গভর্নরকে এমডিদের চিঠি

নতুন এডিআর নীতিমালা বাস্তবায়ন না করার আহ্বান

সুপ্রভাত ডেস্ক

আগ্রাসী ব্যাংকিং বন্ধে ব্যাংক খাতের ঋণ ও আমানতের অনুপাত কমিয়ে আনার সিদ্ধান্ত নিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। এ ব্যাপারে ব্যাংকগুলোকে জানিয়ে দেওয়া হয়েছে। কিন্তু ব্যাংকগুলোর ব্যবস্থাপনা পরিচালকরা (এমডি) মনে করছেন, বাংলাদেশ ব্যাংকের এই সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন হলে মূল্যস্ফীতি বৃদ্ধির চাপ সৃষ্টি হবে। এতে জিনিসপত্রের দাম আরও বাড়ার আশঙ্কা থাকবে। বিষয়টি উল্লেখ করে গত ১৫ জানুয়ারি বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর ফজলে কবিরের কাছে চিঠি দিয়েছে ব্যাংকের এমডিদের সংগঠন অ্যাসোসিয়েশন অব ব্যাংকার্স,বাংলাদেশ (এবিবি)। বাংলাদেশ ব্যাংক সূত্রে এই তথ্য জানা গেছে।
গভর্নরের কাছে লেখা এবিবির চিঠিতে বলা হয়েছে, আমরা উদ্বিগ্ন যে, নিকট ভবিষ্যতে অ্যাডভান্স ডিপোজিট রেশিও (এডিআর) কমিয়ে ৮০ দশমিক ৫ শতাংশের আশপাশে নামিয়ে আনা হবে। যদি তাই হয়, তবে ব্যাংকিং খাতে অতিরিক্ত ২০ থেকে ২৫ হাজার কোটি টাকার আমানতের প্রয়োজন হবে।
চিঠিতে এমডিরা আরও জানায়, আমরা উদ্বিগ্ন, কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নতুন এডিআর নীতিমালা বাস্তবায়ন হলে ব্যাংকগুলোর আমানতের সুদ হার বাড়বে। কারণ, বাড়তি আমানত সংগ্রহের জন্যই ব্যাংকগুলো আমানতের সুদ বাড়িয়ে দেবে। এতে ব্যাংক ব্যবস্থায় নতুন আমানত আসবে তাও নয়। শুধু এক ব্যাংকের আমানত আরেক ব্যাংকে যাবে। ফলে যে ব্যাংক আমানতের সুদ বাড়াবে, বিদ্যমান আমানতকারীরা অন্য ব্যাংক থেকে অর্থ তুলে সেই ব্যাংকে খাটাবে। আবার আমানতের সুদ বাড়লে ব্যাংকগুলো ঋণের সুদ হারও বাড়িয়ে দেবে, যা মূল্যস্ফীতি বৃদ্ধির ক্ষেত্রে চাপ সৃষ্টি করবে।
গ্রাহকদের কাছ থেকে আমানত নিয়ে ঋণ বিতরণ করাই ব্যাংকের প্রধান কাজ। এক্ষেত্রে দেশের সাধারণ ধারার ব্যাংকগুলো ১০০ টাকা আমানত সংগ্রহ করলে সর্বোচ্চ ৮৫ টাকা ঋণ দিতে পারে। তবে ইসলামি ধারার ব্যাংকগুলো ঋণ দিতে পারে সর্বোচ্চ ৯০ টাকা পর্যন্ত। কিন্তু সামপ্রতিক সময়ে বেশির ভাগ বেসরকারি ব্যাংকেরই এডি রেশিও ৯০ শতাংশ ছাড়িয়ে গেছে। ফলে বেশির ভাগ বেসরকারি ব্যাংকে সৃষ্টি হয়েছে তারল্য বা নগদ টাকার সংকট। এ পরিস্থিতিতে গত ৩ জানুয়ারি অনুষ্ঠিত ব্যাংকার্স সভায় বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোকে আগ্রাসী বিনিয়োগ থেকে বিরত থাকতে কঠোর নির্দেশ দেন গভর্নর।
সভা শেষে ডেপুটি গভর্নর এসকে সুর চৌধুরী বলেছেন,ব্যাংকগুলো থেকে যে হারে ঋণ বিতরণ হচ্ছে, সে হারে আমানত না আসায় এ পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর জন্য বিদ্যমান এডি রেশিও’র হার কমিয়ে আনার বিষয়ে ব্যাংকার্স সভায় নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। এমডিদের নিজ থেকে এডি রেশিও কমাতে বলা হয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে পরবর্তীতে সার্কুলার ইস্যু করে এডি রেশিওর নতুন হার নির্ধারণ করে দেওয়া হবে। এ হার সাধারণ ব্যাংকগুলোর ক্ষেত্রে ৮০ ও ইসলামি ব্যাংকগুলোর ক্ষেত্রে ৮৫ শতাংশের কিছুটা বেশি হতে পারে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকে নগদ জমা সংরক্ষণ (সিআরআর) ও বিধিবদ্ধ জমা সংরক্ষণ (এসএলআর) বাদ দিয়ে এ হার নির্ধারণ করা হবে। বিষয়টি নিয়ে এখন থেকে ব্যাংকগুলোকে প্রস্তুতি নিতে বলা হয়েছে।
প্রসঙ্গত, ব্যাংকগুলো যে হারে ঋণ বিতরণ করেছে, সে হারে আমানত সংগ্রহ করতে না পাড়ায় এডি রেশিও বেড়ে গেছে।
এ বিষয়ে এবিবি চেয়ারম্যান ও ঢাকা ব্যাংকের এমডি সৈয়দ মাহবুবুর রহমান বলেছেন, ঋণ যে হারে গেছে, সে হারে আমানত আসেনি। ফলে ব্যাংকগুলোর এডি রেশিও বেড়ে গেছে। বাংলাদেশ ব্যাংক বলেছে, ৮৫ শতাংশের বেশি এডি রেশিও কোনও ব্যাংকের থাকতে পারবে না।
এদিকে গভর্নরকে লেখা এবিবি’র চিঠিতে উল্লেখ করা হয়, কিছু সময়ের মধ্যে বাংলাদেশ ব্যাংক এই নীতিমালা পূর্ণাঙ্গ বাস্তবায়ন করতে চাইলে ব্যাংকগুলোর চলমান ঋণ বিতরণ চ্যালেঞ্জে পড়তে পারে। বিশেষ করে চলতি মূলধন ঋণ, গ্রাহকের পক্ষে আমদানি বিলের অর্থ পরিশোধ ও চলমান বিভিন্ন প্রকল্পে ঋণ বিতরণ বাধাগ্রস্ত হতে পারে। এতে গ্রাহক তথা রফতানিকারক, এসএমই ও করপোরেট গ্রাহকদের তহবিল সংকটে পড়ার আশঙ্কা তৈরি হবে। তখন এই পরিস্থিতি সামাল দেওয়া ব্যাংকগুলোর পক্ষে কঠিন হবে। বিশেষ করে নির্বাচনি বছরে তা আরও কঠিন হবে। তাই বাংলাদেশ ব্যাংকে যদি পরিবর্তিত এডিআর নীতিমালা বাস্তবায়ন করতেই হয়, তবে কমপক্ষে একবছর সময় দিয়ে সেটা বাস্তবায়নে যাওয়া উচিত।
এবিবি’র চিঠিতে বলা হয়, বিকল্পভাবে এডি রেশিও’র বিষয়টি ক্যামেলস রেটিংয়ে অন্তর্ভুক্ত করা যেতে পারে। অর্থাৎ, যাদের এডিআর বেশি হবে তাদের ক্যামেল রেটিংয়ে নেতিবাচক হবে। এছাড়া, ব্যাংকের মূলধন ভিত্তি বাড়াতে টায়ার-২ এর আওতায় সাব-অর্ডিনেটেড বন্ডের যে তহবিল রয়েছে, সেটা এডি রেশিও হিসাবে গণ্য করারও অনুরোধ করেছে এবিবি। একইসঙ্গে অফ ব্যালেন্স শিট আইটেমের বিপরীতে ব্যাংকের যে একশতাংশ প্রভিশন সংরক্ষণ করতে হয়, সেটাতে ছাড় দেওয়ারও দাবি জানানো হয়েছে।
এদিকে, আমানতকারীদের আকর্ষণ করতে নতুন বছরে বেশিরভাগ ব্যাংক আমানতের সুদ হার বাড়িয়ে দিয়েছে। নতুন সুদ হার অনুযায়ী, অগ্রণী ব্যাংক দশমিক ৫০ শতাংশ সুদ বাড়িয়ে ৩ মাস মেয়াদী আমানতে সুদ হার নির্ধারণ করেছে ৫ শতাংশ, ৬ মাস মেয়াদী আমানতে সুদ হার করা হয়েছে ৫ দশমিক ২৫ শতাংশ এবং এক বছর বা এর বেশি মেয়াদী আমানতে সাড়ে ৫ শতাংশ সুদ নির্ধারণ করেছে।
রাষ্ট্রায়ত্ত রূপালী ব্যাংকও তিন মাস মেয়াদী আমানতে সাড়ে ৪ শতাংশ থেকে প্রায় এক শতাংশ বাড়িয়ে ৫ দশমিক ২৫ শতাংশ সুদ দিচ্ছে। ৬ মাস মেয়াদের আমানতে তারা ৪ দশমিক ৭৫ শতাংশের পরিবর্তে সাড়ে ৫ শতাংশ এবং এক বছর মেয়াদীতে ৫ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে ৬ শতাংশ নির্ধারণ করেছে। আর স্বল্প মেয়াদীতে ৩ থেকে বৃদ্ধি করে ৪ শতাংশ এবং সঞ্চয়ী আমানতে সাড়ে ৩ শতাংশের পরিবর্তে ৪ শতাংশ সুদ দিচ্ছে।
২০১৮ সালের শুরু থেকেই সাড়ে ৬ শতাংশ সুদে মেয়াদী আমানত নিচ্ছে ঢাকা ব্যাংক। রাষ্ট্রীয় মালিকানার অগ্রণী ব্যাংক সব ধরনের মেয়াদী আমানতের সুদ হার দশমিক ৫০ শতাংশ বৃদ্ধি করেছে। রূপালী ব্যাংক আমানতে সুদ হার এক শতাংশ পর্যন্ত বৃদ্ধি করেছে। একইভাবে অন্য ব্যাংকগুলোও আমানতে সুদ হার বাড়ানোর প্রস্তুতি নিয়েছে।
এ প্রসঙ্গে রাষ্ট্রায়ত্ত অগ্রণী ব্যাংকের চেয়ারম্যান ও বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (বিআইডিএস) গবেষক ড. জায়েদ বখত বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘বেসরকারি খাতের উদ্যোক্তারা এখন ব্যাংক থেকে ঋণ নেওয়া বাড়িয়ে দিয়েছেন। আর ঋণের চাহিদা বাড়ার কারণে ব্যাংকগুলোর কাছে আমানতের চাহিদা বাড়ছে। তারল্যের চাহিদা পূরণ করতে গিয়ে ব্যাংকগুলো আমানতে সুদের হারও বাড়িয়ে দিয়েছে। এ কারণে ব্যাংক থেকে চলে যাওয়া আমানতকারীরা আবার ব্যাংকের দিকে ফিরতে শুরু করেছে।’
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, অক্টোবর শেষে ব্যাংক খাতে ১০ দশমিক ৫৭ শতাংশ আমানত প্রবৃদ্ধি হয়েছে। এই সময়ে ঋণ বেড়েছে ১৮ দশমিক ৪০ শতাংশ। অবশ্য গত নভেম্বরে বেসরকারি খাতে ঋণের প্রবৃদ্ধি হয়েছে ১৯ দশমিক ০৬ শতাংশ। অক্টোবরে ঋণের প্রবৃদ্ধি ছিল ১৮ দশমিক ৬৩, সেপ্টেম্বরে ছিল ১৯ দশমিক ৪০, আগস্টে ছিল ১৯ দশমিক ৮৪ এবং জুলাইয়ে প্রবৃদ্ধি হয়েছিল ১৬ দশমিক ৯৪ শতাংশ। জুনে ঋণ বৃদ্ধির হার ছিল ১৫ দশমিক ৬৬ শতাংশ।