ধূমপান নিয়ন্ত্রণ নয়, পরিহার করুন

শহিদ রাসেল

সকাল ৮টা। হনহন করে পাবলিক প্লেসে হেঁটে যাচ্ছেন এক ভদ্রলোক। হাতে সিগারেট। কিছুক্ষণ পর পরই ফুঁকছেন আর মজা করে সিগেরেটের ধোঁয়া ছাড়ছেন। সহজেই অনুমেয় তিনি অফিসে যাচ্ছেন। অবশ্যই রাস্তায় তিনি একা নন। তার চারপাশেই আবাল-বৃদ্ধ-বনিতা।
কেউ রুমাল চেপে আত্মরক্ষার চেষ্টা করছেন কেউ হাঁটার গতি বাড়িয়ে আগে আগে চলছেন, কেউ ঘৃণার চোখে তাকিয়ে আছে আর কেউ-বা কিছুক্ষণের জন্য দম বন্ধ করে আছেন।
কিন্তু কোমলমতি শিশু বা তাদের অভিভাবকরা সহ্য করে যাচ্ছেন ভদ্রলোকের অভদ্র আ-কাম। ধূমপায়ীকে সরাসরি কিছুই বলার নেই। সবাই নির্দিষ্ট সময়ে গন্তব্যে পৌঁছাতে ব্যস্ত। অফিসের বস্‌, রিকশাচালক, বাড়ির কর্তা, হুজুর, শিক্ষক, দোকানি বা জ্ঞানীজন প্রায় সব শ্রেণী পেশার মানুষই জেনে না জেনে এই ধোঁয়া ছাড়ার কাজটি করে যান সমানে। শুনতে খুব খারাপ লাগে, কষ্ট হয়, যখন কেউ বলে, ‘সব ছাড়তে পারবো কিন্তু সিগারেট নয়।’
ধুমপানরত কাউকে সালাম দেয়াটা কতটা বিব্রতকর, কদমবুচি করাটা কতটা বিপজ্জনক তা বলে শেষ করা যাবে না। গত ২৮ মার্চ ২০১৬ তারিখে দৈনিক আজাদীর শিরোনাম ‘জ্বলন্ত সিগারেট হাতে ঘুমাতে গিয়ে…’ নিউজ পড়ে ধূমপায়ীদের একবার হলেও পিলে চমকে উঠবে।
এছাড়া নীরব ঘাতক এই সিগারেটের জন্য সংসার-সমাজ তথা রাষ্ট্রের বিশাল ক্ষতি নিয়ত বাড়ছেই।
কারো কারো ক্ষেত্রে এই কুঅভ্যাসটি এতই মারাত্মক যে, ধূম না ছাড়লে প্রাতঃক্রিয়াদি ঠিকমতো হয় না। অর্থাৎ খালি পেটে পানি খাওয়ার আগেই তার ‘প্রেয়সী’ সিগারেটে মগ্ন হতে হয়। পরিবারের বড়কর্তার এ চিত্রটি পরিবারের অন্য সদস্যদের জন্য বেশ করুণাদায়ক।
আমার কর্মস্থল মেডিকেল কলেজ হওয়ার সুবাদে ডাক্তারদের সাথে ওঠা-বসা নিয়ত ব্যাপার। অবাক লাগে যখন দেখি দেশের একটি প্রথম সারির মেডিকেলের একটি জরুরি বিভাগের প্রভাবশালী কতিপয় ডাক্তার প্রতিদিনই সিগারেট হাতে একটি নির্দিষ্ট সময় পার করেন। এই ঘটনার পর আর কী বলার থাকে।
একজন সেবক অবলীলায় সিগেরেটের ধোঁয়া ছেড়ে যান রোগীদের মাঝে, মৃত্যুর ক্ষণ গোনা শিশু(আইসিইউ) ও মহিলার(গাইনি) নিঃশ্বাসে। দৃশ্যটি এতটাই নিয়মিত যে ডিপার্টমেন্টসহ সবার সয়ে গেছে। কেউ আর মাথা ঘামায় না।
এছাড়া বিশেষ দিবস উদযাপন, উৎসব-হৈহুল্লুড়ে তরুণ যুবাদের অন্যতম আইটেম হলো সিগারেট। ঐদিনগুলোতে প্রতিদিনের চেয়ে নামি-দামি বিদেশি সিগারেট থাকবেই।
কেউ উপদেশ বা বাধা দিতে গেলে স্বাধীনতার রকমারি সংজ্ঞা শুনতে হবে। এতেও যদি কাজ না হয় তবে নির্মমভাবে উপদেশদাতা বা সাহসী কণ্ঠকে অপমানিত করতে হবে।
সৃষ্টিশীল কাজের ক্ষেত্রে লেখালেখি আমার কাছে দারুণ লাগে। সেই স্কুল জীবন থেকেই বিভিন্ন স্থানীয় ও জাতীয় পত্রিকায় কন্ট্রিবিউটর তথা নাগরিক সাংবাদিকতায় জড়িয়ে আছি। তাই বিকেল থেকে রাত অবধি পত্রিকা অফিসে সময় পার করি।
কিছুদিন আগে চট্টগ্রামের একটি দৈনিকে সহ-সম্পাদক পদে দায়িত্বরত অবস্থায় আমার এক সিনিয়র বললেন যে, তিনি এমন কোনো কবি দেখেননি যার শরীর থেকে ধোঁয়ার গন্ধ আসে না। শুনে মনটা খুব খারাপ হয়ে গেল আর ভিতরে ভিতরে অপমানবোধ কাজ করলো। তবে তার ভুল ভাঙাতে সেদিন প্রায় দু’ঘণ্টাব্যাপী তর্কবিতর্কে লিপ্ত ছিলাম। শেষে তিনি স্বীকার করলেন যে, সবাই নয় বেশিরভাগ কবিই ধূমপান করেন।
স্বাধীনতার সহজ সংজ্ঞা দাঁড় করালে বলা যায়, অন্য কারো ক্ষতিসাধন না করে নিজের জীবনকে নিজের মতো করে গড়ে তোলার সুন্দর পরিবেশ বিরাজ করাই স্বাধীনতা। কিন্তু যারা ধুমপান করেন তাদের জরিমানা করার কথা সরকারি কেতাবে লেখা থাকলেও আইনকর্মকর্তা বা সাংবাদিক, যারা এই বিষয়টি তুলে ধরবে, তারাই তো ধুমপানে অভ্যস্ত।
আসুন, দেশ ও জাতীয় স্বার্থে, জনগণ ও সুন্দর পরিবেশের স্বার্থে কিছুটা ত্যাগ স্বীকার করি। ধূমপান বিসর্জন দিয়ে আমরা তা করতে পারি। আপনি সুস্থ, সজীব থাকবেন, কর্মক্ষমতা আপনাকে গতি দেবে। পারিবারের সদস্যদের নিয়ে আপনি অন্য একটি আবহ গড়ে তুলতে পারবেন। ধূমপান ছেড়ে দিলে আপনার দৈহিক-মানসিক পরিবর্তন আপনাকে শ্রীময় করে তুলবে।
লেখক : কবি ও সাংবাদিক

আপনার মন্তব্য লিখুন