নেলসন ম্যান্ডেলা আন্তর্জাতিক দিবস

কায়সার আলী

“আকাশ আমায় শিক্ষা দিল উদার হতে ভাইরে, কর্মী হবার মন্ত্র আমি বায়ুর কাছে পাইরে, পাহাড় শেখায় তাহার সমান হই যেন ভাই মৌন- মহান” আকাশের মত ঔদার্য,ক্লান্তিহীন বায়ুর মত কর্মীদের প্রেরণা এবং পাহাড়ের মত উচ্চতা নিয়ে যিনি মাথা উঁচু করে বেঁচেছিলেন তিনি হলেন নেলসন ম্যান্ডেলা। দক্ষিণ আফ্রিকার মানুষ তাঁকে আদর করে মাদিবা নামে ডাকে। মহত্ব এবং উদারতা অর্জনকারী এবং সাদা কালোর মৈত্রীর সেতুবন্ধনকারী, শান্তি আর সমপ্রীতির দাঁড়িয়ে থাকার স্তম্ভ বিশ্ববরেণ্য নেলসন ম্যান্ডেলা।
আজ ১৮ জুলাই নেলসন ম্যান্ডেলার জন্মদিন। ২০০৯ সালের ২৭শে এপ্রিল কনসার্ট ৪৬৬৬৪ এবং নেলসন ম্যান্ডেলা ফাউন্ডেশন নেলসন ম্যান্ডেলা আন্তর্জাতিক দিবস প্রতিষ্ঠা ও পালনে বিশ্ব জনগোষ্ঠির সহায়তা ও সমর্থন কামনা করেন। তদপরিপ্রেক্ষিতে গত ২০০৯ সালে নভেম্বরে সাধারণ পরিষদ অধিবেশনে জাতিসংঘের মহাসচিব বান কি মুন আফ্রিকার স্থপতি এই মহান নেতা নেলসন ম্যান্ডেলার জন্মদিনকে আন্তর্জাতিক দিবস হিসেবে পালনের প্রস্তাব দেন।
জাতিসংঘের ১৯২ সদস্য মহাসচিবের প্রস্তাবকে সমর্থন জানিয়ে প্রস্তাবটি গ্রহণ করে। ১৯১৮ সালে ১৮ জুলাই দক্ষিণ আফ্রিকার উমটাটায় কৃষ্ণাঙ্গ রিজার্ভ ট্রান্সকিই শহরের রাজধানীতে মুভিজোর নামক গ্রামে পিতা হেনরি গাডলাও মাতা- নোসিকেনী দম্পতির ঘরে তিনি জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পিতা ছিলেন গ্রাম্য মোড়ল। ম্যান্ডেলার বাবার মৃৃত্যুর পর দালিন্দ্যেবো তাঁকে পোষ্যপুত্র হিসেবে গ্রহণ করেন। সেখানেই তিনি আস্তে আস্তে বেড়ে উঠেন। আর নেতৃত্বের গুণটা পারিবারিকভাবে তাঁর মধ্যে প্রবেশ করে। ম্যান্ডেলা ছিলেন তাঁর পরিবারের প্রথম সদস্য যিনি স্কুলে পড়াশোনা করেছেন। স্কুলে পড়ার সময় তাঁর শিক্ষিকা এমদিনগান ম্যান্ডেলার ইংরেজি নাম রাখেন নেলসন।
থেম্বু রীতি অনুযায়ী ১৬ বছর বয়সে তাঁকে আনুষ্ঠানিকভাবে তাঁর গোত্রে বরণ করে নেয়া হয়। এরপর তিনি ক্লার্কবারি বোর্ডিং ইন্সটিটিউট থেকে তিন বছরের জায়গায় মাত্র দুই বছরেই জুনিয়র সার্টিফিকেট পরীক্ষায় পাশ করেন।
স্কুল পাশ করার পর ম্যান্ডেলা ফোর্ট হেয়ার বিশ্ববিদ্যালয়ে বি.এ কোর্সে ভর্তি হন। জীবনের পরবর্তী সময়ে কারাগারে বন্দী অবস্থায় তিনি ইউনিভার্সিটি অব সাউথ আফ্রিকা দূরশিক্ষণ কার্যক্রমের অধীনে স্নাতক ডিগ্রী লাভ করেন। এরপর তিনি ইউনিভার্সিটি অব উইটওয়াটার্সরান্ডে আইন বিষয়ে স্নাতকোত্তর পড়াশোনা শুরু করেন।
ছাত্র অবস্থায় সাদা কালোর ভেদাভেদ তাঁকে মানসিক ভাবে উৎপীড়িত করত। একই দেশে দুই সমাজ ব্যবস্থা। এসব দেখে এক ধরনের আক্রোশ জন্ম নিয়েছিল মনের ভিতরে। বস্তিবাসী শ্রমজীবী মানুষের ভাগ্য, দারিদ্র, ক্ষুধা ও পুলিশের অবিরাম হয়রানি নিত্যদিনের সঙ্গী হয়ে দাঁড়িয়েছিল। তবে তিনি বিপদে ছিলেন ধীরস্থির এবং ন্যায়ের সংগ্রামের অটল। তিনি বলতেন,‘সংগ্রামই আমার জীবন। আমি স্বাধীনতার জন্য আমার জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত সংগ্রাম চালিয়ে যাব’। তাঁর জীবন ছিল জনগণের জন্য উৎসর্র্গীকৃত। ১৯৫৮ সালের ১৪ জুন উইনি ম্যান্ডেলাকে বিয়ে করেন মোথাডিস্ট চার্চে। ঐ বছরেই ১ আগষ্ট তাঁর বিরুদ্ধে রাষ্ট্রদ্রোহিতার মামলা হয় প্রিটোরিয়ার আদালতে। ১৯৬২ সালের ৫ আগষ্ট রবিনসন দ্বীপ কারাগারে প্রেরণ করা হয়। বন্দিজীবনের অধিকাংশ সময়েই তিনি ছিলেন রোবন দ্বীপে।
১৯৬৪ সালের ১২ জুন বর্ণবৈষম্য বিরোধী সংগ্রামে সক্রিয় আন্দোলন, অর্ন্তঘাতসহ নানা অপরাধের দায়ে জাতিসংঘের ১০৬ ভোটের রায় বিবেচনায় এনে ফাঁসির পরিবর্তে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেয়া হয় তাঁকে। পরবর্তীতে দ্বীপ থেকে দ্বীপান্তরে , কারাগার থেকে কারাগারে নির্যাতন ও কারাদণ্ড ভোগ করেন।
তরুণ ম্যান্ডেলা দীর্ঘ ২৭ বছর কারাগারের অন্ধকার প্রকোষ্ঠে বন্দী এবং কঠোর-নির্মম, নিঃসঙ্গ কয়েদি জীবন যাপন করলেও বর্ণবাদের সঙ্গে কখনো আপোস করেননি। শুধু ম্যান্ডেলাকেই নয়, তাঁর স্ত্রী উইনি ম্যান্ডেলাকে বেশ কয়েকবার কারাগারে এবং কন্যাদ্বয়কে শ্বেতাঙ্গ সরকার স্কুলে ভর্তির ক্ষেত্রে নানা রকম বিধি-নিষেধ আরোপ করে। গভীর রাতের শেষে যেভাবে ভোর হয় ঠিক সেভাবে দক্ষিণ আফ্রিকার শ্বেতাঙ্গ প্রেসিডেন্ট এফ ডবলিউ ডি ক্লার্ক ১৯৮৯ সালে বর্ণ-বৈষম্য নীতির অবসান ঘটান।
১৯৯০ সালে আফ্রিকান ন্যাশনাল কংগ্রেস এর ওপর থেকে নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার করা হয় এবং দীর্ঘ ২৭ বছর পর অবশেষে ১৯৯০ সালের ১১ ফেব্রুয়ারী তিনি মুক্তি পান। মুক্তির পরদিন ১২ ফেব্রুয়ারি তিনি এক ঐতিহাসিক ভাষণে বলেন, ‘আমাদের সংগ্রাম চূড়ান্ত পর্যায়ে- আমি স্বপ্ন দেখি এমন এক সমাজের যেখানে সমঅধিকার নিয়ে সবাই সমপ্রীতিতে বসবাস করবে। বর্ণবাদের কোনো ভবিষ্যৎ নেই। এই বর্ণবাদের অবসান ঘটাতে হবে। এ্‌ই দেশ সাদাকালোর দেশ। আমাদের আন্দোলন ছিল সাদাদের বিরুদ্ধে নয়, তাঁদের আধিপত্যবাদের বিরুদ্ধে ”।
পরবর্তীতে তিনি তাঁর দলের হয়ে দক্ষিণ আফ্রিকার সরকারের সাথে শান্তি আলোচনায় অংশ নেন। এর ফলে দক্ষিণ আফ্রিকায় বর্ণবাদের অবসান ঘটে এবং এরই ধারাবাহিকতায় সব বর্ণের মানুষের অংশগ্রহণে ১৯৯৪ সালে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত হয়। ম্যান্ডেলা ১৯৯৪ সালে দক্ষিণ আফ্রিকার প্রথম কৃষ্ণাঙ্গ প্রেসিডেন্ট পদে নির্বাচিত হন এবং উপরাষ্ট্রপতি করেন শ্বেতাঙ্গ নেতা পূর্ববর্তী রাষ্ট্রপতি ডি- ক্লার্ককে। ১৯৯৯ সালে রাষ্ট্রপতি পদ থেকে তিনি স্বেচ্ছায় অবসর নেন।
সবচেয়ে মজার বিষয় হলো, যাঁরা তাকে রাজদণ্ড দিয়েছিল আবার তারাই তাঁকে বাধ্য হয়ে সম্মানিত করেছেন। চমৎকার বিষয়টি হলো, ইংল্যান্ডের লৌহমানবী খ্যাত প্রধানমন্ত্রী মার্গারেট থ্যাচার ম্যান্ডেলার মুক্তির নয় বছর আগে দম্ভোক্তি করে বলেছিলেন “কেউ যদি ভেবে থাকে এ. এন.সি কখনো দক্ষিণ আফ্রিকায় সরকার গঠন করতে পারবে তবে সে এক অন্ধকার অলিক রাজ্যে রাজ্যে বাস করছে”।
কিন্তু নয় বছর পর থেচারকেই দেখতে হলো সেই অন্ধকারের অলীক রাজ স্বয়ং ওয়েস্টমিনিস্টার হলে। সেখানে গ্রেনেডিয়র গার্ডদের বাদক দল -“নকোসি সিকেলেল আফ্রিকা”বাজাতে শুরু করে। সে সংগীতটি কয়েক দশক ধরে আফ্রিকান কৃষ্ণাঙ্গদের সংগ্রামের প্রেরণা জুগিয়েছিল। সেন্ট আলবার্ট হলে ৫ হাজার দর্শকের উপস্থিতিতে কনসার্ট শুরু হয় ফিল কলিন্সের গান দিয়ে, আর শেষ হয় দক্ষিন আফ্রিকার ট্যাম্পেট বাদক হাগ ম্যাসকেলার নেতৃত্বে, ট্রাম্পেটের ঝঙ্কার এর মধ্য দিয়ে।
দর্শকদের হর্ষধ্বনিতে মেতে ওঠে আলবার্ট হল। তাঁর জন্ম, ত্যাগ, ধৈর্য, আন্দোলন, সংগ্রাম এবং চূড়ান্ত সাফল্য তাঁকে জীবনের পরিপূর্ণতায় ভরে দিয়েছে এবং মহান বিশ্ববরেণ্য নেতায় পরিণত করেছে। তিনি যাদের কাছ থেকে সহ্য করেছেন নির্যাতন কিন্তু রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব নিয়ে তাদের বিরুদ্ধে প্রতিশোধনীতি গ্রহণ না করার জন্য পৃথিবীর সর্বত্র প্রশংসিত হয়েছেন।
তাঁর অসীম সাহস, দক্ষ নেতৃত্ব ও নিঃস্বার্থ নীতির জন্য সারা বিশ্বের মানুষ তাঁর প্রতি অত্যন্ত শ্রদ্ধাশীল। বিশ্বব্যাপী একজন অসাধারণ ব্যক্তিত্ব হিসেবে নিজেকে তিনি নিয়ে গেছেন অন্যরকম উচ্চতায়। শান্তির স্বপক্ষে কাজ করা এবং আফ্রিকার নবজাগরণে ভূমিকা রাখার জন্য গত চার দশকে তিনি ২৫০টির বেশি আন্তর্জাতিক পুরস্কার।
এছাড়াও মার্কিন কংগ্রেসের প্রতিনিধি পরিষদ ও সিনেট সদস্যদের সর্বসম্মত সিদ্ধান্তে মর্যাদাপূর্ণ কংগ্রেশনাল স্বর্ণপদক বিশ্ববরেণ্য এই নেতাকে প্রদান করা হয়।
১৯৯৩ সালে পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ সম্মান ‘নোবেল শান্তি’ পুরস্কারে ম্যান্ডেলাকে ভূষিত করা হয়। ২০১৩ সালের ৫ ডিসেম্বর তাঁর বর্ণাঢ্য কর্মময় জীবনের পরিসমাপ্তি ঘটে।
লেখক : শিক্ষক