ধর্ষণ মামলায় কেন আপসে বাধ্য হয় বাদিপড়্গ

সুপ্রভাত ডেস্ক

ধর্ষণের ভিডিও চিত্র সেলফোনে ধারণ করে ওই ভিডিও ইন্টারনেটে ছড়িয়ে দেওয়ার ভয় দেখিয়ে টাঙ্গাইলের সখীপুরে এক স্কুলছাত্রীকে ধর্ষণের অভিযোগ ওঠে। মামলাও হয়। ততদিনে সেই শিড়্গার্থী অনত্মঃসত্ত্বা (১৯ সপ্তাহ) হয়ে পড়েন। অভিযোগ ছিল ওই বছর ফেব্রম্নয়ারি মাসে সেই স্কুলছাত্রী ধর্ষকের বাড়িতে বেড়াতে যায়। ওই বাড়িতে কেউ না থাকার সুযোগে ধর্ষক মেয়েটিকে ধর্ষণ করে। খবর বাংলা ট্রিবিউন।
ধর্ষণের ভিডিও সেলফোনে ধারণও করে সে। ওই ভিডিও ইন্টারনেটের মাধ্যমে ছড়িয়ে দেওয়ার হুমকি দিয়ে ধর্ষক একাধিকবার ধর্ষণ করে। মামলার খোঁজ নিতে গিয়ে দেখা যায় গত সেপ্টেম্বরে মামলা হওয়া এই ঘটনার পর এখন সেই ধর্ষণকারীর সঙ্গে সংসার করছেন ধর্ষণের শিকার শিড়্গার্থী।
মামলার বিষয়ে অগ্রগতি জানতে ভুক্তভোগীর সঙ্গে যোগাযোগ করলে জানা যায়, তারা এখন সংসার করছেন। তাদের অনুরোধ আগে কী ঘটেছে তা নিয়ে যেন আর নাড়াচাড়া না করা হয়। ভিকটিম জানায়, এই আপসের মধ্য দিয়ে যদি তার সংসারটি না হতো তাহলে সমাজে তিনি ‘মুখ দেখানোর যোগ্য’ থাকতেন না। পরিবারের চাপে তিনি বিয়ের সিদ্ধানত্ম নেন।
রাজশাহীর আরেক ধর্ষণের ঘটনায় ধর্ষণের শিকার নারী মামলা করেন। ধর্ষক পলাতক। এরপর মামলা তুলে নিয়ে এলাকা ত্যাগ করে ধর্ষণের শিকার সেই পরিবার। ধর্ষণের ঘটনার পরও বিচার না চেয়ে মামলা তুলে নেওয়ার বিষয়ে ভিকটিমের মামা বলেন, যা ঘটেছে এরপর এলাকার ড়্গমতাশালীদের বিরম্নদ্ধে দাঁড়িয়ে মামলা চালিয়ে নেওয়া সম্ভব না। মেয়ের যা ড়্গতি হওয়ার হয়েছে, এখন কিছু টাকা দিয়ে যদি তার জীবনে কিছু করে খাওয়ার ব্যবস’া কথা যায় সেজন্য দুই পরিবার মিলে আপস করা হয়েছে।
ধর্ষণের ঘটনায় প্রায়ই সামাজিক ও পারিবারিক পরিসরে আপসের কথা শোনা যায়। কেবল দুই পরিবারে বিয়ে দিয়ে দেয় এমন নয়। স’ানীয় মেম্বার-চেয়ারম্যানসহ সমাজপতিরা যেমন থাকেন তেমন কখনও কখনও আইনজীবী ও আইনশৃঙ্খলারড়্গাকারী বাহিনীও যুক্ত থাকে এবং আসামি আর ধর্ষণের শিকার নারীর বিয়ের ব্যবস’া পর্যনত্ম করে থাকেন।
ধর্ষণের মামলা নিয়ে কাজ করেন এমন সরকারি আইনজীবীরা বলছেন, কোনও কোনও মামলায় ভেতরে ভেতরে আসামি ও বাদী আপসের বিষয়টা ঠিক করে নেন তারা সেটি বুঝতে পারেন। একজন সরকারি আইনজীবী বলেন, ‘যখন দেখি কেউ সাড়্গী দিতে চায় না, বাদী আগ্রহ হারিয়ে ফেলেছে তখন বোঝা যায় বাইরে বাইরে সমঝোতা হয়েছে। তখন কোনও কোনও ড়্গেত্রে আদালতের সঙ্গে পরামর্শক্রমে আমরা তাদেরকে কাস্টডিতে নিয়ে বড় অংকের টাকা ড়্গতিপূরণ হিসেবে দিতে বাধ্য করি। ওই টাকা ভিকটিমকে দিলেই কেবল আপস হবে। এরকম ঘটনা ঘটে।’
কিন’ এধরনের অপরাধে আপস হওয়া উচিত নয় উলেস্নখ করে রাজশাহীর নারী শিশু নির্যাতনের দ্রম্নত বিচার আদালতের আইনজীবী এনত্মাজুল হক বলেন, অনেকসময় ভিকটিম দলবদ্ধ ধর্ষণের শিকার হয়েছে প্রমাণ থাকা সত্ত্বেও মামলা আপসে যেতে দেখেছি। অধিকাংশ ড়্গেত্রে এটি ঘটে তখনই যখন নির্যাতনের শিকার মেয়েটি গরিব হয়। তারা আদালতের বাইরে সমঝোতায় বসতে বাধ্য হয়, এটি বাসত্মবতা। তখন মেয়েটি ধর্ষণ হয়েছে বললেও কোনও সাড়্গী পাওয়া যায় না।’ তিনি আরও বলেন, ‘মামলাগুলো আপসযোগ্য না। আপস ঠেকাতে রাষ্ট্রপড়্গকে কড়া নজরদারি রাখতে হবে। উল্টো সাড়্গ্য দিলে সাড়্গীকে বৈরী ঘোষণা করতে হবে।’
মানবাধিকার আইনজীবীরা বলছেন, বিচারে দেরি হলে আপস-সমঝোতার চাপ বাড়ে। সামাজিকভাবে হেয় হওয়ার ভয়ে আপসে রাজি হয়। ধর্ষকের হুমকি ধমকিও একটি অন্যতম কারণ।
সরকার পড়্গের আইনজীবী পাবলিক প্রসিকিউটর আব্দুলস্নাহ আবু বলেন, ‘আপস করতে চায় যে কারণগুলোর জন্য তার বেশিরভাগই ভিকটিমের জন্য অপমানজনক। কিন’ সামাজিক বাসত্মবতায় তাকে সহযোগিতা করে তার এই কারণগুলো দূর করবে এমন কেউ থাকে না পাশে। ফলে পরিবারও চাপগুলো সহ্য করতে পারে না। এ পরিসি’তিতে নিজেরা নিজেরা সমঝোতা করে নিজেদের প্রয়োজন অনুযায়ী সিদ্ধানত্ম নিয়ে নেয়। আদালতের খুব বেশি কিছু করার থাকে না। সমঝোতার ভেতরে আর্থিক লেনদেনের পরিমাণ বেশি। বিবাহিত সম্পর্ক স’াপনের কথা শোনা যায় তবে সেই হার কম।’ আইনজীবীরা এসব ড়্গেত্রে যুক্ত থাকেন কিনা প্রশ্নে তিনি বলেন, ‘সরকারের আইনজীবীর এখানে সম্পৃক্ততা থাকে না কিন’ সমঝোতার সিদ্ধানেত্মর পর আসামির আইনজীবীর পরামর্শ মতোই তারা কাজ করে।’
সমঝোতা করে কেন প্রশ্নে উইক্যান বাংলাদেশের জাতীয় সমন্বয়ক জিনাত আরা হক বলেন, ‘ধর্ষণের শিকার হলে সেই নারী ও তার পরিবারের সম্মানহানি ঘটেছে এবং তাদের স্বাভাবিক জীবন নেই বলে সমাজে প্রতিষ্ঠিত ধারণা থাকার কারণে বিচার চাওয়ার চেয়ে ধর্ষণের ঘটনাটি তাড়াতাড়ি ভুলে যাওয়া এবং ধামাচাপা দেওয়ার প্রবণতা তৈরি হয়। সেই জায়গা থেকে সমঝোতা করা হয়। ধর্ষকের সঙ্গে বিয়ে দেওয়ার পর ধর্ষক সেই নারীকে নির্যাতন করছে, বিবাহবিচ্ছেদ ঘটছে কিন’ তারপরও ধর্ষণের ঘটনাটি সামনে থাকছে না। তারপরও ভুক্তভোগী ও তার পরিবারের টিকে থাকার জন্য সেটি জরম্নরি হয়ে যায়।’
তিনি বলেন, ‘ঘটনার শুরম্নতে শারীরিক মানসিক ড়্গতটা বেশি থাকায় বিচার হয়তো চায় কিন’ সময় যত যায় সেই ঘটনার মুখোমুখি আর হতে চায় না। আমাদের সামনে যদি ধর্ষণের শিকার নারীর পুনর্বাসন ও লড়াইয়ের ইতিবাচক উদাহরণ অনেক বেশি থাকতো তাহলে সমঝোতা না করে বিচার চাওয়ার প্রবণতা বাড়তো।’