নির্বাচনে ভোটারদের অনীহা গণতন্ত্রের জন্য অশুভ সংকেত

সুভাষ দে

পাঁচ পর্বে অনুষ্ঠিতব্য উপজেলা পরিষদ নির্বাচনের প্রথম পর্যায় সম্পন্ন হয়েছে গত রোববার ১০ মার্চ। প্রথম পর্বে ৭৮টি উপজেলায় নির্বাচন হয়েছে। উপজেলা পরিষদ নির্বাচন নিরম্নত্তাপ ছিলো কেননা এতে প্রধান বিরোধী দল বিএনপি বা বামজোট ও অন্যান্য অনেক দল অংশগ্রহণ করেনি, জাতীয় পার্টির অংশগ্রহণও ছিলো দুর্বল, আওয়ামী লীগ ছাড়া অন্য কোনো দলের শক্ত প্রার্থীও ছিল না, কয়েকটি ড়্গেত্রে আওয়ামী লীগের বিদ্রোহী প্রার্থী ছিলো, বিএনপি’র কয়েকজন স্বতন্ত্রভাবে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছে, তাদের বিরম্নদ্ধে দলগতভাবে ব্যবস’াও নেওয়া হয়েছে। এর পরও কয়েকটি উপজেলার নির্বাচনে হাতাহাতি, সংঘর্ষ, অনিয়মের ঘটনা ঘটেছে। বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় যারা নির্বাচিত হয়েছেন, সে সব এলাকায় ভোটাররা তাদের ভোটাধিকার প্রয়োগ থেকে বঞ্চিত হয়েছেন। এরকম ঘটনা ঘটেছে ১৫টি উপজেলায় যেখানে আওয়ামী লীগের সাথে বিদ্রোহী বা স্বতন্ত্র প্রার্থীর প্রতিদ্বন্ধিতা হয়েছে সেখানে ভোটের লাইন লড়্গ্য করা গেছে। অনেক নির্বাচনী এলাকায় ভোটারদের দীর্ঘসময় দেখা নেই এরকম ছবি প্রায় প্রতিটি পত্রিকায় এসেছে।
গ্রামাঞ্চলে যেখানে ভোটারদের মধ্যে যে কোন নির্বাচন নিয়ে গ্রামের হাট বাজার সরগরম থাকে; আত্মীয়তা সামাজিক সম্পর্কের কারণে নির্বাচনী প্রচারেও জমজমাট ভাব থাকে, কয়েকটা দিন গ্রামাঞ্চলে উৎসবের মতো পরিসি’তি বিরাজ করে, সেখানে উপজেলা পরিষদ নির্বাচনে একেবারে জৌলুসহীন নির্বাচনী পরিবেশ বিরাজ করেছে। এতে ধীরে ধীরে নির্বাচনের প্রতি এক ধরনের অনীহার পরিবেশ সৃষ্টি হয় মানুষের যা রাজনীতি, গণতন্ত্র ও সামাজিক শৃঙ্খলার জন্য অশনিসংকেত।
কেবল গ্রামে নয়, ঢাকা উত্তর ও ঢাকা দড়্গিণ সিটি কর্পোরেশনের বেশ কয়েকটি নতুন ওয়ার্ড নির্বাচনে এবং ঢাকা উত্তরের মেয়র উপ-নির্বাচনেও ভোটার উপসি’তি একেবারেই কম ছিলো। সরকারি দল থেকে ভোটার না আসার কারণ নিয়ে নানা অভিমত দেওয়া হয়েছে। খোদ রাজধানীতেই নির্বাচনের এই অবস’া এ ধরনের রাজনীতি কিংবা নির্বাচন বিমুখিনতা কোনভাবেই প্রত্যাশিত নয়।
বিগত জাতীয় নির্বাচনে প্রায় সকল দল অংশ নিলেও নির্বাচনের ফলাফল প্রধান বিরোধী দল ও ঐক্যফ্রন্ট প্রত্যাখ্যান করেছে, এরই ধারাবাহিকতায় তারা ঢাকা উত্তর ও ঢাকা দড়্গিণের নির্বাচন এবং উপজেলা পরিষদ নির্বাচন বহন করেছে।
নির্বাচন কমিশন এবং সরকারের প্রতি অনাস’া তাদের এই সিদ্ধানেত্মর পেছনে কাজ করেছে, এখানে বাম-ডান-উগ্রবাম-উগ্রডান একই ধারা অনুসরণ করেছে। ফলে সরকারি দল এককভাবে স’ানীয় সরকার পরিষদের নির্বাচনে সুবিধা পেয়েছে এটি তাদের জন্য স্বসিত্মকর হলেও রাজনীতি ও গণতন্ত্রের জন্য সুখবর নয়। বরং এই ধরনের একক সাফল্য অনেক সময় কাঁটার মতো বিঁধে থাকে। উপজেলা পরিষদ নির্বাচনে ড়্গমতাসীন দলের স’ানীয় পর্যায়ে সাফল্য গ্রামাঞ্চলে কায়েমি স্বার্থবাদের সুযোগ সৃষ্টি হবে। দেখা গেছে এ ধরনের নির্বাচনী সাফল্য পরিবার, আত্মীয়তার সম্পর্ক এবং একেবারে অনুগত দলীয় সমর্থকদের জন্য অর্থনৈতিক ও বৈষয়িক সম্পদ সৃষ্টির উৎস হবে, এর ফলে গ্রামাঞ্চলেও দলীয় সমর্থকরা বেপরোয়া হয়ে উঠবে। প্রশাসন ও সামাজিক সকল সত্মরে তাদের প্রাধান্য সামাজিক ভারসাম্য বিনষ্ট করে দেবে। স’ানীয় প্রশাসন সবসময় এদের চাপে থাকবে। এতে করে সুশাসনের জন্য ড়্গমতাসীন দলের যে নির্বাচনী প্রতিশ্রম্নতি তা ‘সোনার হারিণ’ হয়ে থাকবে।
উপজেলা পরিষদ নির্বাচনে আরো ৪টি পর্যায় রয়েছে, আমরা আশা করি সরকার, নির্বাচন কমিশন, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী নির্বাচন শানিত্মপূর্ণ ও সুষ্ঠু ভোট অনুষ্ঠান নিশ্চিতকল্পে ভোটারদের জন্য আস’ার পরিবেশ সৃষ্টিতে উদ্যোগী হবে।
আমি মনে করি নির্বাচন প্রতিদ্বন্দ্বিতামূলক ও অংশগ্রহণমূলক করতে সরকার ও নির্বাচন কমিশনকে আরো কতগুলি পদড়্গেপ নিতে হবে। বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হওয়ার বিধি সংশোধন করে এ ধরনের সুযোগ না রাখার বিধান বিবেচনা করা যেতে পারে। লোভ, ভীতি ও চাপ দিয়ে প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীদের নির্বাচন থেকে নিবৃত্ত করার সংস্কৃতিকে কঠোরভাবে নিতে হবে। স’ানীয় সরকার পরিষদ নির্বাচন দলীয় প্রতীকে না হওয়াই ভালো দলমত নির্বিশেষে সৎ ও যোগ্য প্রার্থী যাতে নির্বাচনে অংশ নিতে পারে তার ব্যবস’া থাকা বাঞ্ছনীয়। এবার প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থী তেমন না থাকার কিংবা দুর্বল প্রার্থী থাকায় ভোটারদের বাড়ি বাড়ি গিয়ে ভোট চাওয়ার সংস্কৃতি যেটি যুগ যুগ ধরে চলে আসছে সে ধরনের প্রচার প্রচারণা দেখা যায়নি। এ ড়্গেত্রে দলীয় কর্মী, সমর্থকদের সক্রিয় ভূূমিকা থাকা প্রয়োজন ছিলো।
নির্বাচনে জনগণের সক্রিয় অংশগ্রহণ না থাকলে গণতন্ত্রের বিকাশও ব্যাহত হয়। নির্বাচনকে ঘিরে যে প্রচার প্রচারণা, মতবিনিময়, তর্ক বিতর্ক চলে রাজনীতি ও প্রার্থীদের যোগ্যতা নিয়ে জনমত প্রভাবিত হয়, তা গণতন্ত্র ও সামাজিক সুসি’রতার জন্য প্রয়োজন। নির্বাচনে অংশ নেয়া নাগরিক ‘অধিকার’ এ বোধ সকল মহলে সঞ্চারিত করতে হবে। সরকার ও নির্বাচন কমিশন, প্রার্থী এবং দল সকলে মিলে আগামী উপজেলা পরিষদের নির্বাচনগুলি শানিত্মপূর্ণ ও উৎসবমুখর করে তুলতে উদ্যোগী হবে বলে আমরা আশা করি। গণতন্ত্রে জনগণের সম্পৃক্ততাই সমাজ ও রাষ্ট্রের উন্নতি ও অগ্রগতির চাবিকাঠি। গণতন্ত্র, সুশাসন, সামাজিক ন্যায়বিচার জনগণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের বৈশিষ্ট্য। রাজনৈতিক দলগুলির সক্রিয় ভূমিকা ও তৎপরতা গণতন্ত্রের সুরড়্গার জন্য প্রয়োজনীয়।
সকল পর্যায়ে নির্বাচনে অংশগ্রহণ গণতন্ত্রের অপরিহার্য শর্ত। সরকার পরিবর্তন কিংবা সরকারকে ন্যায়ানুগ পথে পরিচালিত করতে জনগণের যে ভূমিকা তা নির্বাচনের মাধ্যমেই প্রতিফলিত হয়। এ জন্য জনগণকে সংগঠিত করেই প্রত্যাশিত ফল পাওয়া যায়।