নিজের চোখে রবীন্দ্রনাথ

সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের জন্মের ১৫৭ বছর অতিক্রান্ত হল। তাঁর দীর্ঘ জীবনের অবিনশ্বর কীর্তির প্রায় সব খবরই আমরা জানি, কিন’ একটি বিষয় কি আমাদের জানা হয়ে গেছে, যা একটি প্রশ্নের আকারে বলা যায়, রবীন্দ্রনাথ নিজেকে কিভাবে দেখতেন? সময়ের এই দূরত্বে এই প্রশ্নের কোনো নিশ্চিত উত্তর অবশ্য আমাদের জানা সম্ভব নয়। তিনি আত্মজীবনী লিখেননি, বাল্য-জীবনের কিছু স্মৃতি লিপিবদ্ধ করেছেন মাত্র, নিজেকে বিশ্লেষণ করেননি কোনো দীর্ঘ রচনায়; ধারাবাহিক আত্মউন্মোচনের তেমন অবিসংবাদী নমুনা নেই আমাদের সামনে। সত্য যে, তাঁর জীবনের বিভিন্ন ও বিচিত্র বহু তথ্যের অধিকারী হয়েছি আমরা, রবীন্দ্র জীবনীগ্রন’ অনেক রচিত হয়েছে । বিভিন্ন লেখায়, চিঠি-পত্রে, ভ্রমণকাহিনীতে, ভাষণে, জার্নালে তিনি যেটুকু বলেছেন নিজের সম্বন্ধে, তার তালিকা হয়েছে। যারা তাঁর সংস্পর্শে এসেছিলেন, অনেকে স্মৃতিকথা লিখে গেছেন, তার কিছুটা প্রয়োজনীয় কিছুটা পরিত্যাজ্য-স্তব-স’তি এবং প্রশংসায় আকীর্ণ। রবীন্দ্রনাথ তাঁর আজীবন নির্জনতালোভী, নিমগ্ন চিত্তের জন্য নিজের চারদিকে অপরিচয়ের একটি দেয়াল রেখেই গেছেন: সংযমের শাসনে বেঁধে রেখেছেন আত্মপ্রকাশের স্রোতটিকে। “কে আমি” – এই নিরন্তর প্রশ্নটি হয়তো উচ্চারিত হতে শুনেছেন নিজের ভিতরে বহুবার, উত্তর পেয়েছেন কি পাননি, আমাদের জন্য সেই সংবাদ লিখে যাননি সবিস্তারে।
নিজেকে নিয়ে যদি ভেবে থাকেন রবীন্দ্রনাথ, তার বিবরণ তেমন লিখে রাখেননি; প্রথম জীবনের কবিতায় তেমন নিবিড় অথবা ক্রমাগত চিন্তা-ভাবনা চোখে পড়ে না। শেষ জীবনের নানা লেখায় বরং আত্ম-অবলোকনের আয়োজন দেখা যায়। “পরিশেষ” থেকে “পুনশ্চ”, “শেষ সপ্তক” থেকে “পত্রপটু” পর্যন্ত কাব্যের নানা কবিতায় তিনি নিজের সংগে কথোপকথনে লিপ্ত, কোনো সি’র আয়নায় যেন নিজেকে দেখছেন, আর উদঘাটন করছেন তাঁর একান্ত সত্তাটিকে। সেই সত্তা কি কোনো দার্শনিকের, জীবন থেকে পালিয়ে বেড়ানো কোনো পথিক কবির, সন্যাসীর অথবা গৃহীর? জীবন ও জগতের কাছে দায়বদ্ধ রবীন্দ্রনাথের মুখটিতে কি ভাসে ঐ আয়নায় অথবা দুই বিশ্বযুদ্ধের মধ্য সময়ে দ্রুত ধাবমান ঘটনাপঞ্জীর সাক্ষী, ইতিহাস দ্রষ্টা রবীন্দ্রনাথের, যার ব্যক্তিগত অনুধাবনে পৃথিবীর উন্মত্ততা শুধুই বেদনার জন্ম দিত, দিত হতাশার অথবা করুণার? বলা বাহুল্য যে, চিন্তা-চেতনা ও বিষয়-বস’র বিচারে তাঁর শেষ পর্যায়ের কবিতায় অধ্যাত্ম চিন্তা ঘনীভূত, প্রকাশ উদার এবং স্বচ্ছন্দ স্ফুরণ তা’কে রহস্যবাদের দিকে টেনে নেয়, তা’র মানবতাবোধ পুষ্ট হয়, সৃষ্টির লীলা বৈচিত্র্যের নিবিড় ধ্যানে। কিন’ এই স্বতঃস্ফূর্ত প্রতিক্রিয়ায় তিনি যতটা জগৎ ও অধ্যাত্মলোকের উন্মোচনে ব্যস্ত ছিলেন তার সমপরিমাণ সক্রিয় ছিলেন আত্মউদঘাটনে। জগতের মধ্য দিয়ে নিজেকে দেখেছেন রবীন্দ্রনাথ। যেমন এক সময় “মানসী” ও “সোনার তরীর” কালে, নিজের ভিতর দিয়ে দেখতেন জগৎকে। শেষ পর্যায়ে, এক দীর্ঘ পথ পরিক্রমার অন্তে, বৃহতের মধ্যে ক্ষুদ্রকে অবলীলায় অনুভব করতে শিখেছেন তিনি: যৌবনে এই ঘটনাটি তার কাছে এতটা অনায়াসলব্ধ অর্জনের বিষয় ছিল না।
তদুপরি শেষ বয়সে, তিনি চিত্রকলায় নিজেকে অবলোকন করেছেন নিবিষ্টভাবে। যে নিজস্ব চিত্রকলার তিনি প্রচলন করেন, তাতে প্রকাশবাদের উপাদনসমূহ বেশি চোখে পড়ে, বিশেষ করে বিমূর্ত প্রকাশবাদের। তার জ্যামিতিক ও নক্সাধর্মী কাজে প্রতীক নির্ভরতা এবং এই প্রতীকের সাহায্যে একটি প্রধান চিন্তাকে আপাত বিচ্ছিন্ন (অথচ একটি সমতলে-ভাবের অনুভূতির-সম্পর্কযুক্ত) ভাবে প্রকাশ করার প্রচেষ্টা সহজেই লক্ষণীয়। কিন’ রবীন্দ্রনাথের বিমূর্ত রীতির ছবিতেও একটি ফিগার স’াপনের আগ্রহ দেখা যায়, যা কিছুটা অভিনব চিত্রকলায়; বরং বলা যায় তাঁর বিমূর্তায়ন শুধু ফর্মকে নিয়ে নিরীক্ষা নয়, ফিগারকে নানাভাবে হাজির করার কৌশলও বটে। স্কেচ বা নিসর্গ দৃশ্য, ফিগার বা মুখাকৃতির বিচিত্র সব স্টাডি এবং বিমূর্ত ধারার ছবিগুলিতে রবীন্দ্রনাথ, তাঁর অন্যান্য রচনার মতই জীবনের অপার রহস্যের উন্মোচনে নিয়োজিত। এসব ছবির প্রকাশ অদৃশ্যপূর্ব হলেও তাঁর দার্শনিক নান্দনিক উদ্দেশ্যটিকে কেউ প্রশ্ন করবে না। যে কোনো নিবেদিতপ্রাণ শিল্পীর মত তাঁর সচেতন সৃষ্টি প্রয়াসকে তারা বাঙময় করে। আমরা জানি, চিত্রকলার মাধ্যমে রবীন্দ্রনাথ একটি ভিন্ন জগতকে রূপ দিতে চেয়েছিলেন। যার সাথে তাঁর কবিতা, গানের গল্প উপন্যাসের পৃথিবীর মিলটি, ঐ দার্শনিক নান্দনিক দূরবর্তী কেন্দ্রভূমি ছাড়া, সামান্যই। প্যারিসে রবীন্দ্রনাথের চিত্র প্রদর্শনীর উদ্যোক্তা জনৈকা ফরাসি কাউন্টেসের মত, আমরা একটি ভিন্ন রবীন্দ্রনাথকে দেখতে পাই সেইসব কাজে, যেন দেবদূত পরিবর্তিত হয়েছেন অসুরে, অপাপবিদ্ধ একটি মুখ ধারণ করেছেন অসুরের মুখাকৃতি। কিন’ এই অনুধাবনটি প্রকৃতই কি রবীন্দ্রনাথের জীবন দর্শনের সাথে সামগ্রিকভাবে সম্পর্কযুক্ত? এমন একটি বিচার কি শেষ পর্যন্ত বৈধ প্রমাণিত হয় রবীন্দ্রনাথের ক্ষেত্রে? অস্বীকার করা যায় না যে, তার একটি সংগোপন ভিন্ন বিপরীত সত্তা ক্রমশ জীবন লাভ করে ঐসব চিত্রে। তিনি জগতের জনাকীর্ণ বৈঠকখানার অর্গল খুলে বেরিয়ে আসেন বাইরের মুক্ত নিসর্গে। কিন’ এই মুক্ত-শৃংখল রবীন্দ্রনাথ নিতান্তই সমাজনিরপেক্ষ, ব্যক্তিকেন্দ্রিক দায়-দায়িত্ব থেকে ছুটি নেয়া কোনো রবীন্দ্রনাথ নন বরং নিরন্তর ‘কে আমি’ এই প্রশ্নের উত্তর অন্বেষী একজন একান্ত নিঃসঙ্গে মানুষ। বহিরংঙ্গের শুচিশুভ্র রূপটিতে যে সৈ’র্য এবং মাধুর্য দেখা যায়, তার সাথে সংঘাত বাধে মানুষটির চঞ্চল জীবনাকাঙ্ক্ষার। এবং এই সংঘাত থেকে জন্ম নেয় চিত্রকলার কৌণিক, কিম্ভূত যত মুখের ফিগারের।
যে সমস্ত আত্মপ্রতিকৃতি এঁকেছেন তিনি তাদের যত্ন সহকারে দেখলে আরো অমিল চোখে পড়বে, যেন রবীন্দ্রনাথ কোনো গূঢ় বৈপরীত্য থেকে ক্রমাগত অপরিচিত করে চলেছেন তাঁর নিজের মুখটিকে। একটি আমোদিত ভাব লক্ষ্য করা যায় এই সব আত্মপ্রকৃতির কোনটিতে। রবীন্দ্রনাথ যেন পরিহাস ছলে নিজেকে যতদূর সম্ভব সরিয়ে আনছেন তাঁর প্রতিষ্ঠিত আদলটি থেকে, কিন’ প্রশ্ন করা যায়, কেন এই সচেতন প্রয়াস? নিজের ধ্যানী, নিজের ভিতর নিজেই পরিপূর্ণ ধরনের প্রতিকৃতি বা ফটোগ্রাফের প্রথার বাইরে গিয়ে নিজেকে কেন এই বিচিত্রভাবে দেখা, কোনো তুর্কী আয়নায়, ‘ছিন্ন পত্রের’ স্বপ্নে দেখা তাঁর বাড়ির মেয়েদের নানান অদ্ভুত আকৃতি ধারণের বর্ণনার মত?
নিজেকে রবীন্দ্রনাথ সেভাবে দেখেননি, জগৎ তাকে যেভাবে দেখেছে, অথবা তার সমসাময়িক লোকজন, বন্ধু-বান্ধব, গুণগ্রাহী অথবা স্তাবক-বৃন্দ। তিনি সচেতন ছিলেন যে ঐ পরিচয়টি প্রতিষ্ঠিত হয়ে গেছে। ভারত ও বিশ্বের সবার কাছে ঐ মুখটিই দেখাতে হত তাঁকে, সম্ভব ছিল না কোনো মৌলিকভাবে ভিন্ন পরিচিতির অবতারণা। কিন’ যে রবীন্দ্রনাথ ‘শিশু’র কবিতাগুলি লিখেছেন, খাপছাড়া ছন্দ রচনা করেছেন অনেক। বাল্যকালের সামান্য স্মৃতিগুলিকে অসামান্য ভেবে যত্ন করে তুলে রেখেছেন, নিজের ভিতরে সহস্র মনুষের বিচিত্র জীবনাভিজ্ঞতাকে উপলব্ধি করেছেন (যারা কত অজানা পথে গল্প-গুচ্ছে, উপন্যাসে কবিতায় এসেছে ঘুরে)। তিনি নিজেকেও নিশ্চয় কোনো সি’র মাত্রার মানুষ হিসেবে দেখেননি, বিশ্ব কবি বা কবিগুরু, ভারত বা বিশ্ব মনীষীর কোনো নির্দিষ্ট পরিচিতিতে আটকে রাখতে সম্মত হননি। তাঁর প্রতিকৃতিগুলি যে জটিলতার সৃষ্টি করে, যে রহস্যের জন্ম দেয তাদের ভিন্নতার জন্য একটি বিশেষ স’ানে এসে তারা তাঁর আত্মঅবলোকনের একটি গোপন পন’ার সন্ধান দেয়। আমরা দেখি, রবীন্দ্রনাথ নিজেকে আরোপিত পরিচিতির বৃত্ত থেকে বাইরে নিয়ে এসেছেন। এসব প্রতিকৃতি আমাদের জন্য অত্যন্ত প্রয়োজনীয়, কারণ পরিহাসছলে যে ব্যক্তিকে তিনি মেলে ধরেছেন, তিনি রবীন্দ্রনাথ হলেও খুব সহজে তাকে পরিচিত কোনো ভঙ্গির সাথে মেলানো যায় না।
ত্রিশের দশকে নতুন করে এবং প্রায় গোড়া থেকে, তাঁর একনিষ্ঠ শিল্পচর্চার পেছনে পরাবাস্তববাদী আন্দোলনটি সক্রিয় ছিল, এই সিদ্ধান্তটি দায়িত্ব নিয়েই দেয়া যায়। কিন’ যা উল্লেখযোগ্য – যতই রবীন্দ্রনাথের বহিঃস’ দায়-দায়িত্ব বাড়ছিল, তাঁর বিভিন্ন পরিচয় নির্দিষ্ট হয়ে যাচ্ছিল মানুষ ও সমাজের মনে, ততই তিনি স্বপ্নের গোপন লোকে প্রবিষ্ট হয়ে তুলে আনছিলেন জীবনবাদী, আনন্দলোভী একটি ডায়োনীসিও চরিত্রকে। একটি গানে তিনি এই গভীর আকুতিটি এইভাবে উচ্চারিত হতে শুনেছিলেন।
আপনারে দিয়ে রচিলিরে কি এ আপনারই আবরণ
খুলে দেখ দ্বার, অন্তরে তার আনন্দ নিকেতন॥
মুক্তি আজিকে নাই কোনো ধারে
আকাশ সেও যে বাঁধে কারাগারে,
বিষ নিশ্বাসে তাই ভবে আসে
নিরুদ্ধ সমীরণ
এবং আড়াল ঠেলে দেয়ার, আঁধার ঘুচাবার এবং আপনারে দূরে ফেলার আহ্বান শুনতে পান তিনি, কারণ “সহজে তখনি জীবন তোমার অমৃতে উঠিবে পুরে।” রবীন্দ্রনাথের অনেক লেখায় তাঁর ছায়াটি দীর্ঘ হয়ে দাঁড়িয়ে থাকে, ‘প্রান্তিক ও সেঁজুতির’ অনেক কবিতায় ঐ ছায়াটি অটল এবং দীর্ঘ। কিন’ ছায়াকে কায়ার সংগে মেলাতে গেলে ধন্ধ হয় আমাদের। নিতান্ত পরিচিত হয়ে দেখা দেয় ঐ কায়াটি, তার প্রকাশ হয় নেহাৎ আত্মজৈবনিক।
কিন’ ছায়াকে যদি ভিন্ন একটি অস্তিত্ব ভেবে নিতে পারি আমরা, যার উৎস স্বপ্নের কোনো লীলাক্ষেত্রে, তাহলে তাঁর আত্মঅবলোকনের একটি উপায়ের সাথে আমরা পরিচিত হতে পারব এবং এক সময় তাঁর রচিত একান্ত মুর্তিটিকে হয়তো চিনে নিতে সক্ষম হব।