নামকরা কোম্পানির ওষুধ অবিকল নকল!

সরবরাহ হাজারি গলি থেকে বিক্রি হচ্ছে অলিগলির ফার্মেসিতে

সালাহ উদ্দিন সায়েম

দীর্ঘ ১৫ বছর ধরে তিনি অ্যাজমার চিকিৎসায় ওষুধটি সেবন করে আসছেন। কয়েক দিন আগে এই রোগী একমি কোম্পানির ‘মোনাস-১০ মিলিগ্রাম’ ট্যাবলেটটি ক্রয় করেন নগরীর অলংকার মোড়ের ইউনাইটেড ফার্মেসি থেকে। ওষুধটি সেবন করার পর তার মনে হলো, এটি নকল ওষুধ। সন্দেহ মনে তিনি এ নিয়ে অভিযোগ করেন জেলা প্রশাসনে। অভিযোগ পেয়ে সোমবার ওই ওষুধের দোকানে হানা দেন ভ্রাম্যমাণ আদালত। ওই রোগীর সন্দেহ সত্য প্রমাণ হলো।
ওষুধের পাতার ডিজাইন, নামের ইংরেজি ও বাংলা বানান, এমনকি কোম্পানির নাম ও লোগো দেখতে একেবারে অবিকল আসলের মতো। বিস্ময়কর বিষয় হলো, অভিযানে উপসি’ত থাকা খোদ একমি কোম্পানির কর্মকর্তা তাদের আসল ওষুধটি চিহ্নিত করতে দ্বিধাদ্বন্দ্বে পড়ে যান। পরে একটা যন্ত্রের মাধ্যমে নকল আর আসল ওষুধ দুটি চিহ্নিত করা হয়।
এ ওষুধের দোকান থেকে ৫ বক্স অবিকল নকল ‘মোনাস-১০ মিলিগ্রাম’ ট্যাবলেট উদ্ধার করেন ভ্রাম্যমাণ আদালত। ইউনাইটেড ফার্মেসির স্বত্তাধিকারী সুরজিত সাহাকে আটক করে ১ মাসের কারাদ- দেন ভ্রাম্যমাণ আদালত।
জানা যায়, দি একমি ল্যাবরোটোরিজ লিমিটেড কোম্পানির ‘মোনাস-১০ মিলিগ্রাম’ ট্যাবলেট অ্যাজমার চিকিৎসায় সর্বাধিক প্রচলিত ওষুধ। অতি মুনাফার লোভে এ ওষুধটি অবিকলভাবে নকল করে নগরজুড়ে বাজারজাত করেছে একটি অসাধু চক্র।
গত বছরের ৫ ডিসেম্বর নগরীর পশ্চিম ষোলশহর মোহাম্মদপুর এলাকার সুন্নিয়া মাদ্রাসা রোডের সাইকা ফার্মেসি থেকে ৯৮ বক্স
অবিকল নকল ‘মোনাস-১০ মিলিগ্রাম’ ট্যাবলেট উদ্ধার করেছিল নগর ডিবি পুলিশ। এছাড়া নামকরা স্কয়ার কোমপানির অবিকলভাবে নকল করা গ্যাস্ট্রিক আলসারের অন্যতম একটি প্রচলিত ওষুধ সেকলো ক্যাপসুল ও এন্টিবায়োটিক জিম্যাক্স ট্যাবলেটও উদ্ধার করা হয়েছিল। অভিযানে ফার্মেসির তিন বিক্রেতাকে আটক করেছিল ডিবি পুলিশ।
একমি ল্যাবরেটোরিজ লিমিটেড কোম্পানির চট্টগ্রামের দায়িত্বশীল কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, অতি মোনাফালোভী একটি চক্র অ্যাজমার চিকিৎসায় সর্বাধিক প্রচলিত ‘মোনাস-১০ মিলিগ্রাম’ ট্যাবলেট অবিকলভাবে নকল করে
বাজারজাত করার বিষয়টি নিয়ে তারা শঙ্কিত। এ নিয়ে তারা নগরীর ১৬টি থানায় সাধারণ ডায়েরি করেছেন।
কিন’ এসব নকল ওষুধ কোথা থেকে ক্রয় করা হয়েছে সে বিষয়ে ভ্রাম্যমাণ আদালতের কাছে মুখ খোলেননি ইউনাইটেড ফার্মেসির স্বত্তাধিকারী সুরজিত সাহা।
তবে গত বছরের ৫ ডিসেম্বর নগরীর পশ্চিম ষোলশহর মোহাম্মদপুর এলাকার সাইকা ফার্মেসি থেকে আটক তিন বিক্রেতা জিজ্ঞাসাবাদে ডিবি পুলিশের কাছে স্বীকারোক্তি দিয়েছিলেন, এসব অবিকল নকল ওষুধ ঢাকার মিটফোর্ড থেকে প্রথমে হাজারি গলিতে আসে। হাজারি গলিতে এসব নকল ওষুধ বাজারজাতকারীদের একটি সিন্ডিকেট রয়েছে। তারা নগরীর বিভিন্ন অলি-গলির খুচরা ওষুধের দোকানে এসব নকল ওষুধ থেকে সরবরাহ করে।
একমি কোম্পানির চট্টগ্রামের একজন দায়িত্বশীল কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে সুপ্রভাতকে জানান, আমাদের মাঠ পর্যায়ের কর্মকর্তারা জানতে পেরেছেন হাজারি গলি থেকে অবিকল নকল মোনাস-১০ মিলিগ্রাম ট্যাবলেট নগরীর বিভিন্ন অলি-গলির খুচরা ওষুধের দোকানে সাপস্নাই দেওয়া হয়। কিন’ নকল এই ওষুধটি কোথায় তৈরি করা হয় সেটি আমরা এখনো জানতে পারিনি।
দি একমি ল্যাবরেটোরিজ লিমিটেড চট্টগ্রাম বিভাগের রিজিওনাল সেলস ম্যানেজার মাইনুল ইসলাম সুপ্রভাতকে বলেন, ‘মোনাস-১০ মিলিগ্রাম ট্যাবলেটের আসল পাতায় মোনাস ইংরেজি বানানের ‘ও’ অড়্গরের অর্ধেকাংশ কালো কালি দিয়ে মার্ক করা আছে। যা নকল মোনাস ট্যাবলেটের পাতায় নেই।’
জানা গেছে, একমি কোম্পানির ‘মোনাস-১০ মিলিগ্রাম’ প্রতি ট্যাবলেট কোম্পানি থেকে ফার্মেসি বিক্রেতাদের কেনা পড়ে ১৩ টাকা। কিন’ নকল ওষুধটি ফার্মেসি বিক্রেতাদের কেনা পড়ে ৩টাকা।
চট্টগ্রাম ওষুধ প্রশাসনের তত্ত্বাবধায়ক শফিকুর রহমান সুপ্রভাতকে বলেন, ‘বিষয়টা নিয়ে আমরা শঙ্কিত। নকল ওষুধ মানুষের শরীর কার্যত কোন কাজই করে না। বরং ড়্গতির কারণ হয়ে দাঁড়াতে পারে।’
এক প্রশ্নের জবাবে ওষুধ প্রশাসনের এ কর্মকর্তা বলেন, ‘আমাদেরও ধারণা, এসব নকল ওষুধ কারবারিদের হাজারি গলিতে শক্তিশালী সিন্ডিকেট রয়েছে। আমরা সেখানে অভিযানের প্রস’তি নেবো।’
জেলা প্রশাসনের ভ্রাম্যমাণ আদালতের নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট তৌহিদুল ইসলাম সুপ্রভাতকে বলেন, ‘এটা রীতিমতো বিস্ময়কর! যেখানে খোদ ওষুধ কোম্পানির কর্মকর্তা তাদের উৎপাদনকৃত ওষুধ চিহ্নিত করতে দ্বিধাদ্বন্দ্বে পড়ে যান, সেখানে সাধারণ মানুষ কীভাবে আসল ওষুধ চিনবে? নকল ওষুধ উদ্ধারে আমাদের অভিযান অব্যাহত থাকবে।’
প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘হাজারি গলিতে যদি এসব নকল ওষুধের কারখানা থাকে, তাহলে অবশ্যই আমরা সেখানে হানা দেবো।’