শেষ হলো ১০ দিনব্যাপী শাহাদাতে কারবালা মাহফিল

‘দ্বীন প্রতিষ্ঠার জন্যই আত্মোৎসর্গ করেছিলেন ইমাম হোসাইন (রা)’

দেশ ও সমাজে শান্তি, জননিরাপত্তা প্রতিষ্ঠা, অন্যায় মিথ্যা প্রতিরোধ এবং দ্বীন প্রতিষ্ঠায় সর্বোচ্চ ত্যাগ স্বীকারের ডাক দিয়ে জমিয়তুল ফালাহ মসজিদে ১০ দিনব্যাপী ৩৩ তম আন্তর্জাতিক শাহাদাতে কারবালা মাহফিল শেষ হয়েছে। গতকালের মাহফিল সুন্নি ছাত্র-উলামা-জনতার সমাগমে মুখর হয়ে ওঠে। মাহফিলের সমাপনী দিনে সভাপতিত্ব করেন মাইজভান্ডার দরবার শরিফের সাজ্জাদানশিন শাহসূফি মাওলানা সৈয়দ সাইফুদ্দীন আহমদ আল হাসানী (ম.জি.আ)। তিনি বলেন, জোর জবরদস্তি করে ক্ষমতায় বসা কিংবা রাজনৈতিক হীন স্বার্থ চরিতার্থ করতে হযরত ইমাম হোসাইন (রা) ইয়াজিদের সঙ্গে যুদ্ধ-সংঘাতে লিপ্ত হননি। বরং আল্লাহর জমিনে আল্লাহর দ্বীন প্রতিষ্ঠার জন্য এবং ইনসাফভিত্তিক সমাজ ও রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার অভিপ্রায়ে ইয়াজিদি স্বৈরতন্ত্রকে চ্যালেঞ্জ করেছিলেন হযরত ইমাম হোসাইন (রা) ও আহলে বায়তে রাসূল (দ)। সৈয়দ সাইফুদ্দীন আহমদ আল-হাসানী বলেন, হযরত ইমাম হোসাইন (রা) কারবালা ময়দানে সত্য, দ্বীন ও ন্যায়নীতি প্রতিষ্ঠার জন্য আত্মোৎসর্গ করেছিলেন বলেই আমরা দ্বীন ইসলামের মতো খোদায়ী নেয়ামত পেয়েছি। কারবালা ময়দানে আহলে বায়তে রাসূলের (দ) শাহাদাতের নজরানা হিসেবে দ্বীন ইসলামের প্রত্যাশিত পুনরুজ্জীবন ঘটেছে। গতকালের মাহফিলে দেশি বিদেশি পীর মশায়েখ, দেশবরেণ্য আলেম, বিশিষ্ট ব্যক্তিবর্গ উপসি’ত ছিলেন।

মাহফিলে বক্তাগণ বলেন, ইসলামের জন্য আহলে বায়তে রাসূলের (দ) আত্মনিবেদন থেকে অনেক শিক্ষণীয় বিষয় আছে। দেশ ও সমাজে যখন অন্যায় ও জুলুমবাজি মাথাচাড়া দিয়ে উঠবে জীবনবাজি রেখে তা প্রতিরোধ করাই শাহাদাতে কারবালার দর্শন ও শিক্ষা।

এতে কৃতজ্ঞতাসূচক বক্তব্য দেন শাহাদাতে কারবালা মাহফিল পরিচালনা পর্ষদের চেয়ারম্যান ও প্রধান পৃষ্ঠপোষক আলহাজ্ব সুফি মোহাম্মদ মিজানুর রহমান। তিনি ১০দিন ব্যাপী আহলে বায়াতের মাহফিলকে সর্বাত্বকভাবে সফল করার জন্য কমিটির সদস্যসহ উপসি’ত সকলকে আন্তরিক ধন্যবাদ ও কৃতজ্ঞতা জানান। তিনি বলেন, জমিয়তুল ফালাহর কারবালা মাহফিল শুধু আমাদের দেশ নয়, সারা বিশ্বের ঈমানদার জনতার মাঝে জাগরণ ও উদ্দীপনা সৃষ্টি করেছে। এই মাহফিল হয়ে উঠেছে দেশি-বিদেশি প্রাজ্ঞ-বোদ্ধাজনদের মিলনস’ল। ইসলামিক স্কলার ও শিক্ষাবিদ-গবেষকরা ১০ দিনব্যাপী মাহফিলে এসে আমাদেরকে যে ম্যাসেজ দিয়ে গেছেন তা আমাদের জীবনে ধারণ ও প্রতিফলিত করতে হবে। সুফি মিজানুর রহমান তাঁর বক্তব্যে মাহফিলে যোগদানকারী, সহযোগিতাকারী প্রশাসন-মিডিয়াসহ সংশ্লিষ্ট সকলের প্রতি ধন্যবাদ জানান। তিনি এ শানদার মাহফিলের সূচনাকারী খতিবে বাঙাল অধ্যক্ষ আল্লামা জালাল উদ্দীন আলকাদেরী (রহ) এর প্রতি বিনম্র শ্রদ্ধা জানান এবং তাঁর জান্নাতে সুউচ্চ মর্যাদা কামনা করেন।

মাহফিলে বিদেশি আলোচক ছিলেন ভারতের কাসওয়াসা দরবার শরিফের সাজ্জাদানশিন শাহসূফি আল্লামা সৈয়দ মাহমুদ আশরাফ আল আশরাফি আল জিলানি, মিসর আল আযহার বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক চ্যান্সেলর প্রফেসর ড. ইব্রাহিম সালেহ হুদহুদ এবং আল আযহার বিশ্ববিদ্যালয়ের উসুলুদ দিন ফ্যাকাল্টির ডিন প্রফেসর ড. আবদুল ফত্তাহ আবদুল গণিসহ মিসরের ১৩ সদস্য, ইসলামী ফাউন্ডেশনের মহাপরিচালক আলহাজ্ব শামীম আফজাল, বিভাগীয় পরিচালক আবুল হায়াত মুহাম্মদ তারেক, প্রকল্প পরিচালক তৌহিদুল আনোয়ার, জমিয়তুল ফালাহ মসজিদের খতিব আবু তালেব মুহাম্মদ আলাউদ্দীন, জামেয়ার ভাইস প্রিন্সিপাল লিয়াকত আলী প্রমুখ।

প্রফেসর ইব্রাহিম সালেহ হুদহুদ বলেন, সেদিন কী অপরাধ করেছিলেন আহলে বায়তে রাসূলের (দ) মহাত্মা রমণী ও অবুঝ সদস্যগণ। দুগ্ধশিশু ইমাম আলী আসগর, আলী আকবর ও নিষ্পাপ কাসেম-কেন তাদের এমন নির্মমভাবে খুন করা হলো। আল্লাহর জমিনে দ্বীন প্রতিষ্ঠার সংগ্রামে আত্মনিবেদিত হয়ে এই শাহাদাতের বদলা নিতে হবে।
আল্লামা মাহমুদ আশরাফ জিলানি বলেন, ৬১ হিজরিতে কারবালা ময়দানে পানি সরবরাহ, সকল প্রকার খাদ্য সরবরাহ বন্ধ করে দিয়ে ইয়াজিদ যে জঘন্য নৃশংসতার জন্ম দিয়েছে তা স্মরণে এলে আমরা বেদনাস্তব্ধ হয়ে পড়ি। প্রফেসর ড. আবদুল ফত্তাহ আবদুল গণি বলেন, ক্ষুধায় মেরে এবং পানির কষ্টে নিপতিত করে ইয়াজিদ সেদিন জঘন্য নির্মমতার স্বাক্ষর রেখেছে। ফোরাত নদীর পানি কুকুর-বিড়াল চতুষ্পদ প্রাণির জন্য উন্মুক্ত ছিল, কিন’ পানির জন্য আহাজারি করা সত্ত্বেও দুগ্ধশিশু আলী আসগর, আলী আকবরসহ পূত পবিত্র আহলে বায়তে রাসূলের (দ) সদস্যদেরকে এক ফোটা পানি দেয়নি ইয়াজিদি দুরাচারিরা। এই নির্মমতা সত্যিই বেদনাদায়ক। কারবালা পরিবর্তী মুসলিম বিশ্বের রাজনৈতিক ও ধর্মীয় অবস’া বিষয়ে বক্তব্য রাখেন জামেয়া আহমদিয়া সুন্নিয়া কামিল মাদরাসার মুহাদ্দিস আল্লামা হাফেজ মুহাম্মদ আশরাফুজ্জামান আল-কাদেরী। বক্তব্য রাখেন বিশিষ্ট মিডিয়া ব্যক্তিত্ব মাওলানা আহমদ রেজা ফারুকী, ড. মাওলানা মুহাম্মদ সাইফুল ইসলাম আযহারী। এ সময় আঞ্জুমানের সিনিয়র ভাইস প্রেসিডেন্ট আলহাজ্ব মুহাম্মদ মহসিন সহ শাহাদাতে কারবালা মাহফিল পরিচালনা পর্ষদের কর্মকর্তাদের মধ্যে উপসি’ত ছিলেন, আলহাজ্ব পেয়ার মুহাম্মদ, আলহাজ্ব মুহাম্মদ সেকান্দর মিয়া, মুহাম্মদ সিরাজুল মোস্তফা, মুহাম্মদ আনোয়ারুল হক, সৈয়দ আব্দুল লতিফ, খোরশেদুর রহমান, জাফর আহমদ সাওদাগর, আব্দুল হাই মাসুম,অধ্যাপক কামাল উদ্দিন আহমদ, মুহাম্মদ দিলশাদ আহমেদ, হাফেজ মাওলানা মুহাম্মদ সালামত উল্লাহ, ড. মুহাম্মদ জাফর উল্লাহ, এস এম সফি, মুহাম্মদ মনসুর সিকদার, মুহাম্মদ মাহাবুবুল আলম, মাওলানা আহমুদুল হক, হাফেজ ক্বারী মুফতি মুহাম্মদ জালাল উদ্দীন ও মাওলানা জিয়াউল হক প্রমুখ।

মাহফিলে পবিত্র কুরআন থেকে তেলাওয়াত করেন আন্তর্জাতিক ক্বারী শাইখ আহমদ বিন ইউসুফ আল আযহারী ও নাতে রাসূল (দ) পাঠ করেন শায়ের মাওলানা জয়নুল আবেদীন। আল্লামা হাফেজ আশরাফুজ্জামান আলকাদেরী বলেন, মুসলিম বিশ্বের ঈমানদার জনতা কারবালার ঘটনা স্মরণে শোকে বিহ্বল হয়ে ওঠে। সকল যুগে ইয়াজিদ পাপিষ্ট ও নরাধম হিসেবে ধিকৃত হয়ে আসছে। তিনি বলেন, কোন অবস’ায় নামাজ পরিত্যাগ করা যাবে না। হযরত ইমাম হোসইন (রা) শাহাদাতের সুধা পান করার আগে আল্লাহর দরবারে শোকরিয়া সিজদা করেছিলেন। নামাজ পড়ার পরই তিনি আত্মোৎসর্গ করেন।
সালাত সালাম শেষে দেশ ও বিশ্ববাসীর শান্তি কল্যাণ কামনায় মোনাজাত পরিচালনা করেন, মাইজভান্ডার দারবার শরিফের সাজ্জাদানশিন শাহসূফি মাওলানা সৈয়দ সাইফুদ্দীন আহমদ আল হাসানী (মা.জি.আ)। উল্লেখ্য, মাহফিলে জমিয়তুল ফালাহ মসজিদ কমপ্লেক্সের নিচতলায় পর্দা সহকারে মহিলাদের বক্তব্য শোনার ব্যবস’া ছিল। বিজ্ঞপ্তি