েছি।
স্বাধীনতা লাভের ছেচল্লিশ বছর পরও আমরা বলতে পারি না-আমরা অর্থনৈতিক মুক্তি অর্জন করেছি, বাংলাদেশ অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বী রাষ্ট্রে পরিণত হয়েছে, পরিপূর্ণ অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশ গড়ে তুলতে সক্ষম হয়েছি; বলতে পারি না জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের স্বপ্নের সোনার বাংলা প্রতিষ্ঠা লাভ করেছে। তবে আমরা নির্দ্বিধায় বলতে পারি পাকিস্তানের চেয়ে বাংলাদেশ অর্থনৈতিক-সামাজিক সূচকে অনেক এগিয়ে আছে। মাথাপিছু আয় বেড়ে গেছে, নারী শিক্ষার প্রসার ঘটেছে, শিশুমৃত্যুর হার কমেছে, গড়আয়ু বেড়ে গেছে, অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি বৃদ্ধি পেয়েছে।
এরকম সামাজিক সূচকে বাংলাদেশ শুধু পাকিস্তান নয়, পার্শ্ববর্তী ভারতসহ অন্যান্য দেশ থেকে এগিয়ে আছে। ধারণা করা হচ্ছে ২০২১ সালের মধ্যে বাংলাদেশ মধ্যম আয়ের দেশে পরিণত হবে। খেলাধুলা, নারীর ক্ষমতায়নসহ নানান দিক দিয়ে আন্তর্জাতিকভাবেও বাংলাদেশের সুনাম বৃদ্ধি পাচ্ছে। সম্প্রতি ৩০ অক্টোবর ইউনেস্কো বঙ্গবন্ধুর ৭ই মার্চের ভাষণকে ‘বিশ্ব ঐতিহ্যের প্রামাণ্য দলিল’ হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে। ১৯ মিনিটের ১১০৫ শব্দের বঙ্গবন্ধুর এই ভাষণটির কোন লিখিত নোট ছিল না। কঠিন সংকটে আবেগময় অথচ যুক্তিযুক্ত তাৎপর্যময় বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের ভাষণটি দেশের প্রত্যেকটি সচেতন নাগরিককে আন্দোলিত করেছিল, জনগণ এ ভাষণে খুজে পেয়েছিল দিক-নির্দেশনা।
এই ভাষণে একই সাথে বিবৃত হয়েছে বাংলার অতীত-বর্তমান-ভবিষ্যৎ। মহাকাব্যিক এই ভাষণটি পরিণত হয়েছিল বাংলার মুক্তির সনদে। ইউনেস্কোর এই স্বীকৃতি মহান মুক্তিযুদ্ধে আত্মোৎসর্গকৃত ত্রিশ লাখ শহীদ, সম্ভ্রম হারানো দুই লাখ মা-বোনসহ আমাদের একটা বিরল সম্মানে অভিষিক্ত করেছে। এই স্বীকৃতি বিশ্ববাসীকে বাংলাদেশের মহান মুক্তিযুদ্ধ, ইতিহাস-ঐতিহ্য-সংস্কৃতি সম্পর্কে ব্যাপকভাবে জানতে উৎসাহিত করবে। এই স্বীকৃতির কারণে এই ভাষণটি দুনিয়ার নির্যাতিত-নিপীড়িত-শোষিত-অধিকারবঞ্চিত মানুষকে মুক্তির পথ দেখাবে, শোষণ-নির্যাতন-অবিচারকে ঐক্যবদ্ধভাবে রুখে দাড়াতে সাহস যোগাবে।
তাই গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার মানবমুক্তির দলিল স্বরূপ বঙ্গবন্ধুর ভাষণটি বিভিন্ন ভাষায় অনুবাদ করে বিভিন্ন দেশে ছড়িয়ে দেওয়ার দায়িত্ব নিতে পারেন যাতে বিশ্বের নিপীড়িত-পরাধীন-দেশ-জাতিগুলো এই ভাষণ থেকে খুজে পেতে পারেন স্বাধীনতা লাভের অনুপ্রেরণা-শক্তি ও সাহস।
সবিশেষ উল্লেখ্য, নয় মাসের মুক্তিযুদ্ধে প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত পাকসেনাবাহিনীর সাথে সম্মুখ সমরে গেরিলা যুদ্ধে বাংলার লাখ সন্তান শহীদ হয়েছে। এই সব শহীদদের অনেককে কবরস্থ করা হয়েছে পথপ্রান্তে। বড়ই পরিতাপের বিষয় এখনো পথপ্রান্তের শহীদদের কবরগুলো অবহেলিত, পাচ্ছে না যথাযথ যত্ন-সম্মান, নেই সংরক্ষণের কোন উদ্যোগ প্রচেষ্টা। নিঃসন্দেহে এতে আমাদের দীনতার-হীনমন্যতার পরিচয় প্রকাশ পায়। সরকার, মুক্তিযোদ্ধা সংসদসহ মুক্তিযুদ্ধের চেতনা লালন-ধারণকারী ব্যক্তি-সংগঠনের উদ্যোগে দেশব্যাপী পথপ্রান্তে অনাদরে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা শহীদদের কবরগুলোতে স্মৃতিস্তম্ভ নির্মণ করা যায়। এতে করে শুধু যে আমাদের অকৃতজ্ঞ জাতির কলঙ্ক মুছবে তা নয়, স্মৃতিস্তম্ভগুলো সর্বদা প্রকাশ করবে আমাদের বীরত্বের কথা, সাহসের কথা।
লেখক: প্রাবন্ধিক-গবেষক। অধ্যক্ষ, লতিফা সিদ্দিকী ডিগ্রি কলেজ, সীতাকুণ্ড, চট্টগ্রাম।