নেই ছনের ঘর পাহাড়ে

সাগর চক্রবর্তী কমল, মাটিরাঙা

সবুজ পাহাড়ে ছনের জায়গা দখল করে নিয়েছে ঢেউটিন। পাহাড়ে আর গ্রামের বাড়িতে এখন আর ধূসর রঙের ছনের চালা তেমন একটা চোখে পড়ে না।
এক সময় যেখানে ছিল ছনের ঘরে মানুষের বসতি, সেখানে এখন আর কোথাও ও-রকম ঘর নেই।
সময়ের ব্যবধানে এখন গ্রামীণ পল্লিতে ছনের বদলে জায়গা করে নিয়েছে টিন।
চিকচিক করা ঢেউটিনের চালা বহুদূর থেকে তার অস্তিত্বের কথা জানান দেয়। আর ঢেউটিনের দখলে হারিয়ে গেছে পাহাড়ের দীর্ঘদিনের ঐতিহ্য ‘ছন’।
আগে যেখানে গ্রামের প্রতিটি বাড়িতে একাধিক ছনের তৈরি ঘর চোখে পড়তো, সেখানে এখন পাহাড়ের দশগ্রাম ঘুরেও দেখা যায় না কোনো ছনের ঘর। গ্রামীণ জনগণের বসবাসের জন্য ঘরবাড়ি তৈরিতে ছাউনি হিসেবে ছনের ব্যবহার দিন দিন কমে যাচ্ছে। পাহাড়ে আজ হাজার বছরের পরমবন্ধু ছনের অস্তিত্ব বিলীন হতে চলেছে।
ছন আর ছনের ঘর বিলুপ্ত হওয়ার পাশাপাশি সমাজের একটি বড় অংশ বেকারও হয়ে পড়েছে। এক সময় যারা মানুষের ছনের ঘর নির্মাণে কারিগর (চৈয়াল) হিসেবে কাজ করতো তাদের এখন চরম দুর্দিন চলছে। তাদের এখন সংসার চালানো কষ্টকর হয়ে পড়েছে।
গত দুযুগেরও বেশি সময় ধরে বিভিন্ন পাহাড়ি জনপদে প্রচুর পরিমাণে প্রাকৃতিকভাবে ‘ছন’ জন্মাতো। আর সে ছন শোভা পেতো মানুষের ঘরের চালায়। হাট-বাজারে ছন বিক্রি করে সংসার চলতো এখানকার অনেক মানুষের। এখন শখের বসেও কারো পক্ষে ছন মেলানো দুঃসাধ্য হয়ে পড়েছে।
দীর্ঘদিন ধরে ছনের চাষ ও বিক্রি করে জীবিকা নির্বাহ করছেন এমন অনেকের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, আশ্বিন থেকে চৈত্র মাস পর্যন্ত ছন আহরণ করা হয়ে থাকে।
ছন চাষাবাদে তেমন পরিশ্রম নেই উল্লেখ করে তারা জানায়, পাহাড়ের যে অংশে ছন উৎপন্ন হতো তা পরিষ্কার করে দিলে কিছুদিন পর প্রাকৃতিকভাবেই ছনের কুঁড়ি জন্ম নেয়। এরপর ছনের দৈর্ঘ্য দেড়-দুহাত হলে আগাছা পরিষ্কার করে একবার ইউরিয়া সার প্রয়োগ করলেই হয়।
৬-৭ ফুট লম্বা হলেই কাটার উপযুক্ত হয় ছন।
আহরণের পর ১৫ থেকে ২৫ দিন পর্যন্ত পর্যাপ্ত রোদে শুকিয়ে বাজারজাত করা হয় ‘ছন’। বর্তমানে পাহাড়ের ঢালু কিংবা উপরিভাগে বিভিন্ন প্রজাতির বৃক্ষরোপণ, অবাধে পাহাড় কাটা, পাহাড়ে আগুন দিয়ে জঙ্গল পরিষ্কার ও জুমচাষসহ নানা কারণে দীর্ঘ দিনের ‘ছন’ বিলুপ্ত হয়ে গেছে।
পাহাড়ের জনপদে প্রাকৃতিকভাবে জন্মানো ‘ছন’ এখন আর চোখে পড়ে না। পাহাড়ের মানুষ একসময় ছনের চাষ ও বিক্রি করে জীবিকা নির্বাহ করলেও সেই পাহাড়ে এখন ছনবিহীন বিস্তীর্ণ পাহাড়।
মাটিরাঙা উপজেলার তাইন্দ ইউনিয়নের বাংলাটিলার বাসিন্দা পানচাষি মো. জালাল হোসেন সুপ্রভাতকে বলেন, ছন পানবরজে ব্যবহার করা হয়ে থাকে। তবে আগের মতো এখন আর ‘ছন’ পাওয়া যায় না। ছনের জন্য অনেক কাঠখড় পোড়াতে হয়। ইতোমধ্যে অনেকেই ছনের পরিবর্তে পানবরজে বাঁশের ব্যবহার করছেন।
মাটিরাঙা পৌরসভার ২ নম্বর ওয়ার্ড কাউন্সিলর মোহাম্মদ আলী জানান, বর্তমানে পাহাড়ে ছনের উৎপাদন ও ব্যবহার কমে যাওয়ায় এটি এখন বিলুপ্তির পথে। ছন বিলুপ্ত হওয়ার কারণে সবাই কমদামি ঢেউটিন ব্যবহারে আগ্রহী হয়ে উঠছে।
আবার দুর্গম পাহাড়ি এলাকায় বসবাসরত অসচ্ছল মানুষেরা সামর্থ্য না থাকায় ছনের ওপরই ভরসা রাখছে মাথা গোঁজার জন্য। তবে মাথাগোঁজার ঠাঁই এই ছন হারিয়ে যাওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।
সচেতনমহলের মতে, অবাধে পাহাড় কাটা, পাহাড়ে আগুন দিয়ে জঙ্গল পরিষ্কারের কারণে শুধু পাহাড়ি জনপদে ছনের উৎপন্নই বন্ধ হচ্ছে না পরিবেশও হুমকির মুখে পড়ছে।