নৃশংস যুদ্ধের চেয়েও কেন বেশি আলোচনায় খাসোগি?

সুপ্রভাত ডেস্ক

সাংবাদিক জামাল খাসোগি নিখোঁজ হওয়ার আগে থেকেই সৌদি আরবের সরকারের বিরুদ্ধে মানবাধিকার লঙ্ঘনের ব্যাপক অভিযোগ ছিল। প্রতিবেশী ইয়েমেনে নৃশংস যুদ্ধে জড়িয়ে পড়া জোটের নেতৃত্বে রয়েছে দেশটি। আগস্টে স্কুল বাসে বোমা হামলায় ৪০ শিশুসহ এ পর্যন্ত কয়েক হাজার বেসামরিক নাগরিকের মৃত্যু হয়েছে এই যুদ্ধে। নির্বাসিত, ব্যবসায়ী, মওলানা, সাংবাদিক ও রাজ পরিবারের মধ্যে থাকা দেশটির ডি ফ্যাক্টো শাসক যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমানের প্রতিদ্বন্দ্বিদের কারাগারে পাঠিয়েছে সৌদি কর্মকর্তারা। খবর বাংলাট্রিবিউন।
সৌদি আরবের এসব নৃশংসতা ও অপরাধ এমন ক্ষোভ ও সমালোচনার জন্ম দেয়নি, অন্তত পশ্চিমা বিশ্বে। এর নেপথ্যে রয়েছে সৌদি যুবরাজের কৌশলী জনসংযোগ। এ পর্যন্ত পশ্চিমা সংবাদমাধ্যমে তার ভাবমূর্তি এসেছে প্রগতিশীল সংস্কারকারী ও মার্কিন মিত্র হিসেবে। কিছুদিন আগেই সৌহার্দ্যপূর্ণ সফরে যুক্তরাষ্ট্রে গিয়ে তিনি আন্তরিক অভ্যর্থনা পেয়েছেন আমাজনের প্রতিষ্ঠাতা এবং ওয়াশিংটন পোস্টের মালিক জেফিরি পি. বেজোস, দ্য রক খ্যাত ডোয়াইন জনসন, অপরাহ উইনফ্রে ও রুপার্ট মুরডকের মতো ব্যক্তিদের কাছ থেকে।
কিন’ তুরস্কের ইস্তানবুলে সৌদি কনস্যুলেটে জামাল খাশোগির হত্যাকাণ্ডের অভিযোগ সব কিছু পাল্টে দিয়েছে। নিখোঁজ হওয়ার আগে যে ব্যক্তি সম্পর্কে খুব বেশি মানুষ জানত না তার সম্পর্কে কেন এমন বড় ধরনের প্রতিক্রিয়া। অথচ সৌদি আরবের এর চেয়ে বেশি নৃশংসতাও ব্যাপকভাবে এড়িয়ে যাওয়া হয়েছে। মার্কিন সংবাদমাধ্যম দ্য ওয়াশিংটন পোস্ট এক প্রতিবেদনে এ বিষয়ে লিখেছে, খাশোগিকে নিয়ে এতো বেশি আলোচনার কারণ হয়ত সময় ও নিখোঁজের স’ানের সম্মিলন এবং তার হত্যাকাণ্ডকে ঘিরে তৈরি হওয়া ভয়ঙ্কর পরিসি’তি। সবকিছু মিলিয়ে মার্কিন দর্শক ও পাঠকদের কাছে ঘটনাটিকে বর্ণনাযোগ্য করে তুলেছে। ঘটনার বিস্তারিত ধীরে ধীরে প্রকাশের কারণে যুদ্ধের মুখহীন কাভারেজের তুলনায় দীর্ঘমেয়াদে আলোচনায় রেখেছে। যুদ্ধের সহিংসতার ক্ষেত্রে এমন দীর্ঘমেয়াদি প্রচার পাওয়া বিরল।
আন্তর্জাতিক বিষয়ক বিশ্লেষকরা বলছেন, খাশোগি ২ অক্টোবর সৌদি কনস্যুলেটে প্রবেশের পর থেকেই মার্কিন সংবাদমাধ্যমে খবর প্রকাশিত হতে থাকে। যুক্তরাষ্ট্রসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশ সৌদি আরবের কাছে জানতে চেয়েছে কী ঘটেছে। ওই দিনের পর থেকে সৌদি আরবের বিনিয়োগ সম্মেলনে সম্ভাব্য অংশগ্রহণকারী সংবাদমাধ্যম ও বিনিয়োগকারীরা উপসি’ত না হওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। ফলে এই ঘটনায় ধারাবাহিক সংবাদ প্রকাশের কারণে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের পররাষ্ট্রনীতিতে বড় ধরনের সংকট তৈরি করেছে।
খাশোগির হত্যাকাণ্ড ও ভূরাজনৈতিক গুরুত্বের কথা বাদ দিলেও তাকে নিয়ে যে ব্যাপক মাত্রায় সংবাদ প্রকাশিত হয়েছে তাতে সোভিয়েত ইউনিয়নের সাবেক শাসক জোসেফ স্ট্যালিনের ‘একটি মৃত্যু ট্র্যাজেডি, লাখো মৃত্যু পরিসংখ্যান’ উক্তিটির সত্যতা হাজির করেছে।
অক্টোবরের ২ তারিখের আগ পর্যন্ত খাশোগি ব্যাপক পরিচিত না হলেও ওয়াশিংটনে ছিল বেশ যোগাযোগ। এক সময় সৌদি রাজপরিবারের ঘনিষ্ঠ এই ব্যক্তি যুক্তরাষ্ট্রে স্বেচ্ছা নির্বাসনে এসে বাস করতেন নর্দান ভার্জিনিয়াতে। মার্কিন পররাষ্ট্রনীতি সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা, রাজনীতিক ও সংবাদমাধ্যমের হর্তাকর্তাদের সঙ্গে তার বেশ ভালো সম্পর্ক। গত বছর থেকে তিনি দ্য ওয়াশিংটন পোস্টে কলাম লেখা শুরু করেন। যা তাকে আন্তর্জাতিক পরিচিতি দিতে সাহায্য করে। ওয়াশিংটনভিত্তিক প্রজেক্ট অন মিডল ইস্ট ডেমোক্র্যাসির নির্বাহী পরিচালক স্টিফেন ম্যাকলনার্নি জানান, সবকিছু মিলিয়ে খাশোগিকে সৌদি আরবে নিপীড়নের শিকার হওয়া অন্যদের চেয়ে আলাদা করেছে। তিনি বলেন, সৌদি আরবে নিয়মিত নৃশংস সহিংসতার ঘটনা ঘটে। কিন’ নিপীড়িতরা অজ্ঞাত থেকে যান। জামাল অজ্ঞাত ছিলেন না। তিনি ছিলেন দ্য ওয়াশিংটন পোস্টের লেখক ও সাংবাদিক। এটা তাকে পরিচিত করেছে। এটা তাকে এমনভাবে হাজির করেছে নিজ দেশে থেকেও এমনটা হয়নি অনেকের।
খাশোগিকে বিদেশের মাটিতে হত্যার বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ বলে উল্লেখ করেন স্টেফানি। তিনি জানান, যে কোনও নির্বাসিত ব্যক্তিকে সৌদি আরবের ভেতরে হত্যা করা হলে তা ধামাচাপা দেওয়া খুব সহজ হতো। কিন’ এক্ষেত্রে ঘটনাটি ঘটেছে তুরস্কে। যে দেশের সঙ্গে সৌদি আরবের সম্পর্ক খুব মধুর নয়। ফলে যা ঘটেছে তা প্রকাশ করার দিকে আগাচ্ছে তুরস্ক। খাশোগির নিখোঁজ নিয়ে তদন্তের যেসব তথ্য-প্রমাণ ফাঁস হয়েছে সেগুলো তুর্কি সরকারের ইশারাতেই হয়েছে বলে মনে করেন অনেকে। সৌদি হিট স্কোয়াড, ক্লোজ সার্কিট ক্যামেরায় খাশোগির ফুটেজ ও হত্যার কথোপকথন ফাঁস হয়েছে। গত দুই সপ্তাহে বিরতি নিয়ে এসব ফাঁসের ঘটনা ঘটেছে। আর তা খাশোগির নিখোঁজ রহস্যকে সংবাদমাধ্যমে জীবিত রেখেছে। মজার বিষয় হলো, কমিটি টু প্রটেক্টস জার্নালিস্টসের (সিপিজে) মতে বিশ্বের মধ্যে সবচেয়ে বেশি সাংবাদিককে জেলে পাঠানো দেশ হলো খোদ তুরস্কই। হিউম্যান রাইটস ওয়াচের ওয়াশিংটন পরিচালক সারাহ মারগন বলেন, হত্যাকাণ্ডের যে বিভীষিকাময় নৃশংসতার কথা প্রকাশ হয়েছে সেটা একেবারে হরর চলচ্চিত্রের মতো। সিপিজের নির্বাহী পরিচালক জোয়েল সাইমন বলেন, খাশোগি হত্যার যে কথোপকথন ফাঁস হয়েছে সেটা আমার কাছে সাংবাদিক হত্যার সবচেয়ে ভীরুতাপূর্ণ বলে মনে হয়েছে। এমন নৃশংসতা সন্ত্রাসীদের কাছ থেকে দেখেছি আমরা কিন’ রাষ্ট্রীয় কর্মকর্তাদের কাছ থেকে নয়। খবর বাংলাট্রিবিউন।
সাইমন জানান, খাশোগির ঘটনা মানুষের মনে এতো নাড়া দেওয়ার কারণ হচ্ছে দ্য ওয়াশিংটন পোস্টের সঙ্গে সম্পৃক্ততা। যুক্তরাষ্ট্রে ২০০১ সালের ১১ সেপ্টেম্বর (৯/১১) হামলায় নিহত কোনও নির্দিষ্ট ব্যক্তির নাম হয়ত মানুষের মনে নেই। কিন’ এই ঘটনার কয়েক মাসের মধ্যে নিহত সাংবাদিক ড্যানিয়েল পার্লের কথা অনেকেরই মনে আছে। এর কারণ ওয়াল স্ট্রিট জার্নালের সঙ্গে তার সম্পৃক্ততা। ২০০২ সালে পাকিস্তানে প্রতিবেদন তৈরির সময় পার্লকে অপহরণ ও হত্যা করে সন্ত্রাসী খালিদ শেখ মোহাম্মদ। হিউম্যান রাইটস ওয়াচের মারগন মনে করেন, খাশোগির ক্ষেত্রে ঘটনাটির বিস্তারিত সংবাদ মাধ্যমে আসার কারণে সেটাকে মানুষ মনে রাখছে। তিনি উল্লেখ করেন সৌদি কনস্যুলেটে খাশোগি বান্ধবীকে বিয়ের জন্য যে নথিপত্র আনতে গিয়েছিলেন। মারগন বলেন, বিশ্বে অনেক সংঘাত ও চরম সহিংসতা রয়েছে বলা সহজ। যুদ্ধ যুদ্ধই। ভয়ানক অনেক কিছুই ঘটে। কিন’ এভাবে যখন কোনও ব্যক্তিকে হত্যা করা হয় তা আপনাকে নাড়া দেবেই। আমাদের তা বুঝতে হবে।