ধর্ষণের বিরুদ্ধে সামাজিক আন্দোলন গড়ে তুলুন

সফিক চৌধুরী

গতকাল থেকে পুরো দেশ ভাসছে টেস্ট ক্রিকেটে বাংলাদেশের অস্ট্রেলিয়াকে হারানোর আনন্দে। আবার ওদিকে একদিন পরেই মুসলমানদের পবিত্র কোরবানির ঈদ। কিন্তু, এ সব কিছুর মাঝেও গতকালের পত্রিকা খুলতেই বুকটা দুমড়ে মুচড়ে যায়, আমাদের বিবেক আর মনুষ্যত্ব কোথায় নেমেছে? মাথা হেঁট হয়ে যায় বগুড়া থেকে ময়মনসিংহ ফেরার পথে চলন্ত বাসে এক তরুণীকে ধর্ষণের পর হত্যার পৈশাচিক সংবাদে।
এ ঘটনা আমাদের মাঝে শংকা তৈরি করেছে। আমরা আরও শংকিত, কারণ এমন বিবেকবর্জিত পৈশাচিক ঘটনার পরও আমরা কেমন যেন নিশ্চুপ! আমাদের ভোঁতা অনুভূতিগুলো কী আমাদের বিবেক আর মানবিকতাকে নিস্তেজ করে সামাজিক অবক্ষয়কে উস্কে দিচ্ছে? সমাজের চারিদিকে আজ ভীষণ অন্ধকার।
এ জাতীয় বিভিন্ন ঘটনায় দেখা যায়, যথাযথ প্রমাণ থাকা সত্ত্বেও প্রশাসন শুরুতে যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণ করে না আর নাগরিক হিসেবে আমরাও থাকি নিশ্চল, নিশ্চুপ।
আমাদের এই নিরবতার সুযোগে আমরা দেখি, এক গারো আদিবাসী তরুণীকে খোদ রাজধানীর ব্যস্ত রাস্তা হতে তুলে নিয়ে রাজধানী দাপিয়ে গাড়িতেই চলেছে পাশবিক নির্যাতন! আর এ সব কিছুই আমাদের বিচারহীনতার সংস্কৃতির করুণ চিত্র।
আমরা নিজেরা যার যার অবস্থান থেকে প্রতিবাদী না হয়ে বাংলা ছবির নির্যাতিতদের মতো তাকিয়ে থাকি অন্যের দিকে আর ভাবনায় থাকি, কেন কেউ প্রতিবাদী হচ্ছে না? কিন্তু আমরা নিজেরা মধ্যবিত্ত মানসিকতা নিয়ে চুপটি করে ঘরে বসে থাকি, নিজেকে নিজেই ধন্যবাদ দেই, যাক আমার পরিবারের কারও তো কিছু হয়নি! কিন্তু, যেদিন নিজেই আক্রান্ত হই, সেদিন ক্ষোভে ফেটে পড়ি, আমার পাশে কেউ নেই কেন? কিন্তু, তার আগে অন্যের বিপদে তাঁর পাশে গিয়ে দাঁড়ানোর একটুখানি সময় আমরা পাই না।
এই জাতীয় যে কোন ঘটনায় আমরা শুধু বাম বা এই জাতীয় সংগঠনগুলোকেই সোচ্চার হতে দেখি, কিন্তু, ক্ষমতাকেন্দ্রিক রাজনৈতিক দলগুলো খুব কৌশলে নিজেদের এই জাতীয় ইস্যুতে সরিয়ে রাখে, শুধুমাত্র তখনই তারা কথা বলে, যখন মনে করে, ঘটনা থেকে তারা রাজনৈতিক সুবিধা পেতে পারে।
এ সব কিছুই আমাদের জবাবদিহিতাহীন সমাজের করুণ চিত্র! আর আমরা মধ্যবিত্ত নাগরিক সমাজও চলতি হাওয়ার পন্থি। অন্যদিকে, আমাদের মিডিয়াগুলোর কাছে রাজধানীকেন্দ্রিক ঘটনা যতটা গুরুত্ব পায় (আবার সবক্ষেত্রে সব ঘটনা নয়, কিছু ক্ষেত্রে জনমত না হলে, কৌশলে এড়িয়ে যায়), ততটাই গুরুত্বহীন রাজধানী বাদে সারা বাংলাদেশ!
আমাদের ভাবতে হবে, আমাদের শিক্ষায় গলদটা কোথায়? আমরা কেন নারীকে মানুষ হিসেবে সম্মান দিতে পারছি না? আমাদের মধ্যে কেন স্নেহ, মায়া-মমতা, সংবেদনশীলতা, বোধ আর মানবিকতার অভাব?
পৈশাচিক নির্যাতনে মারা যাওয়া মেয়েটির পরিবার আর কখনোই ফিরে পাবে না তাঁকে, তাঁর পরিবারের কেউই আর দেখবে না তাঁদের মেয়ে/বোনের হাসি, আর উচ্ছলতা।
কিন্তু, আমরা যদি এই ঘটনায় দায়ী কাপুরুষ হায়েনাদের কঠোর বিচার নিশ্চিত করতে না পারি, তবে সেই সব হায়েনাদের অট্টহাসিতে হারিয়ে যাবে অন্যসব তরুণীর হাসি আর সাধারণ বাঙালি নারীর উচ্ছলতা।
গোটা সমাজ-রাষ্ট্রকে ভাবতে হবে আমাদের গলদ কোথায়? কেন নৃশংস ভয়াবহ সব অপরাধকর্ম ঘটতে পারছে? এসবের উত্তর খুঁজতে না পারলে, এবং প্রতিকারের পথ বের করতে না পারলে সমাজের অস্থিরতা, অবক্ষয় রোধ করা সম্ভব হবে না। পথ একটাই, ধর্ষণসহ সকল অপরাধের বিরুদ্ধে সামাজিক আন্দোলন গড়ে তোলা। রাষ্ট্রকে তার আইনকানুন প্রয়োগে কঠোর হতে হবে। এর কোন বিকল্প নেই।

লেখক : বিতার্কিক