নজরুলের ছোটগল্পের ভাষা

আহমেদ মাওলা

পূর্ব প্রকাশের পর

এখানে নজরুল যেন নিজের প্রিয়তমার সঙ্গে মুখোমুখি আলাপ করছেন, যেন তাঁর কথা শুনে প্রিয়তমা সত্যি হেসে লুটিয়ে পড়ছেন। এই কণ্ঠ-ভঙ্গি, এটা একান্তই নজরুলীয় ভাষা।
নজরুলের ভাষা-বিদ্রোহের একটা বড় দিক হচ্ছে, শক্তি ও ধ্বংসের আকর হিন্দু দেবদেবী। মুসলমান কবিদের মধ্যে সম্ভবত তিনিই প্রথম ব্যক্তি, যিনি ব্যাপকভাবে হিন্দু দেবদেবী ও পুরাণকে নিজ উদ্দেশ্য সাধনে ব্যবহার করতে সক্ষম হয়েছিলেন। বাংলা ভাষার এই প্রত্ম সম্ভার তাঁর হাতে সম্পূর্ণ নতুন এক মাত্রা লাভ করে
‘রমলা বলল’ ঐ পাখীর কণ্ঠে বৃন্দাবনের কিশোরের আহবান শুনি। ও ত পাখী নয়, ও যে তার হাতের বেণুকা, ওকে বুকে ধরে আমি শ্রীকৃষ্ণের শ্রীকরের স্পর্শ পাই। ওকে যদি হিংসে কর তা’হলে ভাবব, তুমি অসুর, তোমার সাথে আমার কোন সংস্পর্শ থাকবে না। (বনের পাপিয়া)
এই বিনির্মাণ (ফবপড়হংঃৎঁপঃরড়হ) মূলত ভাষারই নতুন সন্দর্ভ (ফরংপড়ঁৎং) যা তিনি ঔপনিবেশের বিরুদ্ধে দাঁড় করিয়েছিলেন। কবিতার ক্ষেত্রে এই ভাষার তড়িৎ উপসি’তি তাঁকে বিদ্রোহী কবি খেতাবের অঙ্গুরী পরিয়েছে। নজরুল মুসলমান ঘরে জন্মেছিলেন বলে হিন্দুদেবদেবী ও পুরাণ নিংড়াতে সামান্যতম দ্বিধান্বিত ছিলেন না। অতীতের অস্ত্র বর্তমানকে ঘায়েল করার যে সাহিত্যশক্তি নজরুল জন্মগতভাবেই আয়ত্তের মধ্যে রেখেছিলেন, তা বাংলা ভাষার এক নতুন বাকচাঞ্চল্য সৃষ্টি করে। এখানেই প্রকৃতপক্ষে নজরুলের বাকবিদ্রোহী কবিচরিত্রের মৌলিকতা লুকিয়ে আছে। নজরুলের ভাষা-বিদ্রোহের অন্যতম দিক হচ্ছে, একই সঙ্গে তৎসম ও লৌকিক শব্দরাজিকে সমকালীন অর্থবহতার অতিরিক্ত অর্থ দান করার মধ্যে। ‘জিনের বাদশা’ গল্পে জিনের নামে লেখা চিঠি-
‘হে নারদ আলী শেখ
তোরে ও তোর বিবিরে বলিতেছি
তোর ম্যায়া চান্ ভানুরে,
চুন্নু ব্যাপারীর পোলা আল্লা-রখার কাছে বিবাহ দে।
তারপর তোরা যদি না দেছ তবে বহুত ফেরেবে পরিবি। তোরা যদি আমার এই পত্রখানা পড়িয়া চুন্নু ব্যাপারীর কাছে প্রথম কছ তবে সে বলিবে কিএরে এইখানা বিবাহ দিবি। তোরা তবু ছারিছ না। তোরা একদিন আল্লা-রাখারে ডাকিয়া আনিয়া আর একজন মুন্সী আনিয়া কলেমা পরাইয়া দিবি।
এখানে লৌকিক শব্দ ‘তোর’ ম্যায়্যা’ ‘পোলা’ ‘দে’ ‘দেছ’ কেছ’ ‘ছারিছনা’ প্রভৃতি।
এবং সাধু ক্রিয়া ‘বলিতেছি’ ‘ডাকিয়া আনিয়া’ ‘পড়াইয়া’ ইত্যাদির পাশে ‘বিবাহ দে’ ‘বিয়ে দে’ নয়, কিংবা ‘কলেমা পরাইয়া দিবি’ ব্যবহার লক্ষণীয়। লৌকিক শব্দের পাশে সাধু ক্রিয়ার ব্যবহার নতুন রস ও অর্থবহতার সঞ্চার করেছে। ‘রাক্ষুসী’ এবং ‘অগ্নিগিরি’ দু’টি গল্পে নজরুল দু’টি বিশেষ অঞ্চলের লৌকিক ভাষাকে অসাধারণ কৃতিত্বের সঙ্গে ব্যবহার করেছেন-
ক. ‘আমার সোয়ামী ছিল সাদাসিধে মানুষ, সে ত সোজা ছাড়া বাঁকা কিছু জানত না। সে চাষ করত, কিরষাণি করত, আমি সারাটি দিন মাছ ধরে চাল কেড়ে ধান ভেনে আনতুম। তা না হলে চলবে কি করে দিদি? তখন আমাদের তিনটি পুষ্যি, বড় ছেলে সোমত্থ হয়ে উঠেছে, বে’ থা না দিলে ‘উপর-নজর’ হবে, মেয়েটাও ঢ্যাং-ঢেঙিয়ে বেড়ে উঠেছিল আর আমার ‘কোলপুঁছা ছোট মেয়েটিও তখন হাঁক্কো হঁক্কো করে দু’একটি কথা ফুটছিল। ছা-পোষা মানুষ হলেও দিদি আমাদের সংসারে ত অভাব ছিল না কোন কিছুর, তোমাদের পাঁচজনের আশীর্বাদে। এই বিন্দিই তখন নাই নাই করে দিনের শেষে তিনটি সের চাল তরকারির জন্যে মাছ রে, শামুক রে, গুগলি রে পিত্থিমির জিনিষ জোগাড় করে আনত।
(রাক্ষুসি।)
খ. ‘সবুর বেরোলেই ছেলেরা আরম্ভ করে-প্যাঁচা রে, তুমি ডাহ! হুই প্যাঁচা মিঞাগো, একডিবার খ্যাচখ্যাচাও গো! রুস্তম কণ্ঠে গান ধরে-
ঠ্যাং চ্যাগাইয়া প্যাঁচা যায়
যাইতে যাইতে খ্যাচ্ খ্যাচায়।
কওয়ারা সব লইল পাছ
প্যাঁচা গিয়া উঠলো গাছ।
প্যাঁচার ভাইশতা কোলা ব্যাং
কইল চাচা দাও মোর ঠ্যাং।
প্যাঁচা কয়, বাপ বারিত যাও।
পাস লইছে সব হাপের ছাও
ইঁদুর জবাই কইর্যা খায়
বোচা নাকে ফ্যাচফ্যাচায়! (অগ্নিগিরি)
ক. উদাহরণে বীরভূমে বাগচাষিদের লৌকিক শব্দ- ‘সোয়ামী’ কিরষাণি’ ‘চাল কেঁড়ে’ ‘ধান ভেনে’ ‘পুষ্যি’ ‘সোমত্থ’ ‘ঢ্যাং- =ঢেঙিয়ে’ ‘কোল পুঁছা’ ‘হাঁক্কো-হাঁক্কো’ ‘পিত্থমির’। এগুলোর অর্থ যথাক্রমে সোয়ামী-স্বামী, কিরষাণি-কৃষিকাজ, চাল কেড়ে-চাল স্বচ্ছ করে, ধান ভেনে-ধানের খোসা ছাড়ানো, পুষ্যি-পোষা, সোমত্থ-উপযুক্ত, বে’থা-বিয়ে করা, ঢ্যাং-ঢেঙিয়ে-দ্রুত বেড়ে ওঠা, কোলপুঁছা-শেষ সন্তান, হাঁক্কো-হাঁক্কো-শব্দ করে কথা বলা পিত্থিমির-পৃথিবীর। নজরুল উপর্যুক্ত শব্দগুলোকে এমনভাবে প্রয়োগ করেছেন যে, বুঝতে কোনো অসুবিধা হয় না। বীরভূমের বাগচাষির বৌ বিন্দির মুখ থেকে অনায়াসে নজরুলের কলমের ডগায় উঠে এসেছে।
খ. উদাহরণে নজরুল ব্যবহার করেছেন ময়মনসিংহের দরিরামপুর ত্রিশালের আঞ্চলিক ভাষা। গল্পে যদিও বীররামপুর গ্রাম, বলে স’ানের উল্লেখ করা হয়েছে কিন’ ‘গফর গাঁও’ এবং ‘ময়মনসিংহ’ নাম থেকে স্পষ্ট হয় যে, এটি মূলত দরিরামপুরেরই ঘটনা। গল্পের প্রয়োজনে ‘দরিরামপুর’ ‘বীররামপুর’ হয়েছে। আমরা জানি নজরুল কৈশোরের কিছু দিন ময়মনসিংহের দরিরামপুর লেখাপড়া করেছিলেন। সেই সময় দেখা কোনো ঘটনা হয়ত তাঁর কিশোর মনে দাগ কেটে থাকবে। গল্পে নিরীহ মাদ্রাসা পড়-য়া এক ছাত্র গ্রামের দুষ্ট ছেলের অকথ্য অত্যাচারে অতিষ্ঠ হয়ে এবং ছাত্রী নূরজাহানের কিঞ্চিত ভৎসনায় সবুরের পৌরুষ জেগে ওঠে।
দুষ্ট ছেলেদের অত্যাচারের জবাব দিতে গিয়ে ধস্তাধস্তির সময় দুষ্ট ছেলেদের একজন নিজ ছুরির আঘাতে মারা যায়। এই অপরাধে সবুরের সাত বছরের জেল হয়। নজরুল এ গল্পে যে ভাষিক মাত্রা যোগ করেছিলেন, তা হচ্ছে আঞ্চলিক ডায়লেক্ট। যেমন, ‘প্যাঁচা রে, তুমি ডাহ! হুই প্যাঁচা মিঞাগো, একডিবার খ্যাচখ্যাচাও!’ এবং ঢ়যৎধংব ্ রফরড়স- এর ব্যবহার-
ঠ্যাং চ্যাগাইয়া প্যাঁচা যায়
যাইতে যাইতে খ্যাচ্ খ্যাচায়
কাওয়ারা সব লইল পাছ
প্যাঁচা গিয়া উঠলো গাছ।
এই শব্দগুচ্ছ, বাক্রীতি এবং ছন্দ মিল এক অসাধারণ ভাষা-শিল্পীর প্রযত্ম প্রয়াসকে স্বাক্ষরিত করে। নজরুলের ব্যঙ্গ রচনায় এই বাক্রীতির স্বচ্ছন্দ ব্যবহার আমরা দেখেছি কিন’ গল্পের এই পটভূমিতে তা আশ্চর্য এক নতুন জীবন লাভ করেছে।
নজরুলের আকস্মিক আবির্ভাব যে দীপ্তি সমসাময়িকদের চোখ ধাঁধিয়ে দিয়েছিল তা হচ্ছে, তাঁর আরবি, ফারসি শব্দের সার্থক ব্যবহার।
নজরুলের পূর্বে সত্যেন্দ্রনাথ দত্ত, মহিতলাল মজুমদারও আরবি, ফারসি শব্দ প্রচুর ব্যবহার করেছেন, কিন’ সে প্রয়োগ ছিল তাঁদের ইচ্ছা পূরণের হাতিয়ার, কেবল, তাঁদের হাতে আরবি, ফারসি, শব্দ কখনো পুনর্জীবন লাভ করেনি। তাঁরা এমন অনেক আরবি, ফারসী শব্দ কবিতায় ব্যবহার করেছেন, যেগুলোর প্রয়োগ যথার্থ নয়। উদাহারণ উপসি’ত করা যায় কিন’ তাতে পরিসরই কেবল দীর্ঘতর হবে। নজরুল ইসলাম, আরবি, উর্দু ফারসি শব্দ ব্যবহার করেছেন জেনে, বুঝে, যথার্থ প্রাসঙ্গিকতায় ও সার্থকভাবে।
যেমন-
ক.বহুৎ দাগা দিয়া তু বেরহম কৌন হে? ’খাড়া রহো্! হিলো মৎ!’ ( রিক্তের বেদন) কিংবা ’গরদেশীয় রে, তুহার দেশ কাঁহা’ (বাদল বরিষণে)
খ. আজ এই পুরো দুটো বছর ধরে ভাবছি আর সব চেয়ে আশ্চার্যান্বিত হচ্ছি, লোকে আমাকে দেখলেই এমন করে ছুটে পালায় কেন! পুরুষেরা যাঁরা সব পর্দার আড়ালে গিয়ে মেয়ে-মহলে খুব জাঁদরেলি রকমের শোরগোল আর হল্লা করেন, আর যাঁদের সেই বিদঘুটে চেঁচানির চোটে ছেলেমেয়েরা ভয়ে ’নফসি’ ’নফসি’ করে, সেই মন্দরাই আবার দেখলে হুঁকো হাতে দাওয়া হ’তে আস্তে আস্তে সরে পড়েন, তখন নাকি তাদের অন্দরমহলে যাবার ভয়ানক ’হাজত’ হয়। (রাক্ষুসী।)
গ. আজকার প্রভাতের সঙ্গে শহরে আবির্ভূত হয়েছে এক অচেনা দরবেশ। সাগর মন’নের মত হুজুগে, লোকের কোলাহল উঠেছে পথে, ঘাটে, মাঠে-বাইরের সব জায়গায়। অন্তঃপুরচারিনী অসূর্যস্পশ্যা জেনানাদের হেরেম্ তেমনি নিস্তব্ধ নীরব, যেমন রোজই থাকে দুনিয়ার কলরব ‘হ-য-ব-র-ল-’র একটেরে! বাইরে উঠছে কোলাহল-ভিতরে ছুটছে স্পন্দন!… শহরের কাজী শুনলেন সব কথা। তিনিও ধন্না দিতে শুরু করলেন দরবেশের কাছে। দরবেশ বুঝলেন, এ ক্রমে ‘কমলিই ছোড় তা নেই’ গোছের হয়ে দাঁড়াচ্ছে। তাঁর মুখে ফুটে উঠল ক্লান্ত সদয হাসির ঈষৎ রেখা।…… দরবেশ বললেন, ‘শুন কাজী সাহেব, আমি যা বলব তাই করতে পারবে? কাজী সাহেব আস্ফালন করে উঠলেন, হাঁ হুজুর বান্দা হাজির।
দরবেশ হাসলে, তারপর বললে, দেখ, কাল জুম্মা। মুল্লুুকের বাদশা আসছেন এখানে। নামাজ পড়বার সময় তোমায় ইমামতি করতে বলবেন। তুমি সেই সময একটা কাজ করতে পারবে? কাজী সাহেব বলে উঠলেন, আলবৎ হুজুর, আলবৎ! কি করতে হবে? (সালেক)
উপর্যুক্ত ‘ক’ উদাহরণে পুরো বাক্যই উদু। সংলাপ হিসেবে এটি ব্যবহৃত হয়েছে।
‘খ’ উদাহরণ, লৌকিক বা আঞ্চলিক ডালেক্টের মধ্যেও আরবি, ফারসি শব্দ স্বাভাবিক কথনে সুন্দরভাবে ব্যবহৃত হয়েছে- ‘মহলে’ গৃহে বা অন্দরে, ‘জাঁদরেলি’ ‘মস্ত বা বিরাটত্ব’ ‘শোরগোল’ হৈ চৈ’ বা গণ্ডগোল, ‘নফসি’ ‘নফসি’ আপন অস্তিত্ব সংকটে উচ্চারিত সৃষ্টিকর্তার স্মরণ, ‘মদ্দরাই’ পুরুষেরাই। এবং ‘গ’ উদাহরণেও অনুরূপ শব্দ ব্যবহার লক্ষ্যণীয়-‘হুজুগে’ গুজবে’ ‘জেনানাদের’ অসূর্যস্মশ্যা রমণী’ যারা গুপ্ত অঙ্গের মত নিজেদেরকে পর পুরষের দৃষ্টি থেকে আড়াল করে রাখে, অর্থাৎ অন্তঃপুরবাসিনী, ‘হেরেম্’ অন্তঃপুর, যে গৃহের গোপনীয়তা অক্ষুণ্ন থাকে। ‘দুনিয়ার’ পৃথিবীর, ‘কাজী’ বিচারক বা বিধান কর্তা, ‘দরবেশ’ সাধক বা কামেল ব্যক্তি, ‘আমল’ চরিতার্থ করা, ‘নাছোড়বান্দা’ ‘নাছোড়’ অর্থ ছাড়েন না বা রেহাই দেন না এমন, ফারসি ক্রিয়ায় ‘না’ সাধারনত আগে বসে, বাংলায় হুবহু এ ধরন্তের অবিষকৃত ক্রিয়া আরো আছে, যেমন, ‘নাফরমান’ ‘অকৃতজ্ঞ’ ‘নাযায়েজ’ অসিদ্ধ ইত্যাদি। ‘বান্দা’ যে স্রষ্টার বন্দেগী করে। এখানে ‘নাছোড়বান্দা’ শব্দটি নজরুল আশ্চর্য বিশিষ্টতার ব্যবহার। করেছেন। ‘হাঁ হুজুর বান্দা হাজির’ পুরো বাক্যটিই ফারসি যার অর্থ হাঁ মহাশয়, আমি উপস্তিত।
‘জুম্মা শুক্রবারে মসজিদে সমবেত হয়ে আদায় করা নামায। ‘মুল্লুকের বাদশা’ দেশের রাজা। ‘নামাজ’ এবং ‘ইমামতি’ আরবি, ফারসি উভয় ভাষার ব্যবহৃত শব্দ। ‘আলবৎ হুজর’ অবশ্যই মহাশয়। উপর্যুক্ত শব্দার্থ থেকে বোঝা যায় নজরুল ইসলাম কত সার্থকতা ও দক্ষতার সঙ্গে আরবি, ফারসি শব্দ ব্যবহার করেছেন। ক. ‘ভোর হ’ল।
বনে বনে বিহগের ব্যাকুল কূজন বনান্তরে গিয়ে তার প্রতিধ্বনি রেশ রেখে এল! সবুজ শাখির শাখার শাখায় পাতার কোলে ফুল ফুটলো! মলয় এল বুল্বুলির সাথে শিস্ দিতে দিতে। ভ্রমর এল পরিমল আর পরাগ মেখে শ্যামার গজল-গানের সাথে হাওয়ার দাদরা তালের তালে তালে নাচতে নাচতে। কোয়েল, দোয়েল, পাপিয়া, সব মিলে সমস্বরে গান ধ’রলে- ওহে সুন্দর মরি মরি! তোমায় কি দিয়ে বরণ করি’
অচিন কার কণ্ঠ-ভরা ভৈরবীর মীর মোচড় খেয়ে উঠল-‘জাগো পুরবাসী’!
সুষুপ্ত বিশ্ব গা-মোড়া দিয়ে তারই জাগরণে সাড়া দিলে!……..
তুমি সুন্দর, তাই নিখিল বিশ্ব সুন্দর শোভাময়।’ পড়ে রইলুম কেবল আমি উদাস আনমনে, আমার এই অবসাদ-ভরা বিষণ্ন দেহ ধরার বুকে নিতান্ত সস্কুচিত গোপন করে, হাস্যমুখরা তরল উষার গালের একটেরে এক কণা অশুষ্ক অশ্রুর মত! অথচ এই যে এক বিন্দু অশ্রুর খরচ, তা উষা-বালা নিজেই পারেনা, গত নিশি খোয়াবের খামখেয়ালিতে কখন যে সে কার বিচ্ছেদ-ব্যথা কল্পনা করে কেঁদেছে! আর তারই এক রতি স্মৃতি তার পান্ডুর কপোলে পূত ম্লানিমার ঈষৎ আঁচড় কেটে রেখেছে! (ঘুমের ঘোরে)
খ. হিন্দোলার কিশোরীরা গাচ্ছিল কাজল-মেঘের আর নীল আকাশের গান। নিচে শ্যামল দুর্বায় দাঁড়িয়ে বিনুনী-বেণী-দোলানো সুন্দরীরা মৃহদের তাল দিয়ে গাচ্ছিল কচি ঘাসের আর সবুজ ধানের গান। তাদের প্রাণে মেঘের কথার ছোঁওয়া লেগেছিল।
….. মেঘের এই মহোৎসব দেখে আপনি আমার চোখে জল ঘনিয়ে এল। দেখলাম সেই কালো কাজরিয়া দোলনা ছেড়ে আমার পানে সজল চোখের চেনা চাউনি নিয়ে চেয়ে আছে।
আমার চোখে চোখ পড়তেই সে এক নিমিষে দোলনায় উঠে ক’য়ে উঠলো,-‘সজ্নিয় গে, ও গুগি সুন্দর পরদেশিয়া!’ আর সেই মতিয়া দুলতে দুলতে বাদল-ধারায় এক রাশ হাসি ছড়িয়ে দিয়ে বলল,-হা রে কাজরিয়া, তুহার সাঁবলিয়!; (বাদল-বরিষণে)
উপর্যুক্ত দুটি উদাহরণে দেখতে পাই আবেগের সঙ্গে কল্পনার মিশ্রণ ঘটেছে। আবেগময় ভাষার বৈশিষ্ট্য হচ্ছে ভাষা-কাব্য-গন্ধি হওয়া, যেমন-‘বনে বনে বিগহের ব্যাকুল কূজন’ ‘মলয় এল বুল্বুলির সাথে শিস্ দিতে দিতে’ ‘ভ্রমর এল পরিমল আর পরাগ মেখে, কিংবা ‘কাজল- মেয়ের আর আকাশের গান, ‘প্রাণে মেঘের কথায় ছোঁওয়া’-এই বাক্যাংশে আবেগ মূর্তমান-‘ভ্রমর এর পরিমল অর্থাৎ পুষ্প-চন্দন সুগদ্ধি আর পরাগ (ফুলের রেণু) মেখে, এবং ‘প্রাণে মেঘের কথা’ এই ঢ়বৎংড়হরভরপধঃরড়হ বা মানবায়ন কাব্যিক অভিব্যক্তিই প্রকাশ করে। প্রকৃতির সঙ্গে মানব মনের কল্পনার মিশ্রণে ভাষার ঐশ্বর্য সৃষ্টি হয়েছে। রবীন্দ্রনাথের গল্পগুচ্ছেও আমরা প্রকৃতির সঙ্গে মানব মনের সমান্তরাল অনুভূতির প্রকাশ দেখতে পেয়েছি এবং সেখানেও ভাষা কাব্যিক হয়ে ওঠেছে। নজরুলের গল্প-ভাষায় আবেগ, প্রকৃতির আশ্রয়ে স্ফূর্তি লাভ করেছে-‘ সে নিল এমনি এক চাঁদনি-চ”র্িচত যামিনী, যাতে আপনি দায়িতের কথা মনে হযে মর্ম্মতলে দরদের সৃষ্টি করে।
মদির খোশবুর মাদকতায় মল্লিকা মালতীর মঞ্জুল মঞ্জুরীমালা মলয় মারুতকে মাতিয়ে তুলেছিল। উগ্র রজনীগন্ধার উদাস সুবাস অব্যক্ত অজানা একটা আশস্কায় বক্ষ ভরে তুলে দিল।’ (ঘুমের ঘোরে) এভাবে নজরুল গল্প-ভাষায় আবেগের প্রবহমান স্রোতের দৃষ্টিগ্রাহ্য ও ইন্দ্রীয়গ্রাহ্য মূর্তি নির্মাণ করেছেন।
নজরুলের ভাষা-বিদ্রোহের আরেকটি ইঙ্গিতময় বিষয় হচ্ছে প্রেম ধারণা। এ ধারণার পুরোটাই তিনি গ্রহণ করেছিলেন ফারসী কবিতায় পাঠ থেকে এর সঙ্গে যোগ হয়েছিল তার সৈনিক জীবনের স্বল্পকালীন প্রবাসজীবনের অভিজ্ঞতা।
তাঁর গানে প্রেম সবচেয়ে বেশি উত্থাপিত হলেও গল্পে প্রেম ধারণার প্রকাশ মনকনময়, কল্পনা নির্ভর দ্বিবাচনিকতায়। তাঁর প্রেমক ধারণা এক কেন্দ্রিক, আধ্যাত্মিক, আইডিয়ালাইজ বা আদর্শায়িত। লাইলী-মজনুর প্রেমের মত, সে প্রেমে দেহের স’ান নেই। প্রায় গল্পে প্রেমের বেদনা, হয় নায়ককে বৃহত্তর কর্তব্যবোধে উদ্বুদ্ধ করেছে (সাধারণত সেই কতৃব্যবোধ যুদ্ধগমনের মধ্যেই সীমাবদ্ধ) অথবা প্রিয়ার স্মৃতিকে ঘিরে নায়কের মধ্যে একটা ধ্যান-তন্ময়তার জন্ম দিয়েছে।
এই ধ্যান-তন্ময়তাই হচ্ছে সেই প্রেমধর্মের উপাসনা, যার মধ্য দিয়ে পরম-প্রিয়ের সঙ্গে মিলিত হওয়া যায় বলে এককালে একশ্রেণির কবি-সাধকের ধারণা ছিল। এটি আরো স্পষ্ট হয় তখন আমরা দেখি,প্রিয়-নারী ছাড়া প্রায় গল্পে অন্য কোনো নারী-চরিত্র নেই। দৃষ্টির এই বিহবলতার কারণে ভাষা হয়ে উঠেছে স্বপ্নাচ্ছন্ন-
ক. ‘আঙুরের ডাঁসা থোকাগুলো রসে আর লাবণ্যে ঢলঢল করছে পরিস্তানের নিটোল স্বাস’্য ষোড়শী বাদশাজাদীর মত। নাশপাতিগুলো রাঙিয়ে উঠেছে সুন্দরীদের শরম-রঞ্জিত হিঙুল গালের মত। রস প্রাচুর্য়ের প্রভাবে ডালিমের দানাগুলো ফেটে বেরিয়েছে কিশোরীদের অমিমানে স্ফুরিত টুকটুকে অরুণ অধরের মত।’ (ব্যথার দান)
খ. ঐ চাঁদ যেন কৃষ্ণ, পদ্মা সেযে রাধা,-ওর ঢেউ যেন নীল শাড়ি, কৃষ্ণকে দেখে ওর সারা দেহে প্রাণে যে নাচন লেগেছে। (বনের পাপিয়া)
গ. আর এই একটু আগে বৃষ্টির জলে-ধোয়া স্বচ্ছ নীল আসমানটি দেখছি, আর মনে পড়ছে সেই ফারসি তরুণীটির ফাঁক-ফাঁক নীল চোখ দুটি। পাহাড়ে ঐ চমরী মৃগ দেখে তার সেই থোকা থোকা কোঁকড়ানো রেশমী চুলগুলো মনে পড়ছে। আর এ যে পাকা আঙুর ঢলঢল করছে, অমনি স্বচ্ছ তার চোখের জল।’ (হেনা)
প্রেমাবেগের কারণে ভাষা স্বপ্নময়, কোমল, রঙিন, ভাববিহবল পরিবেশ আত্ম-রঞ্জিত। হৃদয়-রঙে রঙিন হয়ে উঠেছে প্রকৃতি। তাই আঙুরগুলো রসে, লাবণ্যে ঢলঢল করছে, নাশপাতিগুলো, শরম-রঞ্জিত হিঙুল গালের মত, কিংবা রস প্রাচুর্য্যে ডালিম ফেটে পড়েছে কিশোরীর রাঙা ঠোঁটের মত। এই অসাধারণ, উপমা চিত্রময় রূপের ভাষা নজরুলের গল্পকে করেছে বৈশিষ্ঠমণ্ডিত।