‘ধলঘাট বন্দর’ নামকরণ করা না হলে অনাপত্তি সনদ না দেয়ার হুমকি স'ানীয় ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যানের

নামকরণের ফাঁদে মাতারবাড়ি বন্দর

ভূঁইয়া নজরুল

সরকার বলছে ‘বাণিজ্যিক বন্দর’, ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান বলছেন ‘ধলঘাট বন্দর’, জেলা প্রশাসন বলছে ‘বঙ্গবন্ধু বন্দর’ আর জাইকা রিপোর্টে আছে মাতারবাড়ি বন্দর। এখন এই নামকরণের জটিল ফাঁদে পড়েছে দেশের আগামীর গভীর সমুদ্র বন্দর। এই বন্দরের নামকরণ ‘ধলঘাট বন্দর’ দেয়া না হলে ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান অনাপত্তি সনদ দেবেন না। আর সরকারের পরিবেশ সংরক্ষণ আইন অনুযায়ী এনভায়রনমেন্টাল ইমপেক্ট এসেসমেন্ট (ইআইএ) সনদ নিতে অবশ্যই স’ানীয় কর্তৃপক্ষের অনাপত্তি সনদ লাগবে।
কক্সবাজার জেলার মহেশখালীতে মাতারবাড়ি তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্রের প্রকল্পের আওতায় মাতারবাড়ি বন্দরের সম্ভাব্যতা সার্ভে করে আসছে জাপান ইন্টারন্যাশনাল কো-অপারেশন এজেন্সি (জাইকা)। তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্রের জন্য কয়লাবাহী জাহাজগুলোর জন্য চ্যানেল প্রয়োজন। আর সেই চ্যানেল খনন করতে গিয়ে এখানে বন্দর নির্মাণের সম্ভাবনা চলে আসে এবং গত কয়েক বছর ধরে এর কার্যক্রম অনেকদূর এগিয়েও যায়। চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের অধীনে এই এলাকায় গভীর সমুদ্র বন্দর নির্মাণের জন্য সাড়ে ১৮ মিটার ড্রাফটের জাহাজ ভেড়ার উপযোগী করে গড়ে তোলা হচ্ছে এই বন্দর। সাগর থেকে মাটি কেটে তৈরি করা হচ্ছে ৩৫০ মিটার দীর্ঘ চ্যানেল। চট্টগ্রাম বন্দরে প্রাকৃতিকভাবে সৃষ্ট চ্যানেলে জাহাজ প্রবেশ করলেও এখানে মাটি কেটে চ্যানেল তৈরি করা হচ্ছে। এখন চলছে এই প্রকল্পের ভূমি অধিগ্রহণ কার্যক্রম। একইসাথে প্রকল্পটি যাতে দ্রুত শুরু করা যায় সেজন্য সরকারে ইআইএ ছাড়পত্রও প্রয়োজন। পরিবেশ সংরক্ষণ আইন অনুযায়ী ইআইএ সনদ ছাড়া বৃহদায়তন কোনো প্রকল্পের কাজ শুরু করা যায় না।
এখন এই ইআইএ সনদে বিপত্তি দেখা দিয়েছে। পরিবেশ আইন অনুযায়ী ইআইএ রিপোর্ট স’ানীয় পরিবেশ অধিদপ্তরে জমা দিতে হয়। এবিষয়ে পরিবেশ অধিদপ্তর কক্সবাজার জেলার প্রধান সাইফুল আশ্রাব বলেন, ‘চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ অনলাইনে ইআইএ জমা দিলেও হার্ড কপি (পূরণকৃত ফরম) এখনো জমা দেয়নি। আর হার্ড কপি ছাড়া তা গ্রহণযোগ্য হবে না।’
ইআইএ রিপোর্টের হার্ড কপি জমা দিতে দেরি হচ্ছে কেন জানতে চাইলে চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ সূত্রে জানা যায়, স’ানীয় ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান এখনো অনাপত্তি সনদ দেননি। আর তা না দেয়াতেই বিলম্ব হচ্ছে।
ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান কেন দিচ্ছেন না জানতে চাইলে চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের সদস্য ( প্রশাসন ও পরিকল্পনা) এবং প্রকল্পের পরিচালক জাফর আলম বলেন, ‘আমাদের প্রস্তাবিত জায়গাটি পড়েছে মহেশখালীর ধলঘাট মৌজায়। তাই ধলঘাট ইউনিয়নের চেয়ারম্যানের দাবি এই বন্দরের নামকরণ ধলঘাট বন্দর হতে হবে। সেজন্য তিনি অনাপত্তি সনদ দিতে বিলম্ব করছেন।’
কিন’ বন্দর সূত্রে জানা যায়, এখনো এই বন্দরের নামকরণ হয়নি। প্রকল্প শুরুর আগে তা মাতারবাড়ি বন্দর হিসেবেই পরিচিতি পেয়েছে। পরবর্তীতে গত বছর নৌ মন্ত্রী শাজাহান খানসহ সরকারের উর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ প্রকল্প এলাকা পরিদর্শনের সময় তা মাতারবাড়ি বাণিজ্যিক বন্দর হিসেবে উল্লেখ করে। চট্টগ্রাম বন্দরের অধীনে এই বন্দরটি পরিচালিত হবে, সেই হিসেবে মূলত তা হবে একটি টার্মিনাল।
কিন’ অনাপত্তি সনদ না দেয়া প্রসঙ্গে জানতে চাইলে ধলঘাট ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যানের কামরুল হাসান বলেন, ‘পুরো এলাকাটি ভৌগলিকভাবে মাতারবাড়ি দ্বীপ হিসেবে পরিচিত। মাতারবাড়ি দ্বীপে দুটি ইউনিয়ন। একটি মাতারবাড়ি ও অপরটি ধলঘাট। তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্র ধলঘাট ও মাতারবাড়ি উভয় ইউনিয়নে হচ্ছে। তাই এর নাম মাতারবাড়ি তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্র হওয়ায় আমার এলাকার মানুষের তেমন কর্মসংস’ান হচ্ছে না। এখন বন্দরের পুরো জায়গাটি আমার (ধলঘাট) ইউনিয়নে। তাই এর নামকরণ কি আমি ধলঘাট বন্দর করতে পারি না?’
তাহলে কি ধলঘাট বন্দর নামকরণ করা না হলে আপনি অনাপত্তি সনদ দিবেন না এমন প্রশ্ন করা হলে তিনি বলেন, ‘ইআইএ রিপোর্টের জন্য আমার কাছ থেকে অনাপত্তি সনদ নিতে বলা হয়েছে। স’ানীয় জনসাধারণের জন্য আমাকে কিছু করতে হবে। আমার এলাকার সব জমি দিয়ে দেব কিন’ আমাদের এলাকার নামটি দেয়া হবে না, কেমন কথা? এজন্য আমি অনাপত্তি সনদ দেইনি। আমাকে আশ্বস্ত করা হলে দিব। এটা আমি জেলা প্রশাসককেও বলেছি।’
এবিষয়ে কথা হয় কক্সবাজারের জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ কামাল হোসেনের সাথে। তিনি বলেন, ‘স’ানীয় ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান ধলঘাট নামে বন্দরটি চাচ্ছেন। তবে এখনো যে অনাপত্তি সনদ দেয়নি তা জানি না। তবে আমরা এই বন্দরের নামকরণ বঙ্গবন্ধুর নামে করার জন্য মন্ত্রণালয়ে প্রস্তাবনা পাঠিয়েছি।’
এদিকে ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যানের অনাপত্তি সনদ ছাড়া এই প্রকল্পের ইআইএ সনদের শর্ত পূরণ করা যাবে কিনা জানতে চাইলে পরিবেশ অধিদপ্তর কক্সবাজারের প্রধান সাইফুল আশ্রাব বলেন, ‘স’ানীয় কর্তৃপক্ষ বলতে ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান বা উপজেলা চেয়ারম্যানকে বুঝায়। যদি ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান না দেন তাহলে উপজেলা চেয়ারম্যান থেকেও নেয়া যেতে পারে। এছাড়া সরকারের বিশেষ প্রকল্প হিসেবে শিথিলতাও রয়েছে। তাই এই সনদের জন্য প্রকল্প আটকে থাকবে না।’
ইআইএ সনদে স’ানীয় কর্তৃপক্ষের সনদের বিষয়টি কেন রাখা হয়েছে জানতে চাইলে সাইফুল আশ্রাব বলেন, ‘প্রকল্পটি যে এলাকায় বাস্তবায়ন হবে সেই এলাকার মানুষ যাতে পরবর্তীতে বাধা না দেয়, সেই এলাকার মানুষদের কিভাবে পরিবেশগত ও জলবায়ুগত দিক রক্ষা করা হবে এবং কোথায় পুনর্বাসন করা হবে তা সেই রিপোর্টে বাস্তবায়নকারী কর্তৃপক্ষ উল্লেখ করবে।’
উল্লেখ্য, চট্টগ্রাম বন্দরে সর্বোচ্চ ৯ দশমিক ৫ মিটার ড্রাফটের জাহাজ ভিড়তে পারে। বে টার্মিনালে সর্বোচ্চ সাড়ে ১১ মিটার ড্রাফটের জাহাজ ভেড়ার সুযোগ পাবে। অপরদিকে মাতারবাড়ি বন্দরে সাড়ে ১৮ মিটার ড্রাফটের জাহাজ ভিড়তে পারবে। যার ফলে সাগর পথে মেইন লাইনে চলাচলকারী বড় জাহাজগুলো মাতারবাড়িতে ভিড়তে পারবে। এধরনের জাহাজ যেসব বন্দরে ভিড়ে সেসব বন্দরকে গভীর সমুদ্র বন্দর বলা হয়ে থাকে। তবে সরকারের পক্ষ থেকে এটাকে গভীর সমুদ্র বন্দর না বলে বাণিজ্যিক বন্দর বলা হচ্ছে। ২০২৩ সালে এই বন্দর চালু করার লক্ষ্যমাত্রা নিয়ে এগুচ্ছে সরকার।