নিপীড়িত জনতার সাহস অক্টোবর বিপ্লব

নিজস্ব প্রতিবেদক
Suvrojit_Octover_news_pic-(

‘অক্টোবর বিপ্লব সারা বিশ্বের মানুষের মুক্তি পথ দেখিয়েছিল। মানুষের বৈষম্যের অবসান ঘটিয়ে রুশ সমাজতান্ত্রিক বিপ্লব মুক্তির পথে সারা বিশ্বে ছড়িয়ে পড়েছিল। রুশ দেশে বিপ্লবের সেই পতাকা ম্রিয়মাণ হলেও এখনো টিকে থাকার স্বপ্ন দেখায় সংগ্রামী মানুষের মনে। রুশ বিপ্লবের এ প্রেরণা সারাবিশ্বের সংগ্রামীদের নিপীড়িত জনতার কাতারে দাঁড়ানোর সাহস দেখিয়ে চলছে শতবর্ষ ধরে।’ এমেরিটাস অধ্যাপক সিরাজুল ইসলাম এসব কথা বলেন।
গতকাল লালদীঘি মাঠে মানুষে মানুষে বৈষম্য ভুলে নতুন বিশ্ব গড়ার অঙ্গীকারে চট্টগ্রামে রুশ সমাজতান্ত্রিক বিপ্লবের শতবর্ষ পালন উপলক্ষে উদ্বোধন অনুষ্ঠানে তিনি এসব কথা বলেন।
তিনি আরও বলেন, ‘চট্টগ্রাম নানাভাবে সংগ্রাম ও দ্রোহের জন্য গৌরবান্বিত। চট্টগ্রাম ইতিহাসের নানা বাঁকে বিপ্লবী সংগ্রামে অংশ নিয়েছিল প্রত্যক্ষভাবে। যুব বিদ্রোহ ছাড়াও স্বাধীন বাংলাদেশের বিপ্লবী বেতার কেন্দ্র এখানকার মানুষকে সংগ্রামী চেতনায় অনুপ্রাণিত করে। রুশ বিপ্লবের শতবর্ষ তাই সারাদেশের তুলনায় চট্টগ্রামেও আকাঙ্খিত।’
সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী জাতীয় পতাকা ও উদযাপন পরিষদের আহ্বায়ক কবি ও সাংবাদিক আবুল মোমেন লাল পতাকা উত্তোলন করেন। উদ্বোধন অনুষ্ঠান শেষে বিভিন্ন বাম সংগঠনের শোভাযাত্রা নগরের বিভিন্ন সড়ক প্রদক্ষিণ করে মুসলিম হল মিলনায়তনে গতকাল বিকাল ৫টায় আলোচনা সভা অনুষ্ঠিত হয়।
উদ্বোধন শেষে বিভিন্ন বামপন’ী সংগঠনসহ মুক্তিকামী হাজারো মানুষের অংশগ্রহণে অনুষ্ঠিত হয় লাল পতাকা মিছিল। পরে চট্টগ্রাম কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার চত্বরে অনুষ্ঠিত সমাবেশে বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টির সভাপতি মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম, বাংলাদেশের সমাজতান্ত্রিক দলের (মার্কসবাদী) কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য শুভ্রাংশু চক্রবর্তী, গণসংহতি আন্দোলনের প্রধান সমন্বয়ক জোনায়েদ সাকী, গণমুক্তি ইউনিয়নের প্রধান সমন্বয়ক নাসির উদ্দিন নাসুসহ অনেকে বক্তব্য রাখেন।
শ্রেণিহীন মানুষের স্বপ্নে প্রতিষ্ঠিত রুশ বিপ্লব দীর্ঘস’ায়িত্ব লাভ না করলেও পৃথিবীর সকল প্রান্তে নিপীড়িত মানুষের মনে এখনো অক্টোবর বিপ্লব তরতাজা প্রেরণা। এ প্রেরণা উৎস ও ইতিহাস নিয়ে বাংলাদেশের সমাজতান্ত্রিক দলের (মার্কসবাদী) কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য শুভ্রাংশু চক্রবর্তী বলেন, ‘রুশ বিপ্লব মানবসভ্যতার যুগান্তকারী এক ঘটনা। ১৯১৭ সালে সফলভাবে গড়ে উঠেছিল শোষণহীন এক নতুন রাষ্ট্রব্যবস’া। সূচিত হয়েছিল শোষণমুক্ত সমাজের দিকে যাত্রা।
দাসত্বের শৃঙ্খল থেকে মুক্ত হয়ে ধনী-গরিব সকলেই পেয়েছিল সমান অধিকার।
তিনি আরো বলেন, ‘রুশ বিপ্লবের কারণে সমাজের তলানিতে থাকা মানুষও উঁচু শ্রেণির মতো বিনোদন থেকে শুরু করে সকল ক্ষেত্রেই সমান সুযোগ পেতে শুরু করে। নারীরাও পুরুষের পাশাপাশি সমাজের প্রতিটি কাজে সমান অংশগ্রহণ করতে থাকে। তথাকথিত গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে তখনো নারীরা ভোটাধিকার না পেলেও রুশবিপ্লবের ফলে তা সম্ভব হয়েছিল।’
দুনিয়াজুড়ে যে বুর্জোয়া ফ্যাসিস্ট চর্চার সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছেছে তার থেকে বেরিয়ে আসতে অক্টোবর বিপ্লবের শতবর্ষের চেতনা মানুষকে নতুন পৃথিবীর স্বপ্ন দেখাবে বলে গণসংহতি আন্দোলনের প্রধান সমন্বয়ক জোনায়েদ সাকী বলেন, ‘এদেশের চলমান অসি’র রাজনৈতিক চর্চা বৈশ্বিক মুনাফার লোভী রাষ্ট্রগুলোর সাথে যেভাবে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে পড়েছে। তার থেকে বেরিয়ে আসতে হলে এদেশের সংগ্রামী মানুষদের আরও বেশি সংগঠিত হওয়ার সময় আমাদের প্রতিটি ভোরে করাঘাত করছে।’
অক্টোবর বিপ্লব পৃথিবীতে প্রথমবারের মতো সামাজিক-আর্থিক বৈষ্যমের অবসান ঘটিয়ে একটি উন্নত মানবিক ও সাম্যের সমাজ বিনির্মাণের উদ্যোগ গ্রহণ করে জানিয়ে বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টির সভাপতি মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম বলেন, ‘লেনিনের নেতৃত্বে রাশিয়াতে সংঘটিত মহা সমাজতান্ত্রিক বিপ্লব মানবসভ্যতার অগ্রগতির ইতিহাসে এক অনন্য ঘটনা। সেই বিপ্লবের চেতনা সারা পৃথিবীর রাজনীতি, অর্থনীতি, শিল্প, সাহিত্য ও সংস্কৃতির ইতিহাসে এক যুগান্তকারী পরিবর্তন নিয়ে আসে।’
আওয়ামী লীগ ও বিএনপি মতো রাজনৈতিক দল দেশে দ্বিদলীয় ধারা তৈরি করছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘বর্তমানে আমাদের দেশে চতুর্দিকে সংকট। অর্থনৈতিক, সামাজিক, রাষ্ট্রীয় জীবনে সংকট চলছে। সমাজের সর্বক্ষেত্রে সাম্প্রদায়িকতার বিষবাষ্প ছড়িয়ে দেয়া হচ্ছে। সমাজতন্ত্রের লক্ষ্য নিয়ে যে মুক্তিযুদ্ধ সংগঠিত হয়েছিল তা থেকে আমরা পেছন দিকেই হাঁটছি। এর অবসান ঘটাতে হবে।’
আলোচনা সভা অনুষ্ঠানের শুরুতে প্রবীণ বিপ্লবী নেতা আহসান উল্লাহ চৌধুরী, রাখাল দাশ, মিয়া জাফর, আবু বক্কর, বিমল দে, নুরুল ইসলাম, সালেহ আহমেদ-কে আজীবন সম্মাননা দেয়া হয়। আলোচনা সভা শেষে মুসলিম হলে সংগীত, আবৃত্তি ও নাটক পরিবেশন করেন উদীচী, চারণ, প্রমা, বোধন, রক্তকরবী, ওড়িশী অ্যান্ড টেগোর ডান্স মুভমেন্ট ও চট্টগ্রাম থিয়েটার।