নববর্ষে লোকজ জীবন

বিপুল বড়ুয়া
bbb

বাঙালির জাতীয় জীবনে আগামী দিনের উচ্ছ্বাসময়তার বারতা বয়ে আনে নববর্ষ। এক ব্যতিক্রমী মনোব্যঞ্জনা-আনন্দ দ্যোতনা নিয়ে। বাংলা নববর্ষের আগমনে পুলকিত হয়ে ওঠে গ্রাম বাংলার পদ-জনপথ। যেন হিয়ায় হিয়ায় দোলা দিয়ে যায় মধুর অনাবিলতা। ছন্দে ছন্দে দুলে ওঠে পাওয়া না পাওয়ার হিসেব মিলাতে ব্যস্ত গ্রামীণ পট-আবহের বৃত্তবন্দি মানুষ। তারপরও তার নিভৃত মধুর উচ্চারণ-বোশেখ এলো-নববর্ষ এলো। শত বেদনা-ব্যর্থতার মাঝেও তার চোখেমুখে যেন স্বস্তি। লোকজ সমাজ পরিমণ্ডলের এ যেন অপেক্ষার প্রহর কেটে নির্মল সূর্যোদয়।
তাইতো বাঙালি সংস্কৃতির বিকাশে লোকজ উৎসব আনন্দের ধারাপ্রবাহকে সচল রাখতে নববর্ষ যেন বাংলার জনজীবনে বড়ো নিয়ামক ভূমিকা পালন করে। সাধারণ মানুষের ধ্যান-ধারণা, আনন্দ-উল্লাস ভাব বিনিময়ের মধুরতা, নিষ্কলুষ প্রণোদনার প্রকাশ প্রবহমানতার প্রতিভূই তো এই নববর্ষ। তাইতো নববর্ষে বাঙালির জীবনপ্রবাহে নবতর আনন্দ কর্মযজ্ঞের সঞ্চার হয় এবং তার অধিকমাত্রা পরিলক্ষিত হয় অবশ্যই লোকজ সমাজ জীবনে। বৈশাখের কাছাকাছি সময় হতে ঘরে ঘরে নববর্ষকে বরণের নানা আয়োজনে ব্যস্তসমস্ত হয়ে ওঠে আপামর সর্বশ্রেণির জনগোষ্ঠী।
নববর্ষের দিনটিতে সেই ব্যবসায়ী মহল-মহাজন শ্রেণি ‘হালখাতা’ উৎসব করে জাঁকজমকভাবে। সারা বৎসরের দেনা-পাওনার হিসেব চুকাতে ব্যস্ত হয়ে পড়ে পাওনাদার-দেনাদার, উভয়েই। সোল্লাসে চলে মিষ্টিমুখের প্রগলভতা। এ সময়টাতে ‘ঢাকী’ বেরিয়ে পড়ে-জোড়ঢাকের মঙ্গলময় বাদন ছড়িয়ে দিতে-কিছু আর্থিক উপার্জনের চেয়েও এখানে যেন বড় হয়ে ওঠে নির্মল আনন্দের নির্যাস খুঁজে ফেরা। গ্রাম বাংলার প্রত্যন্ত অঞ্চল ঢাকের বাদন মন্দ্রতায় মুখরিত হয়ে ওঠে।
চৈত্র-সংক্রান্তির কদিন আগে হতেই শিবের গাজন-গৈরা যখন নববর্ষতক এদিক-সেদিক ঘুরে বেড়ায়-সেই বাঘছাল আদলের সাজ পোশাক নিয়ে-তখন সবাই অবাক বিস্ময়ে চেয়ে থাকে বাংলার ধর্মীয়-লোকজ ঐতিহ্যের চমৎকারিত্বের দিকে-প্রাণভরে উপভোগ করে সাড়াজাগানো গাজন সাজকে। মেলার ধুম পড়ে যায় নববর্ষে। এ গাঁয়ে ও গাঁয়ে বট-পাকুড়ের কোল ঘেঁষে জমে ওঠে মেলা-আহা মেলা-কখনো সারা দিনমান কখনো বা কয়েকদিন ধরে চলে এই অসামান্য লোকজ উৎসব।
কুটির শিল্প, গৃহস্থালি দ্রব্যাদির সমারোহ-নকুড়দানা, খাজা-গজার গমাগম বিকিকিনি, বাঁশির সুর-বেসুরো মন্দ্রতায় কান ঝালাপালা এভাবে গ্রামীণ জনজীবনকে যেন আনন্দের এক ভিন্নতর দিগন্তে ডেকে নিয়ে যায়। তারি সাথে সার্কাস, যাত্রাগান, পুতুলনাচের চমৎকার আয়োজন সবার মনে খুশির হিল্লোল বইয়ে দেয়। লোকজ দুঃখ দারিদ্র্য নানা টানাপড়েনের জীবন যাত্রায় নববর্ষ এ আনন্দ সম্ভার দিয়ে লোকজ জীবনযাপনকে কিছুকাল কিছু সময়ের জন্য হলেও বিমোহিত করে রাখে।
নববর্ষের চমৎকার দিনে আশপাশের গাঁও গেরামে মহাউল্লাসে আয়োজন করা হয় কুস্তিখেলা (বলীখেলা), নৌকাবাইচ, ষাঁড়ের লড়াই, ঘুড়ি ওড়ানো প্রতিযোগিতা। লম্বা কোষা-ছিপ নৌকা চমৎকার সাজে সজ্জিত হয়ে যখন বাইচে নামে, খোলা মাঠে শক্তি ও বুদ্ধিমত্তার মারপ্যাঁচে যখন জমে ওঠে ভূমিপুত্রদের বলীখেলা, সুচালো শিং-এ লাল কাপড় প্যাঁচানো তাগড়া ষাঁড়ের লড়াই যখন জমে ওঠে, যখন রঙ বেরঙের বাহারি ঘুড়ির কাটাকাটিতে ভরে ওঠে দূরের আকাশ-তখনইতো গ্রাম বাংলার লোকজ সৌন্দর্য সত্যিকার অর্থে প্রতিভাত হয়ে ওঠে।
এভাবেই বাংলার হাজার বছরের লোকজ কৃষ্টির সৌকর্যের অনুপম প্রদর্শনী গ্রাম বাংলার উদোম বিল-খাল ছাড়িয়ে বৃহত্তর পরিমণ্ডলে তার ঐতিহ্যকে ছড়িয়ে দেয় নববর্ষের মধুরতম নানা আয়োজনে। নববর্ষের এ আয়োজন কোনো আরোপিত বিষয় বৈচিত্র্য নয়-এতে নেই কোনো ধরনের নিয়ম প্রবাহের বাধ্যবাধকতা। একান্ত প্রাণের টানে-আনন্দের অবগাহনে এভাবে নববর্ষের দিনগুলোতে গ্রাম বাংলা নিজকে ফিরে পায় এক ভিন্নতর আলোকোজ্জ্বল ভুবনে। তার কাছে নববর্ষের এই উৎসব যেন সতত মধুর।
নববর্ষের লোকজ উৎসব কথার পাশাপাশি জনজীবনের মানস চেতনায় ধ্বনিত হয় নূতনের আবাহনের দীপ্তময়তা। জীবনের রিক্ততা মুছে যাক-হারিয়ে যাক ক্লান্ত বিষণ্ন বেদনার কথামালা। জীবন সঞ্জীবিত হোক আলোয় আলোয় প্রার্থনার এ নির্যাস যেন ছড়িয়ে পড়ে কবি কৃতিতে- ‘এসো এসো, এসো হে বৈশাখ/তাপস নিঃশ্বাস বায়ে মুমূর্ষুরে দাও উড়ায়ে/বৎসরের আবর্জনা দূর হয়ে যাক/যাক, পুরাতন স্মৃতি যাক ভুলে যাওয়া গীতি/অশ্রু বাষ্প মুছে যাক জরা/অগ্নিস্নানে শুচি হোক ধরা/আলোহীন স্বপ্নহীন, গন্তব্যহীন জীবনযাপনে দিনমান সমর্পিত গ্রামীণ ব্রাত্যসমাজের এই আকাঙ্ক্ষার প্রার্থনার মধুরতম সঙ্গী-এই নববর্ষ। নববর্ষের চিরায়ত উৎসব অনুষ্ঠান।
বাংলার লোকজ জীবনে নববর্ষের এ পয়মন্ত রূপ বৈচিত্র্য স্বপ্নভঙ্গের মানুষগুলোকে হাজার অতৃপ্ততার মাঝেও যেন আশান্বিত করে রাখে। আজ সময় পাল্টেছে। বৈষয়িক বিচার বিবেচনায়, আর্থিক সমৃদ্ধিতে (!), বিশ্বায়নের চতুর খেলায়, আকাশ সংস্কৃতির দৌরাত্ম্যে দেশ-কাল-সমাজ-সংস্কৃতিতে আগ্রাসনের কালো থাবা এগিয়ে আসছে।
গ্রামবাংলার লোকজ সমাজ জনজীবনেও তার ধাক্কা প্রকটভাবে আজ অনুভূত। তারই ফলশ্রুতিতে বাংলার লোকজ সমাজ-সংস্কৃতি আজ যেন অবক্ষয়ের মুখোমুখি-যেন প্রলয় ভাঙনের পদধ্বনি শোনা যাচ্ছে-হয়তোবা বদলে যেতে বসেছে গ্রামীণ পট-আবহ।
অতসবের পরও আমাদের নববর্ষ ও তার উৎসব আবেদনকে নিয়ে আরো সোচ্চার হয়ে ওঠা আজ সময়ের দাবি হয়ে পড়েছে। ‘এবার ফিরাও মোরে’ সেই আপ্তবাক্যকে মনে রেখে গ্রাম বাংলার লোকজ ঐতিহ্য কর্মধারাকে স্মরণের দ্যোতনাকে আমাদের আজ আরো সরব করে তুলতে হবে।
জীবন জাগুক জীবনের নিভৃততম অন্তঃপুরের নির্যাস নিয়ে এবং এভাবেই বোধ হয় নববর্ষের প্রণোদনার মাঝেই হাজার হাজার বছর বেঁচে থাকবে বাংলার লোকজ সৌকর্য আগামীকালের জন্য সমৃদ্ধি-সভ্যতার বার্তাবহ হয়ে।