দোহাজারী-কক্সবাজার রেলপথ : চলতি বছরেই শেষ হচ্ছে নির্মাণ কাজ!

জয়নাল আবেদীন, ঢাকা

প্রধানমন্ত্রীর আটটি অগ্রাধিকার প্রকল্পের একটি হলো দোহাজারী-কক্সবাজার-ঘুমধুম রেলপথ নির্মাণ। চট্টগ্রাম বন্দর, বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল এবং কক্সবাজার ঘিরে রেলের অবকাঠামোগত বিভিন্ন পরিকল্পনা রয়েছে সরকারের। এই রুটে রেলপথ নির্মাণ তারই অংশ। প্রকল্প বাস্তবায়নে দৃশ্যমান কিছু না দেখা গেলেও চলতি বছরের মধ্যেই এই অংশের ১০০ কিলোমিটার রেলপথ নির্মাণ সম্পন্ন করতে চায় সরকার।
দোহাজারী থেকে কক্সবাজার হয়ে ঘুমধুম পর্যন্ত এই রুটে মোট ১২৮ কিলোমিটার রেললাইন নির্মাণ সরকারের অন্যতম নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি। সে অনুযায়ী এই দফায় দোহাজারী থেকে রামু পর্যন্ত ৮৮ কিলোমিটার এবং রামু থেকে কক্সবাজার পর্যন্ত ১২ কিলোমিটার রেলপথ নির্মাণের প্রকল্প নেয় সরকার। গত বছর এই প্রকল্প বাস্তবায়নে চুক্তি হয়।
গত বছরের শেষদিকে রেলপথের রুট এলাইনমেন্টও চূড়ান্ত হয়। এরপর জমি অধিগ্রহণ শেষে নির্মাণকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর হাতে নির্ধারিত এলাকা তুলে দেওয়া হয়। পরিবেশ অধিদপ্তর এবং বন বিভাগের অনাপত্তিপত্র পাওয়ার পরে প্রকল্প বাস্তবায়নে মাঠপর্যায়ের কাজ শুরু হয়। ১৮ হাজার ৩৪ কোটি ৪৭ লাখ টাকা ব্যয়ে বাস্তবায়নাধীন প্রকল্পটির দায়িত্বে আছে তিনটি প্রতিষ্ঠান। দোহাজারী থেকে চকোরিয়া পর্যন্ত চীনা প্রতিষ্ঠান সিওটি এবং বাকি অংশের দায়িত্বে নিযুক্ত সিসিইসিসি এবং ম্যাক্স।
এই ১০০ কিলোমিটার রেলপথ নির্মাণ চলতি বছরের মধ্যেই সম্পন্ন করতে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার বিশেষ নির্দেশনা রয়েছে বলে জানিয়েছেন রেলপথ মন্ত্রী। গত বুধবার জাতীয় সংসদে এক প্রশ্নোত্তর পর্বে মো. মুজিবুল হক বলেন, দোহাজারী থেকে কক্সবাজার পর্যন্ত রেলপথটি চলতি বছরের মধ্যেই শেষ করার চেষ্টা চলছে। এ বিষয়ে প্রধানমন্ত্রীর বিশেষ নির্দেশনা রয়েছে।
প্রশ্নোত্তর পর্বে তিনি আরও বলেছিলেন, প্রকল্পের কাজ ইতোমধ্যে শুরু হয়ে গেছে। আশা করছি নির্ধারিত সময়ের মধ্যেই কাজটি শেষ হবে। দোহাজারী থেকে কক্সবাজার পর্যন্ত রেলপথ নির্মাণ কাজ শেষ হলে পরবর্তীতে রামু থেকে ঘুমধুম পর্যন্ত রেলপথ নির্মাণ কাজ শুরু হবে।
যদিও প্রকল্প বাস্তবায়নের কাজ শুরুর আগে থেকেই বলা হচ্ছিলো, আগামী ২০২২ সালের মধ্যে দোহাজারী থেকে কক্সবাজার পর্যন্ত রেলপথ নির্মাণ শেষ হবে। সে হিসেবে চলতি বছর থেকে পাঁচ বছর সময় নিয়ে কাজটি সম্পন্ন হওয়ার কথা। সংসদে দাঁড়িয়ে রেলপথ মন্ত্রী চলতি বছরেই কাজ সম্পন্নের যে ঘোষণা দিয়েছেন, তাতে অনেকেই বিস্মিত। অবশ্য পাঁচ বছরের কাজ এক বছরে কিভাবে সম্পন্ন হবে, সে ব্যাপারে কোনো নির্দেশনা এখনও পাওয়া যায়নি।
এদিকে, রামু থেকে ঘুমধুম পর্যন্ত ২৮ কিলোমিটার রেলপথ নির্মাণেরও পরিকল্পনা আছে। দোহাজারী থেকে কক্সবাজার এবং রামু থেকে ঘুমধুম-পুরো রুটেই হবে ডুয়েল গেজের রেলপথ। চট্টগ্রাম বন্দর, বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল এবং কক্সবাজারের পাশাপাশি এই রেলপথ নির্মাণের আরেকটি বড় উদ্দেশ্য আন্তর্জাতিক বাণিজ্য সম্প্রসারণ। বিশেষ করে ভারত-বাংলাদেশ-মিয়ানমার-চীন স্থলপথের যোগাযোগব্যবস্থা জোরদারের বিষয়েও নানা পরিকল্পনা চলমান রয়েছে। এই রুটে রেলপথ নির্মাণ সেই পরিকল্পনারও অংশ।
এই রুটে রেলপথ নির্মাণকাজ সম্পন্ন হলে বাংলাদেশ প্রবেশ করবে আন্তর্জাতিক রেল নেটওয়ার্ক ট্রান্স এশিয়ান রেলওয়েতে। এর ফলে মিয়ানমার থেকে বাংলাদেশ-ভারত-পাকিস্তান-ইরান হয়ে রেল যোগাযোগ বিস্তৃত হয়ে যাবে ইউরোপ পর্যন্ত।
ছোট-বড় পাহাড়-টিলা, বনভূমি আর সবুজ প্রান্তরের কোল ঘেঁষে রেলপথটি নির্মাণ করা হচ্ছে। ফলে এটিই দেশের সবচাইতে দৃষ্টিনন্দন রেলপথ হতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। এ ছাড়া কক্সবাজার রেলস্টেশনটি নির্মিত হবে বিশ্বমানের। কক্সবাজার যে পর্যটনের শহর, তার প্রতীক হিসেবে স্টেশনটি নির্মাণ হবে ঝিনুক আকৃতির।
জানা গেছে, হাতি ও বন্যপ্রাণি অধ্যুষিত এলাকাগুলো চিহ্নিত করে, ওইসব এলাকায় প্যাসেজ নির্মাণ করা হবে। দোহাজারী থেকে কক্সবাজার পর্যন্ত থাকবে নয়টি স্টেশন। এগুলো হলো-দোহাজারী, সাতকানিয়া, লোহাগাড়া, হারবাং, চকরিয়া, ডুলাহাজারা, ইসলামাবাদ, রামু এবং কক্সবাজার।
এই রুটে রেলপথ নির্মাণ শতভাগ সম্পন্ন হলে এবং ট্রেন চলাচল শুরু হলে দেশের যোগাযোগ ব্যবস্থায় পাবে বাড়তি মাত্রা। পর্যটন নগরী কক্সবাজারের দিকে সারাবছরই ছোটেন ভ্রমণপিপাষু মানুষেরা। এই সমুদ্র সৈকত টানে দেশের প্রায় সব অঞ্চলের মানুষকে। বর্তমানে জঞ্জালহীন ঢাকা-চট্টগ্রাম চার লেন মহাসড়ক পেরিয়ে পর্যটকদের পড়তে হয় চট্টগ্রাম-কক্সবাজার মহাসড়কের দুর্ভোগে। সরু ও আঁকাবাঁকা সড়কটি বেশ ঝুঁকিপূর্ণ। এসব কারণে রেলপথের জন্যে মুখিয়ে আছেন পর্যটকেরা। ট্রেন ভ্রমণ এমনিতেই আরামদায়ক। পর্যটন শহরকে কেন্দ্র করে রেলওয়ের বিশেষ কিছু যুক্ত হলে তো কথাই নেই।