পতেঙ্গা কনটেইনার টার্মিনাল ৩৫ মিটার পাইপে ৮২০ মিটার জেটি

ভূঁইয়া নজরম্নল

চট্টগ্রাম বন্দরের সম্ভাবনার প্রকল্পে চলছে জেটি নির্মাণের কাজ। ৫০ মিটার উঁচু চীনের ড্রপ হ্যামার মেশিন দিয়ে মাটির ৩০ ফুট গভীরে বসানো হচ্ছে ৪০ ইঞ্চি ব্যাসের পাইপ। ৩৫ মিটার দীর্ঘ এসব পাইপ বসবে নদী তীরো ৮২০ মিটার দীর্ঘ জেটি অংশে। জেটি ছাড়াও শুরম্ন হয়েছে ফ্লাইওভার ও ছয় লেনের রাসত্মা তৈরির কাজ।
পতেঙ্গায় চিটাগাং ড্রাইডক থেকে বোট ক্লাব পর্যনত্ম দীর্ঘ এলাকায় চলছে ‘পতেঙ্গা কনটেইনার টার্মিনাল’ নির্মাণের কাজ। পুরো এলাকাজুড়ে চলছে কাজ। একদিকেব পাথরের স’প, অপরদিকে মাটিতে পাইলিং কিংবা নদীর অংশে জেটি নির্মাণের জন্য পাইপ বসানোর কাজ। সব মিলিয়ে বিশাল এক কর্মযজ্ঞ। সামুদ্রিক মৎস্য অধিদপ্তর ও কাস্টমস এর ভবনটি ভাঙ্গার কাজ প্রায় শেষ পর্যায়ে। এছাড়া দীর্ঘদিন ধরে টার্মিনাল ইয়ার্ড এর জায়গায় চলা পাইলিংয়ের কাজও চলছে। এসব পাইলিংয়ের পাশাপাশি ফ্লাইওভার ও জেটি নির্মাণের জন্যও চলছে পাইলিং।
চীন থেকে আনা ৫০ ফুট উঁচু ড্রপ হ্যামার দিয়ে নদীর ভেতরের অংশে জেটি নির্মাণের জন্য পাইলিং প্রসঙ্গে প্রকল্পের পরিচালক মিজানুর রহমান বলেন, ‘নদীর ভেতরের অংশে ৮২০ মিটার দীর্ঘ চারটি জেটি নির্মিত হবে। এরমধ্যে তিনটি কনটেইনার টার্মিনালের জন্য ও একটি ডলফিন জেটি হিসেবে ব্যবহৃত হবে।’
জেটি নির্মাণে ব্যবহৃত পাইপ সম্পর্কে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ২৮ থেকে ৩০ মিটার নিচে যাবে এসব পাইপ। ৩৫ মিটার দীর্ঘ প্রতিটি পাইপের ব্যাস ৪০ ইঞ্চি।
সরেজমিনে দেখা যায়, প্রকল্পের অংশে থাকা রেড ক্রিসেন্ট বেস অফিস, কাস্টমস অফিস, সামুদ্রিক মৎস্য অধিদপ্তরসহ অন্যান্য স’াপনা সরিয়ে ফেলা হলেও এখনো ওমেরা অয়েলের স’াপনাটি রয়ে গেছে। কিন’ এর পাশে চিটাগাং ড্রাইডক লিমিটেডের কাছে নদীর ভেতরের অংশে জেটি নির্মাণের কাজ দ্রম্নত চলছে। এবিষয়ে জানতে চাইলে প্রকল্পের পরিচালক মিজানুর রহমান বলেন, ‘শিগগিরই এই স’াপনাটিও সরিয়ে নেওয়া হবে। এছাড়া বর্তমানে আমাদের গ্রাউন্ড ইমপ্রম্নভমেন্ট (মাটি মজবুতকরণ) কাজ প্রায় ৮০ শতাংশ শেষ হয়েছে। একইসাথে প্রকল্পের মূল অংশে ছয় লেনের রোড (চার লেনে সাধারণ পরিবহন ও দুই লেন শুধুমাত্র টার্মিনালের কাজের জন্য ব্যবহার করা হবে) নির্মাণের পাশাপাশি ফ্লাইওভার নির্মাণের জন্য পাইলিং চলছে।’
আগামী ডিসেম্বরের শেষ করার লড়্গ্যমাত্রা নিয়ে শুরম্ন হওয়া প্রকল্পের কাজের ভিত্তিপ্রসত্মর হয় গত বছরের সেপ্টেম্বরের প্রথম সপ্তাহে। তবে, কাজ শুরম্ন হয়েছে পাঁচ মাস পর গত বছরের ফেব্রম্নয়ারি থেকে। ডিপিএম (সরাসরি সংগ্রহ পদ্ধতি) পদ্ধতিতে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর ইঞ্জিনিয়ারিং কোর প্রায় ১৮০০ কোটি টাকায় বাসত্মবায়ন করছে প্রকল্পটি। এখনো মাটি মজবুতকরণ এবং জেটি নির্মাণের কাজ শেষ হয়নি। প্রকল্পের অগ্রগতি কতুটুকু হয়েছে জানতে চাইলে চট্টগ্রামি বন্দর কর্তৃপড়্গের মুখপাত্র ও সচিব ওমর ফারম্নক বলেন, ‘প্রকল্পের ১৬ শতাংশ কাজ শেষ হয়েছে। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে কাজ শেষ করার লড়্গ্যে চলছে কাজ।’
১১ মাস সময় বাকি থাকা প্রকল্পের কাজের অগ্রগতি পিছিয়ে কি না জানতে চাইলে প্রকল্পের পরিচালক প্রকৌশলী মিজানুর রহমান বলেন, বতর্মানে কেবল অবকাঠামো নির্মাণের কাজ চলছে। এজন্য কাজের শতাংশ কম মনে হচ্ছে। এই অবকাঠামো নির্মাণ শেষে সকল ইকুপইপমেন্ট একসাথে যুক্ত হবে।
প্রকল্পের সাথে নিয়োজিত কর্মকর্তাদের সাথে কথা বলে জানা যায়, নতুন এই টার্মিনালে চারটি জেটি হচ্ছে। এরমধ্যে তিনটি জেটি (প্রতিটি ২০০ মিটার দীর্ঘ) হবে কনটেইনার হ্যান্ডেলিংয়ের জন্য এবং বাকি একটি হবে ডলফিন জেটি (২২০ মিটার দীর্ঘ)। ২৬ একর জায়গায় গড়ে তোলা হচ্ছে টার্মিনালটি। টার্মিনালটি বাসত্মবায়নের জন্য বিএএফ শাহীন কলেজ থেকে বিমানবন্দরের দিকে যাওয়ার সময় রোডটি বাম দিকে বাঁকা না হয়ে সোজা জহুরম্নল হক ঘাঁটির সামনে গিয়ে উঠবে। আর রোডটি যাওয়ার সময় বিমান বাহিনীর গলফ ক্লাবের পাশ দিয়ে গিয়ে উঠবে। বন্দরের মূল জেটির সাথে পতেঙ্গা কনটেইনার টার্মিনালের কনটেইনার পরিবহনের জন্য পৃথক রেললাইন, লোকোমেটিভ ও বগি থাকবে। ট্রেনগুলো কিছুড়্গণ পর পর কনটেইনার নিয়ে বন্দরের মূল জেটিতে যাতায়াত করবে। পতেঙ্গা কনটেইনার টার্মিনাল নির্মাণের জায়গায় নদীর গভীরতা বেশি থাকায় সাড়ে ৯ মিটার ড্রাফটের জাহাজ ভিড়তে পারবে বলে এই টার্মিনাল নিয়ে বন্দর ব্যবহারকারীরা ব্যাপক আশাবাদী।
এবিষয়ে চিটাগাং চেম্বারের প্রেসিডেন্ট মাহবুবুল আলম বলেন, ‘এনসিটি টার্মিনালের পর চট্টগ্রাম বন্দর বিগত ১১ বছরে কোনো জেটি নির্মাণ করেনি। এখন পতেঙ্গা কনটেইনার টার্মিনালের আওতায় নির্মিত হতে যাওয়া জেটি নির্ধারিত সময়ে শেষ করতে হবে। অন্যথায় বাধাগ্রসত্ম হতে পারে স্বাভাবিক পণ্য পরিবহন কার্যক্রম।’
নির্ধারিত সময়েই অনত্মত একটি জেটি চালু করা হবে জানিয়ে প্রকল্পের পরিচালক মিজানুর রহমান বলেন, ‘আমরা চলতি বছরের মধ্যে একটি জেটি চালু করে দেব। বাকি জেটিগুলো চালু করতে কিছুটা সময় লাগতে পারে।’
উলেস্নখ্য, চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপড়্গ গত বছর ২৯ লাখ ৯৭ হাজার ৫২৯ কনটেইনার হ্যান্ডেলিং করে। এর আগে ২০১৭ সালে ২৫ লাখ ৬৬ হাজার ৫৯৭, ২০১৬ সালে সাড়ে ২৩ লাখ, ২০১৫ সালে ২০ লাখ একক কনটেইনার হ্যান্ডেলিং করে। এবার এ সংখ্যা ৩৩ লাখ ছাড়িয়ে যেতে পারে। বন্দরের প্রবৃদ্ধি অব্যাহত রাখতে নতুন টার্মিনালের বিকল্প নেই। পতেঙ্গা কনটেইনার টার্মিনালের পাশাপাশি রয়েছে বে টার্মিনাল, লালদিয়া মাল্টিপারপাস টার্মিনাল ও কর্ণফুলী কনটেইনার টার্মিনাল নির্মাণ।