নিউটন ফিউটন

আখতারুল ইসলাম
satelite(1)

নিউটনের খুব মাথা ব্যথা করছে। মাথার ভেতরে ঘড়ির মত টিক টিক শব্দ হচ্ছে। নিউটন ধীরে ধীরে চোখ মেলতে চেষ্টা করছে, কিন্তু চোখে যেন কিসের একটা প্রলেপ লাগানোর মত। অনেকক্ষণ পর চোখ খোলে। পুরাতন একটা ঘর। ঘরটা দোতলা ত্রিভুজ আকৃতির দেয়ালে রয়েছে বৈদ্যুতিক প্রবাহ। তিন কোণায় তিনটি পাথরের মূর্তির মত যন্ত্র মানব। বসে ল্যাপটপে কাজ করছে, নিউটন ঘুরে ঘুরে সব দেখছে। বামপাশের যন্ত্রমানব। নিউটন তাকে ডাকে, কোন সাড়া না পেয়ে স্পর্শ করে, স্পর্শ করতেই হলুদ বাতির সিগন্যাল জ্বলে ওঠে। নিউটন ভয় পেয়ে যায়। অদ্ভুত একটা শব্দ করে ডিটবোট হেঁটে আসে। তার শরীরের সাথে লাগানো অনেকগুলো বৈদ্যুতিক তার ঝুলে পড়ছে।
: গুড মরনিং নিউটন।
: গুড মরনিং ………….. ? আপনার নাম কী?
: আমি ডিউবোট?
: আমাকে এখানে কে এনেছে।
: মনে করার চেষ্টা করুন।
: না, আমার কিছুই মনে আসছে না।
কোন অসুবিধা নেই। আমার কাছে মেমোরি করা আছে। হঠাৎ ল্যাপটপ হাতে নিয়ে আলতো করে প্যাড টাচ করতে চোখের সামনে ভেসে ওঠে।
“নিউটন ও ফিউটন দুভাই নভোযানটি ডিসোম উপগ্রহ অতিক্রম করছে হঠাৎ মিক্রন ওড়ে এসে তাদের নিজস্ব আসনে বসিয়ে নিরাপত্তা বাঁধন দিয়ে আষ্ট্রেপৃষ্ঠে বেঁধে দেয়। কিছুক্ষণের মধ্যে নভোযানটির ইঞ্জিনের গর্জন শুনতে শুনতে মহাশূন্যে অদৃশ্য হয়ে যায়। নভোযানটি ধীরে ধীরে ডিমোস উপগ্রহের কক্ষপথ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পৃথিবীর বায়ুমণ্ডলে প্রবেশ করে, হঠাৎ ডিউবোট ল্যাপটপ টাচ করে বন্ধ করে দেয়। এসব দেখে নিউটন বলে, তারপর?
ডিউবোট বলে, তারপর মনে করার চেষ্টা করুন। কিন্তু নিউটন আবছা আবছা মনে করার চেষ্টা করে। নভোযানটি বাতাসের ঘর্ষণে কেঁপে কেঁপে ওঠে। তার পৃষ্ঠদেশে বাতাসের তীব্র ঘর্ষণে উজ্জ্বল রক্তবর্ণ ধারণ করে। নভোযানটি উষ্ণতা অনুভব করে। আকাশ কুচকুচে কালো থেকে বেগুনি-নীল হয়ে আসে।
নিউটন নিচে তাকিয়ে দেখে, নীল সমুদ্র, হলুদ মেঘ, ধূসর স্থলভূমি। নিউটন আর কিছু মনে করতে পারছে না। তবে এইটুকু বুঝতে পারছে, তাদের মহাকাশ যানটি ধ্বংস হয়ে গেছে, মিক্রন ও তার বাহিনীর হাতে।
কিন্তু ফিউটন কোথায়?
ডিউবোট, অপর ফূর্তিটির দিকে ঘুরে বলল, কীশবোট, নিউটন!
কীশবোট বলল, দেখো, তোমাকে মিক্রন এর হাত থেকে রক্ষা করেছি। কিন্তু ফিউটনকে পারেনি।
আমরা দ্রুত আমাদের নভোযানটির গতিবেগ পরিবর্তন করে শব্দের বাধা ও আলোর বেগের তিনগুণ গতিতে ছুটতে থাকি। আমি আমাদের পূর্ব পুরুষদের গ্রহ পৃথিবীর বায়ুমণ্ডলে। কিন্তু তোমাকে বাঁচাতে ল্যান্ড করতে হল এন্টার্কটিকা মহাদেশের বরফ পৃষ্ঠে। আমাদের এই ত্রিভুজাকৃতি যানটি অনেকটা গ্রীনহাউস এর মত। তোমার কোন ভয় নেই, তুমি সম্পূর্ণ নিরাপদ।
নিউটন নিরাপদ ভেবেও স্বস্তি পাচ্ছে না। ছোট ভাই ফিউটনের কথা ভাবছে, মনে হচ্ছে। নিশ্চয়ই ফিউটনকে মিক্রনরা মেরে ফেলেছে?
সর্বশেষ মূর্তি ক্রিনবোট বলল, হঠাৎ ওরা তোমাদের আক্রমণ করল কেন?
নিউটন বলল, আমি আর ফিউটন প্রবোস উপগ্রহে কক্ষ পথ অতিক্রম করে, ভুলবশত: ডিসোম উপগ্রহে কক্ষপথে ঢুকে পড়ি। হঠাৎ আমাদের নভোযানের ধাক্কায় ওদের একটা স্যাটেলাইট ধ্বংসপ্রাপ্ত হয়। তৎক্ষণাৎ ওদের কন্ট্রোল প্যানেলের মনিটরে ভেসে ওঠে, আমরা দ্রুত নভোযান নিয়ে ছুটতে থাকি। কিন্তু ওদের তিন তিনটি নভোযান এতো ক্ষিপ্র ছিল যেন আলোর বেগের ছয়শত গুণ বেগে অতিক্রম করে আমাদের আঘাত করে, সাথে সাথে নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলি।
পরবর্তীতে কি হল জানি না। ………………
কীশবোট বলল, আমাদের চাঁদের কক্ষপথে নতুন মহাকাশ স্টেশনে কাজ করছিলাম এটা দেখে তোমাদের বাঁচাতে ছুটে আসি, তোমাকে রক্ষা করলেও ফিউটনকে বাঁচাতে পারিনি, কারণ ওরা এতো ক্ষীপ্র গতিতে আঘাত করেছে তুমি ছিটকে পড়তেই ধরে ফেলি, আর ফিউটন সহ তোমাদের নভোযান চূর্ণবিচূর্ণ হয়ে পৃথিবীর বৃহত্তম মহাসাগর প্রশান্ত মহাসাগরে পড়ে। আমরা প্রশান্ত মহাসাগরের জলরাশিতে বা তলদেশে খুঁজতে পারি না, সেখানে আরো মহাবিপদ?
বিপদ কেন?
কেন তুমি জান না, পৃথিবীর পরিবেশ আগের মত নেই, কারণ অপরিকল্পিত জনসংখ্যা বৃদ্ধি, পরিবেশ দূষণ, নগরায়ণ, শিল্পায়ন ও যুদ্ধবিগ্রহ জনিত কারণে জলবায়ুর বিরূপ প্রতিক্রিয়া, প্রশান্ত মহাসাগরের জল এতো বিষাক্ত যে, কোন প্রাণী পড়লেই সাথে সাথে বিষক্রিয়ায় মারা যায় কয়েক সেকেন্ডে।
না, না ও মরবে না ও শরীরের যে কোন বিষক্রিয়া সহ্য করার মত এন্টি বিষটক্সিন প্রয়োগ করা আছে। যা আমাদের ছোটবেলায় প্রয়োগ করানো হয়। তবে মারা যেতে পারে যদি ভিনগ্রহীরা ধ্বংসাত্মক কোন বস্তু নিক্ষেপ করে থাকে তবে তার মৃত্যু হবে।
ডিউবোট, কীশবোট ও ক্রিনবোট সমস্বরে বলল, যদি সত্যি হয় তবে দেখবে, তোমার ভাই ফিউটন বেঁচে থাকবে চল, ওকে উদ্ধার করতে যাই।
নতুন একটি নভোযানে করে নিউটন সহ এন্টার্কটিকার বরফাঞ্চল হতে প্রশান্ত মহাসাগরে কেন্দ্রবিন্দু হতে সমুদ্র পৃষ্ঠ হতে এক কি. মি. উপরে নভোযানটি স্থির করিয়ে বিশেষ এক যন্ত্র দূরবীণ জাতীয় যন্ত্র দিয়ে প্রথমে পানিতে ভাসমান বস্তুগুলো দেখলো কিছু মাছ ও জলজ প্রাীণ ভাসছে কিছু মাছ ডুব দিচ্ছে, ডলফিন, তিমি, হাঙ্গর পানিতে খাবি খাচ্ছে, অক্সিজেন খুঁজছে, অল্পটুকুতে কোন মতে বেঁচে আছে, অক্টোপাস তিমির পৃষ্ঠে ওঠে মুমূর্ষু হয়ে কাতরাচ্ছে, সেপিয়াসহ কিছু প্রাণীর মৃত্যুতে গন্ধ-দুর্গন্ধে আরো বিষাক্ত হচ্ছে সমুদ্র পৃষ্ঠের পরিবেশ। কীশবোট উপরের দিকে তাকাল, সূর্যের আলোতে সমুদ্রপৃষ্ঠে বিচিত্র ধরনের লাল-কালো আলোতে ঝিকমিক করছে। ক্রিনবোট বলল, আমি পানিতে নামব লাইফজেট প্যাক পড়ে ৪, ২৭০ মিটার নিচে তলদেশে নামবে? তারপর নামে, হঠাৎ ঘূর্ণিস্রোতে জেটপট খোলে যাবার উপক্রম দ্রুত উপরে আসে বিশাল এক তিমির সাথে ধাক্কা খেয়ে কোন মতে দেখে ওঠে আসে।
এরপর কীশবোট নামে তার লাইফজেটপ্যাক পরে প্রশান্ত মহাসাগরের একদম তলদেশে যেখানে বেসিন “মারিয়ানা ট্রেঞ্চ”। যার গভীরতা ১১, ০৩৩ মিটার পর্যন্ত, নেমে কোথাও খুঁজে পেল না। ফিরে এলো কীশবোট, পরে ক্রিনবোট নামে তন্ন তন্ন করেও খুঁজে পেল না। ডিউবোট দেখে ল্যাপটপের মনিটরে প্রশান্ত মহাসাগরের দক্ষিণে অস্ট্রেলিয়ার উপকূল থেকে অদূরে ফিজির কাছাকাছি কিছু একটা ভাসতে এবং তা নড়াচড়া করছে তা ক্লোজ সার্কিট ক্যামেরার কাজ করে তথ্য খুঁজতে। এই তথ্য বার বার মনিটরে ভেসে ওঠায় ক্রিনবোট নিউটনকে বলছে, দেখ নিউটন, এটা একটা বস্তু! মনে হচ্ছে জীবিত কোন বস্তু নড়াচড়া করছে।
নিউটন বলল, মাছ বা সামুদ্রিক কোন প্রাণি হবে।
ক্রিনবোট, ডিউবোটকে ডেকেও দেখায়। ডিউবোটকে বলে, আচ্ছা তথ্যটা কেন্দ্রীভূত কর। হয়তো, কিছু একটা হতে পারে। ডিউবোট, ক্রিনবোট এর মত, দ্রুত কেন্দ্রীভূত করে দেখতে পায় পানির উপর হাত পা নাড়ছে।
ডিউবোট বলল, ইউরেকা, পেয়ে গেছি। নিশ্চয়ই কোন মানুষ হবে, সাথে সাথে ক্রিনবোট ভালো করে পর্যবেক্ষণ করে দেখে সত্যি তা মানুষ। নিউটনকে দেখায়। নিউটন তবু বিশ্বাস করছে না। সাথে সাথে ক্রিনবোট কীশবোটকে বলে, নভোযানটি ফিজিতে নিয়ে যেতে। কয়েক মিনিটের মধ্যে তাদের উড়ন্ত নভোযান প্রশান্ত মহাসাগরের উপকূল হতে ফিজিতে সমুদ্র উপকুল নামে, দ্রুত বস্তুর নিকটে গিয়ে, কীশবোট ওটাকে উপকূলে নিয়ে আসে।
নিউটন দেখে অবাক তারই ছোট ভাই ফিউটন! কিন্তু শরীরের বিভিন্ন অংশ ইনজুরড, তবু ভাইকে পেয়ে মহাখুশি, দ্রুত প্রাথমিক চিকিৎসা দিয়ে তাকে কিছুটা সুস্থ করে তোলে।
কীশবোট, ডিউবোট, ক্রিনবোটকে ধন্যবাদ দেয়। তোমরা ভিনগ্রহের যান্ত্রিক মানব হওয়া সত্ত্বেও যতটা মানবিক আচরণ করেছো, তার তুলনা হয় না।
ওরা নিউটনের কৃতজ্ঞতা দেখে খুশি হয়। নিউটন বলল, আমাদের নভোযান ধ্বংস হয়ে গেছে। আমরা কিভাবে ডিমোস উপগ্রহে আমাদের জগতে ফিরে যাবো।
কীশবোট বলে, নিউটন তোমাকে চিন্তা করতে হবে না। আমাদের নভোযানে ওঠ! ফিউটনকে তোল, আমরা তোমাদের নিরাপদে তোমাদের দেশে পৌঁছে দেব।
নিউটন, ক্রিনবোট সহ ফিউটনকে নভোযানে তোলে।
নীল মেঘের আকাশ পেরিয়ে, লাল মেঘের আকাশে ঘুড়ির মতো ওড়ে ওড়ে ধীরে ধীরে তারা ডিমোস উপগ্রহে অবতরণ করে। নিউটন, ফিউটন নেমে, নিজ দেশে আসতে পেরে ওরা মহাখুশি। ওদিকে ডিমোস উপগ্রহের লক্ষ লক্ষ বাসিন্দারা জড়ো হয় নিউটন, ফিউটনকে দেখতে।
নিউটন বলে, কীশ, ক্রিণ ও ডিউ তোমরা আমাদের গ্রহে কিন্তু আবার এসে ঘুরে যেও।
থাক! ওরা বলল, না, না, আমাদের থাকার মত সময় নেই। আমাদের অন্য একটা মিশন আছে। ডিমোসবাসী তাদের নভোযান লক্ষ্য করে কৃতজ্ঞতা জানায়। নিউটন বলে তোমাদের এই উপকার কখনো ভুলব না। ডিমোসবাসী তোমাদের মনে রাখবে চিরদিন। কোন দিন মনে পড়লে দেখতে এসো। আচ্ছা বলে, তারা বিদায় নেয়। নভোযানটি লাল মেঘে উড়তে উড়তে শূন্যে মিলিয়ে যায়।