ধর্ষকদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি হোক

হোসাইন আনোয়ার

তিল তিল করেই নিজকে গড়ে তুলেছিলেন রুপা। ঢাকার আইডিয়াল ল কলেজের ছাত্রী জাকিয়া সুলতানা রুপা। নিজের লেখাপড়ার খরচ জোগাতে তিনি টিউশনি করতেন। এছাড়াও বাবার মৃত্যুর পর পরিবারের খরচ জোগাতে কাজ করতেন একটি বহুজাতিক কোম্পানিতে। ২৫আগস্ট বগুড়ায় শিক্ষক নিবন্ধন পরীক্ষা শেষে রুপা ময়মনসিংহে তার কর্মস্থলে ফিরছিল ছোঁয়া পরিবহনের একটি বাসে। সেই বাসে বাসের চালক ও সহকারীরা তাকে পালাক্রমে ধর্ষণের পর ঘাড় মটকে, মাথা থেঁতলে হত্যা করে। এরপর তার মৃতদেহ টাঙ্গাইলের মধুপুরে ফেলে দেওয়া হয়। পরে পুলিশ তার লাশ উদ্ধার করে। কতটা নিষ্ঠুর হলে মানুষ এমন কাজ করতে পারে চিন্তাই করা যায় না। ঘটনার পর পুলিশ পাঁচ আসামিকে গ্রেফতার করেছে এবং তিনজন স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দিও দিয়েছে।
নারী এবং শিশু নির্যাতনের ঘটনা যেন কমতেই চাইছে না। ধর্ষণকারীরা ক্রমেই বেপরোয়া হয়ে উঠেছে। ধর্ষণের বিচার চাওয়ায় বগুড়ায় ধর্ষিতা ও তার মায়ের মাথার চুল কেটে দিয়েছে সন্ত্রাসীরা। শারীরিকভাবেই নির্যাতন করা হয়েছে তাদের। ঢাকায় সাড়ে তিন বছরের একটি শিশুকে ধর্ষণের পর হত্যা করে লাশ বাথরুমে লুকিয়ে রেখে ধর্ষণকারী আবার সেই পরিবারকেই সান্ত্বনা দিতে গেছে। টাঙ্গাইলে এক অসহায় কিশোরীকে সাতমাস ঘরে আটকে রেখে ধর্ষণ করেছে এক ধর্ষণকারী। পটুয়াখালীর বরগুনায় এক স্কুল শিক্ষিকাকে স্কুলেই তার স্বামীর সামনে ধর্ষণ করা হয়েছে। এরকম ঘটনা দু’একটি নয় অজস্র ঘটনা পত্রিকার পাতায় আসছে। পুলিশের তথ্য মতে, ২০১৬, ২০১৭ সালের এপ্রিল পর্যন্ত ধর্ষণের মামলা হয়েছে চার হাজার আটশ’রও বেশি। অনেকেই লোকলজ্জা ও বিড়ম্বনার ভয়ে থানা পুলিশ করতে চাননা। তাই প্রকৃত সংখ্যা কী তা আমাদের জানা নেই।
ধর্ষণের ব্যাপকতা কি রাষ্ট্র ও সমাজকে তাড়িত করে না? তাহলে কেন তদন্ত ও বিচারের এমন ধীরগতি? বিভিন্ন গবেষণায় দেখা গেছে, হাজার হাজার মামলার মধ্যে বিচার হয়েছে এমন মামলার সংখ্যা খুবই নগণ্য। এছাড়াও পুলিশের রেকর্ডে নেই এমন ধর্ষণের সংখ্যাও কিন্তু কম নয়। আমাদের সামাজিক কাঠামো ও আচার আচরণের ধরন বিবেচনায় ধর্ষণের বেশিরভাগ ঘটনাই ধামাচাপা পড়ে যায়। তাছাড়া বিচারিক আদালতে ধর্ষণের সাক্ষী উপস্থিত করাটাও কঠিন ব্যাপার। যে মেয়ে ধর্ষিত হয়, তার তো হিতাহিত কোনো জ্ঞানই থাকে না। ভয় এবং আতঙ্কে তার জ্ঞান থাকার কথা নয়। সে সাক্ষী জোগাড় করবে কোত্থেকে? সঙ্গত কারণে সম্প্রতি সাক্ষ্য আইনের পরিবর্তনের দাবি উঠছে।
গত ২০ আগস্ট রাজধানীতে ‘বাংলাদেশে ধর্ষণ মামলার বিচারে চারিত্রিক সাক্ষ্যের ব্যবহার’ শীর্ষক এক পরামর্শ সভার আয়োজন করা হয়। সভায় আলোচকরা বলেন, ১৮৭২ সালের সাক্ষ্য আইনের ১৫৫ ধারার ৪ উপধারার ভিত্তিতে ধর্ষণের অভিযোগ প্রমাণ করা হচ্ছে। এতে ধর্ষণের শিকার নারীর চরিত্র ও অতীত ইতিহাস নিয়ে প্রশ্ন তোলার সুৃযোগ রয়েছে।
আসামি পক্ষের আইনজীবী ধর্ষণের শিকার নারীর নৈতিক চরিত্র হরণ করে যে সব প্রশ্ন তোলেন, তা প্রকাশ্যে দিবালোকে শত শত মানুষের সামনে আরেকবার ধর্ষণেরই মতো। তাই আইনের এই উপধারাটি বাতিলের দাবি উঠেছে। বিশেষ করে অনেক পুরোনো একটি আইনি ধারায় এত স্পর্শকাতর একটি বিষয়, যথাযথ মূল্যায়ন করা কোনোভাবেই সম্ভব নয়। সেদিকটা বিবেচনায় এনে খুব যুক্তিসংগতভাবেই ধর্ষণের সুষ্ঠু বিচারের ক্ষেত্রে প্রতিবন্ধকতা হিসেবে চিহ্নিত করে সাক্ষ্য আইনের এই ধারা পরিবর্তনের ধাবি উঠছে। তাছাড়া ১৮০ দিনের মধ্যে বিচার শেষ করার বিধান থাকলেও বাস্তব চিত্র সম্পূর্ণ উল্টো। প্রকৃতপক্ষে ধর্ষণের মামলা শেষ করতে ১০ থেকে ২০ বছর পর্যন্ত লেগে যায়।
সম্প্রতি ভারতের একটি ধর্ষণ মামলার রায় পাওয়া গেছে প্রায় ১৫ বছর পর। এই রায় এমন একজনের বিরুদ্ধে যার বয়স ৫০। যিনি ‘সচ ডেরা সওদা’ নামে এক ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের দীক্ষাগুরু। এবং হরিয়ানা পাঞ্জাব ও দিল্লিতে রয়েছে যার লাখ লাখ ভক্ত। এই স্বঘোষিত ধর্মগুরু ১৫ বছর আগে তারই আশ্রমে আশ্রিত দুই ভক্তকে ধর্ষণ করেছিলেন। তাদের একজন আবার সেই সময় ছিলেন নাবালিকা। সেই অপরাধে ভারতীয় সুপ্রিম কোর্ট তাকে ২০ বছরের সশ্রম কারাদণ্ড ও বিপুল পরিমাণে অর্থও জরিমানা করেছে।
এক সময়ে আমেরিকা কাঁপানো ভারতীয় গুরু রজনীশের কথাও বলতে পারি। সে কাহিনীর ধারাবাহিকতা আজও বন্ধ হয়নি। রাম রহিম সিং এর পদস্খলনের ঘটনাটি জনসমক্ষে আনার সে সাংবাদিক তার নাম রামচন্দ্র ছত্রপতি। ‘ভগবান’ রাম রহিম সিং এর মুখোশ দেখানো এই সাংবাদিক নৈতিকভাবে বিক্রি না হওয়ার মাশুল তাকে দিতে হয়েছে নিজের প্রাণ দিয়ে। অন্য সাহসী ব্যক্তিটি হলেন বিচারপতি জগদীপ সিং। মামলাটি হালকা করে দেখার রাজনৈতিক চাপ কিন্তু তার উপর কম আসেনি। তবুও তিনি মাথা নত করেননি। এই রায়টি পেতে সময় নিয়েছে ১৫টি বছর।
মামলার সময়ের কথা বলছি। একটি ধর্ষণ মামলা শেষ করতে যদি ১০ থেকে ২০ বছর সময় লেগে যায়, তাহলে অপরাধীরা সহজেই পার পেয়ে যেতে পারে এবং পার পেয়ে যাচ্ছে। অথচ আমরা লক্ষ্য করছি অনেক তুচ্ছ রাজনৈতিক-অরাজনৈতিক কারণে অনেকেই বিনা বিচারে বছরের পর বছর জেল খাটছে। কিন্তু ধর্ষণকারীর মতো জঘন্য অপরাধী হয়েও অনেকেই দেখা যায় নির্দ্বিধায় ক্ষমতার দাপট দেখিয়ে বুক ফুলিয়ে প্রকাশ্য রাজপথে চলছে। ধর্ষণের ঘটনাগুলো সাধারণত সমাজের প্রভাবশালীদের দ্বারাই ঘটে থাকে। আমরা দেখেছি জন্মদিনে দাওয়াত দিয়ে নিয়ে গিয়ে ধর্ষণের ঘটনা। সমাজের প্রভাবশালীদের দ্বারা ঘটে যাওয়া ধর্ষণের ঘটনাগুলোর প্রতিকার পাওয়াও কঠিন হয়ে দাঁড়ায়। এ সকল ক্ষেত্রে দেখা যায় তাৎক্ষণিকভাবে থানায় গিয়ে অভিযোগ জানালেও থানা কর্তৃপক্ষ সহজেই অভিযোগগুলো গ্রহণ করেন না। এমনকি তাৎক্ষণিক প্রতিকারও অনেক সময় থানা থেকে পাওয়া যায় না। বিভিন্ন ক্ষেত্রে দেখা যায় গণমাধ্যম কর্তৃক সোচ্চার ভূমিকার কারণে পুলিশ থানায় মামলা গ্রহণ করতে বাধ্য হয়।
উন্নত অথবা সভ্যদেশে কোনো নারীকে ছুঁতে পারাতো দূরের কথা, ইশারা করলেও ‘খবর’ আছে। এসব সভ্য দেশেও এরকম ঘটনা যে ঘটে না তা নয়, তবে সংখ্যা একেবারেই কম। কারণ সেখানে বিচার আছে, আইন আছে, শাস্তিও আছে।
রুপাকে যারা ধর্ষণ করেছে তাদের সকলকেই আমরা চিনি। তাদের সামাজিক অবস্থানও আমাদের জানা। কিন্তু আমরা আশ্চর্য হই তখনই যখন শুনি রুপাকে ধর্ষণ করার পর ঘাড় মটকে হত্যা করার পরও অভিযুক্ত ব্যক্তিরা নিজ বাড়িতে গিয়ে স্বাভাবিক আচরণ করেন। ধর্ষণ কিংবা হত্যাজনিত কোনো অপরাধ তাদের বিচলিত করে না। মানুষ কতটা পাশবিক আর কতটা পশু হলে এমন স্বাভাবিক আচরণ করতে পারে সেটাই চিন্তার বিষয়।
বর্তমান সরকার যেভাবে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে জঙ্গি দমন করছে, ঠিক তেমনি তৎপরতার মাধ্যমে ধর্ষকদের প্রতিহত এবং তাৎক্ষণিকভাবে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির ব্যবস্থা করা করবে বলে জনগণ আশা করে।
রুপার হত্যাকারীরা স্বীকার করেছে তাদের দুষ্কর্মের কথা। এ ক্ষেত্রে ধর্ষক এবং হত্যাকারীর কোন সাক্ষীর প্রয়োজন হবে না। তারা নিজেদের সাক্ষী নিজেরাই। এ ক্ষেত্রে আলোড়ন থাকতে থাকতেই ধর্ষণকারীরা শাস্তি পেলে রুপার পরিবারের বিক্ষুব্ধ হৃদয় কিছুটা হলেও স্বস্তি পাবে। আমরাও চাই খুব দ্রুততম সময়ের মধ্যেই রুপার ধর্ষণকারী ও হত্যাকারীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি হোক।
লেখক : কলামিস্ট