দোয়েলের পরীক্ষা ভীতি

অনিক শুভ
Untitled-1

এক
দোয়েল ইদানিং খুব বেশি দুষ্ট হয়ে গেছে। ঠিকমত পড়াশোনা করে না। সারাদিন খেলাধুলা করে আর টিভিতে নিনজা হাতুড়ি দেখে। এই নিয়ে প্রতিদিন মায়ের বকুনিও কম খায় না।
বার্ষিক পরীক্ষা দরজায় কড়া নাড়ছে। হঠাৎ পরীক্ষার আগের রাতে দোয়েলের বুক ব্যথা, বুক ধড়ফড় ও খিঁচুনি শুরু হল। তাড়াতাড়ি পাশের এক পরিচিত ডাক্তারের কাছে নিয়ে যাওয়া হল। তিনি বললেন, ‘রোগীর হার্ট একটু দুর্বল, এবার পরীক্ষা দেওয়ার দরকার নেই।’
এরপর মোটামুটি ভালোই দোয়েলের সময় কাটতে লাগলো। এখন আবার মনোযোগ দিয়ে পড়াশোনাও করছে। মায়ের কথামতোও চলছে। স্কুল এবং প্রাইভেট টিচারের সব পড়া সময়মত শেষ করে। কিন্তু যখনই পরীক্ষার সময় নিকটবর্তী হয় তখন আবার ওই একই ধরনের লক্ষণ। এভাবে দু’বছর কেটে গেল দোয়েলের। পরীক্ষা দিতে পারে না। বাবা-মা খুব উদ্বিগ্ন।
দোয়েলকে ভালো ডাক্তার দেখানো হল। সমস্ত পরীক্ষা-নিরীক্ষা করানো হল। কিন্তু কোন রোগ ধরা পড়ছে না। আত্মীয়-স্বজনদের ধারণা এটা ডাক্তারি কোন রোগ না। তারপর শুরু হল আর এক কুসংস্কারের পালা। কেউ বলে আছর আছে। কেউ বলে উপুরি আছে। তাই চিকিৎসা বলতে এখন তাবিজ-কবজ, পানিপড়া, তেলপড়া। কিন্তু তাতেও লাভ হল না। পরীক্ষার আগে আবার শুরু হল সেই আগের বুক ব্যথ্যা, বুক ধড়ফড়, খিঁচুনি ইত্যাদি।

দুই
একদিন বিকেল বেলা ছোট মামা বাসায় এসে হাজির। সবাই অবাক। কারণ ছোট মামা সহজে কারো বাসায় বেড়াতে যায় না। আর গেলেও খুব দরকারি কাজে যাওয়া হয়। সবাইকে অবাক হয়ে তাকিয়ে থাকতে দেখে মামা বললেন,
– কিরে? তোরা এত অবাক হয়ে আমার দিকে তাকিয়ে কী দেখছিস?
মা বললেন,
অবাক হব না? তুইতো দরকার ছাড়া কোথাও যাস না।
ভুল বললে দিদি। আমি এত নিষ্ঠুর না। কাজের ব্যস্ততা বেশি তাই এমন হয়। তবে আজ সকাল থেকে তোদের খুব দেখতে ইচ্ছে করছিল। তাই চলে এসেছি সব কাজ ফেলে।
হুম। অনেক দূর থেকে এসেছিস। এখন ফ্রেস হয়ে নে।
হব। আমার আদরের ভাগ্নি দোয়েল পাখিটা কোথায়। দেখছিনা যে, সবাই চুপ করে রইল। কেউ কিছু বলল না।
একসাথে সবার চুপ করে থাকাতে মামা একটু ঘাবড়ে গেলেন। কিছুক্ষণ পর বললেন,
কী হয়েছে তোরা বলবি তো। না বললেতো কোন প্রবলেমের সলিউশান বের করা যাবে না।
মা এক এক করে দোয়েলের পরীক্ষা ভীতি সম্পর্কে সব খুলে বললেন। সব শোনার পর মামা বললেন,
ওহ, এই ব্যাপার। এতে চিন্তার কিছু নেই। আগে দোয়েল পাখিটাকে ডাক।

তিন
সবাই একসাথে নাস্তা করতে বসলাম। ছোট মামার মজার মজার সব কথার সুরে এক মনমাতানো পরিবেশ সৃষ্টি করেছে ডাইনিং টেবিলে। খাবার শেষে মামা বললেন,
তোদের নিয়ে একসাথেতো অনেক দিন বেড়ানো হল না। চল আজ অনেকক্ষণ বেড়াবো। দোয়েল সাথে সাথে ইয়া….হু….বলে বলল,
মামা….মামা…. আমি শিশুপার্কে যাব।
ওকে…..ডাক। দোয়েল যেহেতু শিশুপার্কে যাবে বলেছে তাই আজ আমরা শিশুপার্কে যাচ্ছি।

চার
আমি, মামা আর দোয়েল অনেক মজা করলাম শিশুপার্কে। বেশি মজা হয়েছে রোলারকোস্টার আর বাম্পার কারে। হাসতে হাসতে পেট ব্যথ্যা হয়ে গেছে। দোয়েল বলল, ‘মামা আমি পোলার আইসক্রিম খাবো।’
মামা দোয়েলকে পোলার আইসক্রিম কিনে দিলেন আর বললেন, ‘এখন আমার দোয়েল পাখিটাকে আরেকটা জায়গায় নিয়ে যাবো। ’
এই বলে মামা আমাদের নিয়ে এলেন ওনার বন্ধু পিয়াল আঙ্কেলের চেম্বারে। উনি সাইকিয়াট্রিস্ট। মামা দোয়েলের পরীক্ষা ভীতি নিয়ে সব পিয়াল আঙ্কেলকে বললেন। আঙ্কেল প্রত্যেকটা কথা খুব মনোযোগ সহকারে শুনলেন। এরপর বললেন,
দেখো, আমরা সবসময় কোন না কোন ভয়ভীতির সম্মুখিন হয়ে থাকি। এই যেমন- বেশি মানুষের সামনে কথা বলতে গেলে, অনেকে আবার পোকামাকড় দেখলে। অনেক ছাত্রছাত্রী আছে যারা শিক্ষকদের সাথে কথা বলতে ভয় পায়। অফিসের অনেকে আবার বসের সাথে কথা বলতে ভয় পায়। যার ফলে চাকুরি পর্যন্ত ছাড়ার উপক্রম হয়।
তাই এসব ভয়ভীতির জন্য কারো শিক্ষাজীবন, কর্মজীবন ও পরিবারিক জীবনে ব্যাঘাত ঘটে, তখন কিন্তু সাইকিয়াট্রিস্টের পরামর্শ নেওয়া উচিত।
তবে পরীক্ষা ভীতি একটু ভিন্নধর্মী। এটা একধরনের টেনশন গ্রুপের অসুখ। যাকে আমরা “ফোবিক অ্যাংজাইটি ডিজঅর্ডার” বলে থাকি।
কথাবার্তা শেষে ডাক্তার দোয়েলের জন্য কিছু ওষুধ ও বিহেভিয়ার থেরাপি দিলেন।

পাঁচ
বাসায় এসে মামা মাকে সব বোঝানোর পর বললেন,
আমাদের দোয়েলের মত অনেকে বিভিন্ন ধরনের ভীতি নিয়ে কুসংস্কারের জালে আবদ্ধ হয়ে আছে। যার ফলে ভুল সিদ্ধান্তের মাধ্যমে একটি মানুষের জীবনকে ঠেলে দেওয়া হচ্ছে ধ্বংসের দিকে।
এরপর মামা আমার দিকে তাকিয়ে বললেন, ‘আমাদের প্রত্যেকের উচিত এসব ভীতির সঠিক কারণ খুঁজে বের করে সঠিক সমাধানের মাধ্যমে সকলকে সচেতন করা।’
দোয়েল এখন নিয়মিত ওষুধ সেবন করে ও বিহেভিয়ার থেরাপি মেনে চলে। এর মাধ্যমে ও চরম সাহস এবং উদ্যমের সাথে পরীক্ষা দিয়ে ভালো রেজাল্টও করল। এখন আর কোন পরীক্ষাকে ভয় পায় না ও।