২০০৯ সালে পুলিশের কালো তালিকাভুক্ত সংগঠন ‘ইসলামী সমাজ’

নয়াবাজারের গোপন বৈঠক থেকে ২৪ নেতাকর্মী আটক

খেলাফত প্রতিষ্ঠার জন্য দলে ভেড়ায় অল্প শিক্ষিতদের

নিজস্ব প্রতিবেদক
আটককৃত ‘ইসলামী সমাজ’ সংগঠনের নেতাকর্মীরা-সুপ্রভাত

‘ইসলামী সমাজ’ নামে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কালো তালিকাভুক্ত একটি সংগঠনের ২৪ নেতা-কর্মীকে নগরী থেকে আটক করেছে গোয়েন্দা পুলিশ। শুক্রবার রাতে ডিবি পুলিশ ও স্পেশাল টাস্ক গ্রুপের (এসটিজি) সদস্যরা পাহাড়তলী থানার নয়াবাজারের মৌসুমী ময়ূর ম্যানশনের একটি ফ্ল্যাটে অভিযান চালিয়ে গোপন বৈঠকরত অবস’ায় তাদের আটক করা হয়। আটককৃতদের বিরুদ্ধে পাহাড়তলী থানায় বিশেষ ক্ষমতা আইনে মামলা দায়ের করা হয়েছে বলে সুপ্রভাতকে জানিয়েছেন নগর গোয়েন্দা পুলিশের উপকমিশনার পরিতোষ ঘোষ। গতকাল বিকালে মহানগর হাকিম আদালতে হাজির করা হলে আদালত তাদের কারাগারে পাঠানোর নির্দেশ দেয়।
আটককৃতরা হলেন রুহুল আমিন (৪৫), মো. ইউছুফ (৪৬), আমির হোসেন (৫০), জামাল উদ্দিন (৪২), আবু হানিফ হারিছ (৫৩), মো. রফিকুল ইসলাম রুবেল (২৭), আলমগীর হোসেন (৩৫), দিদার হোসেন (৩৫), মো. আনোয়ার (৪৪), মো. শাহ আলম (৪০), রবিউল হোসেন (৩৭), তৌহিদুল ইসলাম (২২), আনোয়ার হোসেন (৪২), আবদুল ওহাব (৫৪), আবদুর রব (৪০), মো. সাদেক (৪২), আবু বক্কর কামাল (৫০), আবদুল হাকিম (৪৫), আবদুল কাদের (২৭), মো. আকবর হোসেন (৪২), ধর্মান্তরিত মুসলমান সাইফুল ইসলাম (সাবেক নাম কৃষ্ণানন্দ দে), মো. রবিউল (২৮), মো. খলিল (২৬) ও মোবারক আলী (৪৫) ।
আটকের পর গতকাল শনিবার দুপুর সাড়ে ১২টায় সিএমপির সদর দপ্তরে এক সংবাদ সম্মেলনের আয়োজন করে গোয়েন্দা পুলিশ। এতে নগর গোয়েন্দা পুলিশের উপকমিশনার পরিতোষ ঘোষ জানান, গোপন সংবাদের ভিত্তিতে ময়ূর ম্যানশনের ভাড়াটে পিকআপ চালক জামাল উদ্দিনের বাসায় বৈঠকরত অবস’ায় তাদের আটক করা হয়। আটক ব্যক্তিরা প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে ডিবি পুলিশ কর্মকর্তাদের জানিয়েছে, তারা প্রচলিত গণতান্ত্রিক ব্যবস’ায় বিশ্বাসী নয়। খেলাফত প্রতিষ্ঠার জন্য দলে লোক ভেড়ানোর উদ্দেশ্যে তারা গোপন বৈঠক করছিল।
সংবাদ সম্মেলনে এ সংগঠনটির কিছু লিফলেট ও বুকলেট উপস’াপন করা হয়। এ সংগঠনে যুক্ত শীর্ষ নেতারা এর আগে জামায়াতে ইসলামী এবং ইসলামী ছাত্রশিবিরের রাজনীতির সঙ্গে জড়িত ছিল বলে ডিবি পুলিশ কর্মকর্তারা দাবি করেছেন। ইসলামী সমাজের কেন্দ্রীয় কার্যালয় কুমিল্লা জেলার রায়পুর কুশিয়ারা এলাকায় বলে জানান ডিবি পুলিশের উপকমিশনার পরিতোষ ঘোষ। ‘২০০৯ সালে এ সংগঠনকে কালো তালিকাভুক্ত করেছিল সরকার। অল্প শিক্ষিত লোকজন তাদের টার্গেট। ইসলামের নাম দিয়ে তারা কম শিক্ষিত লোকদের র্যা ডিকালাইজ করছে। সংগঠনের সদস্যরা বেশিরভাগ পঞ্চম বা অষ্টম শ্রেণি পর্যন্ত লেখাপড়া করেছে।’ বলেন পরিতোষ।
নগর ডিবির এ কর্মকর্তা জানান, ১৯৯৭ সালে প্রতিষ্ঠিত হয় ইসলামী সমাজ। কম শিক্ষিত লোকজন সংগ্রহ করে তাদের উগ্রবাদী কর্মকাণ্ডে উদ্বুদ্ধ করতে কাজ করছে সংগঠনটি। এটির প্রতিষ্ঠাতা আবদুল জব্বার জামায়াতে ইসলামীর সাথে জড়িত ছিলেন। পরবর্তীতে ছাত্রশিবির করতেন এমন একজন হুমায়ূন কবির এর হাল ধরেন। এখন তিনিই এ সংগঠনের আমীর।’
ডিবি পুলিশ কর্মকর্তারা জানান, আটককৃতদের মধ্যে মো. ইউসুফ আলী সংগঠনটির টঙ্গী এলাকার ও রুহুল আমিন চট্টগ্রাম এলাকার দায়িত্বশীল নেতা। তারা সংগঠনের প্রচার ও জনবল বাড়ানোর কাজে নিয়োজিত ছিলেন। মূলত অল্প শিক্ষিত নিম্নআয়ের মানুষদের টার্গেট করে ধর্মের ভয় দেখিয়ে ও নিজেদের মতো করে ধর্মের ব্যাখ্যা দিয়ে তাদের দলভুক্ত করার চেষ্টা করতেন তারা।
ইউছুফ আলী ২০০৮ সালে জামালপুরে হওয়া একটি মামলার আসামিও ছিল। তখন সে নিষিদ্ধ জঙ্গি সংগঠন জেএমবির সাথে যুক্ত ছিল। ইসলামী সমাজের সর্বোচ্চ শীর্ষ পদ ‘আমির’। আঞ্চলিক প্রধান ‘মামুর’ এবং দাওয়াতি কার্যক্রম পরিচালনাকারীরা ‘দ্বারা’ পদধারী। সংগঠনটির বর্তমান আমির কুমিল্লা জেলার বাসিন্দা সৈয়দ হুমায়ূন কবির। এ হুমায়ন কবীর নব্বই এর দশকে ইসলামী ছাত্রশিবিরের সাথে জড়িত ছিল।
আটকের পর জিজ্ঞাসাবাদে ইউসুফ গোয়েন্দা পুলিশ কর্মকর্তাদের জানিয়েছে, সে আগে টঙ্গী এলাকায় দর্জিগিরি করতো। কিন’ এ পথে আসার পর দলের সদস্যরাই চাঁদা তুলে তার সংসার চালিয়ে থাকে। আটককৃতদের কাছ থেকে পাওয়া ইসলামী সমাজের প্রচারপত্রে উল্লেখ আছে, ‘সমাজ ও রাষ্ট্র পরিচালনায় মানুষের সার্বভৌমত্ব, আইন-বিধান ও কর্তৃত্ব এবং মানবরচিত ব্যবস’া গণতন্ত্র পরিত্যাগ করে সমাজ ও রাষ্ট্রে ইসলাম প্রতিষ্ঠার চূড়ান্ত চেষ্টা করা অত্যাবশ্যক।’
ডিবি পুলিশ কর্মকর্তা হুমায়ুন কবির জানান, আটক হওয়া ইউছুফ দাবি করেছে, সে ইসলামী সমাজের টঙ্গী শাখার দায়িত্বে রয়েছে আর রুহুল আমিন চট্টগ্রামের নয়াবাজারের বউবাজার ওয়ার্ড জামায়াতের সভাপতি। খেলাফত প্রতিষ্ঠার কথা আরও কিছু চরমপনি’ ও নিষিদ্ধ সংগঠনও বলে থাকে। সেক্ষেত্রে এসব দলের সঙ্গে ইসলামী সমাজের কোনও যোগসূত্র আছে কিনা সাংবাদিকদের এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘বিষয়টি নিয়ে তদন্ত করা হবে। এ মুহূর্তে কিছু বলা যাচ্ছে না।’
জানা গেছে, সেনা সমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে যখন রাজনৈতিক কার্যক্রম নিষিদ্ধ ছিল সেসময় ২০০৮ সালের ৭ আগস্ট বান্দরবান এবং জামালপুরে প্রকাশ্যে প্রচারপত্র বিলি করতে গিয়ে ধরা পড়েছিল ইসলামী সমাজের ১৫ জন নেতাকর্মী। এর মধ্যে বান্দরবান জেলা জজ আদালতের সামনে থেকে ৮ জন এবং জামালপুর থেকে ৭ জন। জামালপুরে গ্রেফতার হওয়া ৭ জনের মধ্যে ইউছুফ আলীও ছিল বলে জানিয়েছেন ডিবির উপপুলিশ কমিশনার পরিতোষ ঘোষ।
জানা গেছে, ২০০৫ সালে ৩টি সংগঠন দেশে নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হয়। সেগুলো হলো হরকাত-উল-জিহাদ ইসলামী বাংলাদেশ (হুজি), জামাত-উল-মুজাহিদিন বাংলাদেশ (জেএমবি) এবং জাগ্রত মুসলিম জনতা বাংলাদেশ (জেএমজেবি)। ২০০৯ সালে নিষিদ্ধ হয় হিযবুত তাহরীর। ২০০৯ সালে কালো তালিকাভুক্ত ঘোষণা করা হয় ৮টি সংগঠন। সেগুলো হচ্ছে, হিজবুত তাওহীদ, ইসলামী সমাজ, উলেমা আনজুমান আল বাইয়্যেনিয়াত, ইসলামিক ডেমোক্রেটিক পার্টি, তাওহীদ ট্রাস্ট, তমীর-উদ-দ্বীন, আনসার উল্লাহ বাংলা টিম এবং আল্লাহর দল। এরমধ্যে আনসারউল্লাহ বাংলা টিমকে ২০১৫ সালে নিষিদ্ধ করা হয়।

আপনার মন্তব্য লিখুন