নারী ও শিশুর নিরাপত্তা সর্বাগ্রে বিবেচ্য

মো. সাইফুদ্দীন খালেদ

একুশ শতকে পদার্পণ করে বর্তমান বিশ্ব যে সামাজিক, অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক পালাবদলে অংশ নিচ্ছে নারী সেখানে এক অপরিহার্য অংশীদার, জীবনযুদ্ধেও অন্যতম শরিক ও সাথী। বিভিন্ন ধরণের সামাজিক কুসংস্কার কাটিয়ে নারীরা এগিয়ে আসছে, আলোকিত মানুষ হিসেবে গড়ে উঠতে। কিন’ তাদের অগ্রযাত্রায় যৌন নিপীড়ন, ইভটিজিং ও ধর্ষণ বিশাল প্রতিবন্ধকতার ভূমিকা পালন করছে যা নারী শিড়্গা ও তাদের জীবন যাত্রায় প্রধান অনত্মরায় হয়ে দাঁড়াচ্ছে।

নারী নির্যাতনের সংখ্যা দ্রম্নতহারে যেন বেড়ে যাচ্ছে। আগামীতে নির্যাতনের সংখ্যা কোথায় দিয়ে দাঁড়াতে পারে তা সচেতন মহল একটু ভাববেন বলে আশা করি। সভ্যতার এই চরম উৎকর্ষতায় এসে বাংলাদেশের মত একটি উন্নয়নশীল দেশে নারীরা প্রতিদিনই নির্যাতিত হচ্ছে। সাধারণত আমাদের গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে প্রত্যেক নারী পুরম্নষের স্বাধীনভাবে চলাফেরা করা, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা রয়েছে। নারী শিড়্গার বিষয়টি আমাদের সামাজিক অগ্রগতি ও অর্থনৈতিক উন্নয়নের সঙ্গে অপরিহার্য বিষয় হিসেবে জড়িত।

আধুনিক সমাজে নারী-পুরম্নষ নির্বিশেষে সকলেরই মৌলিক অধিকার সমান ও অভিন্ন। এককালে মাতৃতান্ত্রিক সামাজে নারীর ছিল প্রাধান্য। পরবর্তীকালে সমাজে পুরম্নষের প্রাধান্য প্রতিষ্ঠিত হলে নারী হয়ে পড়ে অনত্মপুরবাসী। ‘ইভটিজিং এর শিকার বা ধর্ষণের শিকার’ শিরোনামে সংবাদগুলো বড়ই নির্মম। চলমান বাসে ইভটিজিং কিংবা যৌন নির্যাতনের শিকার, তারপর হত্যা, এ এক নিদারম্নণ পরিসি’তি। সম্প্রতি এক ছাত্রী ধর্ষণের সংবাদ। এ অমানবিক বিষয়টি মানুষ হিসেবে নারীর অবমূল্যায়ন করছে। বাড়ছে সামাজিক সমস্যা ও সমাজজীবনে অনাকাঙ্খিত দুঃখদুর্দশা। আবার কখনো শিড়্গাঙ্গণে শিড়্গা গ্রহণে যাওয়া ছাত্রী ধর্ষিতা হয়ে, যৌন নিপীড়নের শিকার হয়ে ফিরে আসছে।

অথচ এদের কাছ থেকে পরিবার যেমন অনেক কিছু আশা করে তেমনি জাতিও অনেক কিছু আশা করে থাকে।

পারিবারিক শিড়্গার অভাব, আইনের সঠিক প্রয়োগ না করা, সর্বোপরি প্রত্যেক ধর্মের নিজ নিজ ধর্মীয় অনুশাসনগুলো সঠিকভাবে পালন না করার জন্য এ ধরণের সামাজিক অবড়্গয় ক্রমশ বৃদ্ধি পাচ্ছে। যথার্থ উদ্দেশ্য থেকে মানবমন বিভ্রানত্ম হয়ে পড়ে অবড়্গয়ের সৃষ্টি হচ্ছে। নৈতিক মূল্যবোধ ধুলোয় লুটোপুটি খাচ্ছে। এগুলোর জন্য দায়ী আমাদের যুবসমাজের সঠিক মনুষ্যত্ববোধের অভাব। যখন তাদের চরিত্র থেকে মহৎ গুণ বিদূরিত হয়ে অন্যায় অনাচার আশ্রয় নেয়, জীবনের কোন মহৎ লড়্গ্য থাকে না তখন এই অবস’ার সৃষ্টি হয়। দেশে আইন আছে, সমাজে ঘৃণাও আছে। তবুও দুষ্টড়্গতের মত এই বিষয়টি সমাজজীবনে নিরাময়ের অযোগ্য হয়ে আছে। কত নিরপরাধ কিশোরী-তরম্নণীর জীবন যে ধ্বংস হয়ে যাচ্ছে তার কোন সঠিক পরিসংখ্যান নেই। আজ আমাদের সমাজ অবড়্গয়ে নিমজ্জিত হয়ে যাচ্ছে।

দেশীয় ও আনত্মর্জাতিক যে কোন আইনে নারীর ওপর অত্যাচারের বিচার করা সরকারের দায়িত্ব। সিডো সনদের ১ অনুচ্ছেদের ৬ ধারায় বলা হয়েছে, ‘‘শরিক রাষ্ট্রগুলো নারীকে সব ধরণের অবৈধ ব্যবসায় এবং দেহ ব্যবসায়ের আকারে নারীর শোষণ দমন করার লড়্গে আইন প্রণয়নসহ সব উপযুক্ত ব্যবস’া গ্রহণ করবে’’। দেশীয় আইনেও এমন অনৈতিক ও মানবতাবিরোধী কাজের বিচার করা আবশ্য কর্তব্য।

বাংলাদেশ সংবিধানের ১৮(২) ও ৩৪(১) অনুযায়ী গণিকাবৃত্তি ও জুয়াখেলা নিরোধের জন্য রাষ্ট্র কার্যকর ব্যবস’া নেবে এবং সব ধরনের জবরদসিত্ম শ্রম নিষিদ্ধ ও আইনত দ-নীয়। ইভটিজিং দন্ডবিধি ১৮৬০ এর ৫০৯ ধারায় দ-নীয় অপরাধ। তাছাড়া সমপ্রতি সরকার সর্বোচ্চ শাসিত্ম ৭ বছর কারাদ- এবং ৫০,০০০ টাকা জরিমানার বিধান রেখে আইন প্রণয়ন করেছেন এমনকি ভ্রাম্যমাণ আদালতের মাধ্যমেও সর্বনিম্ন ১ বছর কারাদ- ও ৫,০০০ টাকা জরিমানার বিধান রেখে অধ্যাদেশ জারি করেছে।

নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন ২০০০ (সংশোধনী ২০০৩) এর ১০ ধারায় যৌনপীড়ন এর শাসিত্ম হিসেবে অনধিক ১০ বছর কিন’ অন্যূন ৩ বছর সশ্রম কারাদ-ের বিধান রয়েছে এবং এর অতিরিক্ত অর্থদ-ও রয়েছে। আর যদি নারীর শস্নীলতাহানির চেষ্টা করে বা অশোভন অঙ্গভঙ্গি করে তাহলে অনধিক ৭ বছর অন্যূন ২ বছর সশ্রম কারাদ- এবং ইহার অতিরিক্ত অর্থদ-। উক্ত আইনে ধর্ষণের সর্বোচ্চ শাসিত্ম হিসেবে মৃত্যুদ- বা যাবজ্জীবন সশ্রম কারাদ-েরও বিধান রয়েছে। শিড়্গাপ্রতিষ্ঠান ও কর্মড়্গেত্রে যৌন হয়রানি রোধে মহামান্য হাইকোর্টের রায়ের দিকনির্দেশনার অনুকরণে আইন প্রণয়ন করা। এসব বন্ধে সামাজিক আন্দোলন বা প্রতিরোধ গড়ে তুলতে হবে। নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন সংশোধন ও আধুনিকায়ন করে সঠিক ও যথাযথভাবে প্রয়োগ নিশ্চিত করা। বিচার দ্রম্নত সম্পন্ন করতে কার্যকরী ব্যবস’া নিতে হবে। শিড়্গা প্রতিষ্ঠান পরিচালনা কমিটি, সামাজিক সংগঠন, সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠান ও পাড়ায় মহলস্নায় কমিটি গঠন করে তাদের পাশাপাশি আইনশৃঙ্খলা রড়্গাকারী বাহিনীর সদস্যদের যৌথ উদ্যোগে নারী ও শিশুদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা প্রয়োজন। মনে রাখতে হবে মেধা, দড়্গতা, প্রতিভার অর্ধেক ভান্ডার সঞ্চিত রয়েছে নারীর কাছে। সামাজিক নিরাপত্তার অভাব তাদের শিড়্গার পথে যেন বাধা না হয়। নারী সমাজ যাতে শিড়্গার আলোতে উদ্ভাসিত হতে পারে সে লড়্গে প্রয়োজন প্রচলিত ধারার পাশাপাশি বিশেষ ধরণের শিড়্গা পরিকল্পনা।

সামাজিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে। কোন নারী কোন শিশু যেন ধর্ষণের শিকার না হয়। স্কুল-গামী ছাত্রী যেন কোনোভাবে নির্যাতনের শিকার না হয়। বাস এর ভিতরে বাসের নাম্বার সহ সিসি ক্যামেরা থাকা দরকার।

শিড়্গাপ্রতিষ্ঠানে ছাত্রীদের নির্বিঘ্নে যাতায়াতের উপযুক্ত পদড়্গেপ গ্রহণ করতে হবে। ছাত্রীরা যাতে নির্বিঘ্নে শিড়্গা প্রতিষ্ঠানে যাতায়াত করতে পারে সেজন্য শুধু তাদের জন্য পরিবহন ব্যবস’া থাকতে হবে। পাশাপাশি আইন শৃঙ্খলা রড়্গাকারী বাহিনীর তৎপরতা নিশ্চিত করতে হবে।

আমাদের দেশে প্রণীত আইনগুলি উত্তম কিন’ এর কার্যকর প্রয়োগ যথাযথ নয়। উদাহরণস্বরূপ নারী নির্যাতন আইন, মানবপাচার আইন, পরিবেশ আইন, সড়ক পরিবহন আইন ইত্যাদি। আইন থাকলেও এসব ড়্গেত্রে প্রতিকারের পথ খুঁজে পাচ্ছে না ভুক্তভোগীরা। প্রশাসনের দৃষ্টিভঙ্গিতেও পরিবর্তন আনতে হবে তদুপরি সরকারের সদিচ্ছা কিংবা অঙ্গীকার কাগজ কলমে কিংবা দলীয় ইশতেহারে আবদ্ধ থাকলে চলবে না।

আমাদের দেশের রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দের সমাজমানস, জনগণের অভিপ্রায়, পরিবর্তনশীল বিশ্বে যে সকল বিষয় সমাজ ও রাষ্ট্রের সাথে সঙ্গতিপূর্ণ সে সব তাদের আত্মস’ করে প্রায়োগিক ড়্গেত্রে দৃষ্টানত্ম স’াপন করতে পারলে প্রশাসনও চাপে থাকবে। আইনের বিধান কার্যকরে প্রতিবন্ধকতাও কমে আসবে।